30/07/2026
"নাস্তিক ফার্ম" থেকে কুসংস্কার বিরোধী আইন: গুজরাটের কিংবদন্তি অলৌকিক-বিরোধী এক যোদ্ধার স্মৃতিচারণ"
"যুক্তিবাদের প্রসার সবচেয়ে কার্যকরভাবে তখন ঘটবে, যখন সমাজ যুক্তিবাদী জীবনযাপন করা কিছু আদর্শ মানুষকে (মডেল ব্যক্তি) নিজের চোখে দেখতে পাবে"।
"কেবলমাত্র একজন অন্ধবিশ্বাসী বা বিবেকহীন (mindless) মানুষই জীবনজুড়ে একটি অপরিবর্তনশীল মতামত বজায় রাখে"(বার্ট্রান্ড রাসেল)।
এই কথাগুলো কোন নেতার ভাষন নয়, সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত অন্যায় ও শোষনের শিকড়গুলো তুলতে যাঁরা নীরবে কাজ করে যান, তাঁদের একজনের বোধ ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ। তাঁরা সাধারণের মধ্যে মিশে থাকা অসাধারণ কর্মের জীবন্ত উদাহরন।
ইন্ডিয়ান রেনেসাঁ ইনস্টিটিউট (দিল্লি)-এর মিটিং এর পরে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার অবসরে প্রয়াত কিরন নানাবতীর মুখে শোনা একটা বাক্য মনকে নাড়া দিয়েছিল - ইন্টেলেকচুয়াল অনেস্টি (intellectual honesty), যা তিনি জীবনের সব কাজে প্রমাণ করে গেছেন। কিছুদিন হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর আলোকিত মনের কিরন অনুভব করেছি। অনেক পরিকল্পনার বাস্তবে পরীক্ষা চালিয়েছেন। শীঘ্রই তাঁর বাবার (মিলিটারি বিভাগে) জীবনী। নিয়ে একটি বই প্রকাশ করবেন, একথাও জানিয়েছিলেন। তারপর হঠাৎ ২০২০ অগাষ্ট মাসে তাঁর মৃত্যু সংবাদ।
সম্প্রতি তাঁর উপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ দেখে ভীষন ভালো লাগে। জীবনে কিছুই হারায় না, বিশেষত মানুষের সৎকর্ম।
৩০ জুন ,২০২৬ ,শ্রী জগজীবন প্রেরিত ইংরেজি প্রতিবেদনের তথ্য অবলম্বনে ও নেট থেকে সংগৃহীত তথ্যের সাহায্যে আমরা প্রয়াত কিরন ডি. নানাবতীর কৃতি জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাওয়ার চেষ্টা করতে পারি।
[২]
গুজরাটের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে, আহমেদাবাদ ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে "এক কিরণ - র্যাশনালাইজম নু" --'যুক্তিবাদীতার এক আলোকরশ্মি' শিরোনামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এই বইটিতে সংকলন করা হয়েছে প্রয়াত কিরণ ডি. নানাবতীর চূড়ান্ত চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণাত্মক লেখা এবং আজীবন অবদানের কথা। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে শুরু করে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সমগ্র রাজ্য জুড়ে তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একজন অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব ।
তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সহ-আন্দোলনকারী লঙ্কেশ চক্রবর্তী কর্তৃক অত্যন্ত যত্নসহকারে এই বইটি
সম্পাদনা করেছেন এবং গুজরাটে 'র্যাশনাল প্রকাশন' বইটি প্রকাশ করে রাজ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ সংস্কারের জন্য একাধারে একটি শিক্ষণীয় আলোকবর্তিকা এবং অন্যদিকে ঐতিহাসিক রোডম্যাপের দিক নির্দেশনা স্থাপন করেছে।
সংকলনটি তুলে ধরেছে কিরন নানাবতীর বহুমুখী জীবনযাত্রাকে। মূলত ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে এই কাজ শুরু হয়েছিল- আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংশয়বাদীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যখন তিনি মুম্বাইয়ের একটি অলৌকিক-বিরোধী কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন।
অবসরপ্রাপ্ত জেএনইউ (JNU) অধ্যাপক ড. ঘনশ্যাম শাহের লেখা বইটির মুখবন্ধে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে নানাবতী কালক্রমে কঠোর সংশয়বাদ থেকে 'নতুন মানবতাবাদ'-এ (New Humanism) সমাজ দর্শনের ভাবনায় নিজেকে রূপান্তরিত করেছিলেন। কিরন
দাবি করেছিলেন যে যুক্তিবাদকে কেবল অলৌকিক চাল বা প্রতারণা ফাঁস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং প্রান্তিক মানুষের মানবাধিকারের সংগ্রামেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
তাঁর যুক্তিবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি একজন সামাজিক গবেষক হিসাবে ক্ষেত্র- সমীক্ষায় দ্বারা নানাবতীর অমূল্য অবদানকেও এই গ্রন্থে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। যেমন, তিনি নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি নৃবিজ্ঞানী জেন ব্রেমানের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরতে সরাসরি বস্তি, ইটের ভাটা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া টেক্সটাইল মিলগুলোর ভেতরে গিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন।
প্রকাশনা ও সহযোগী সমাজ
অ্যাক্টিভিস্ট বা আন্দোলনকারী মহলের ব্যাপক সহযোগিতার ফলেই এই বইটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে প্রধান সাংগঠনিক ও আর্থিক দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতীক মুন্সী এবং শীলা মুন্সী।
যুক্তিবাদী নেতা গিরিশ সুন্ধিয়া, নটুভাই প্যাটেল এবং পীযূষ জাদুগরের সহায়তায় প্রাথমিক তথ্য ও উপাদানগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে মুম্বাই-গুজরাট যুক্তিবাদী সমিতির (Mumbai-Gujarat Rationalist Association) সভাপতি ড. সুজাত ওয়ালী সকলকে আন্তরিক স্বাগত জানান।
'র্যাশনাল প্রকাশন' কর্তৃক ব্যক্তিগত ও অ-বাণিজ্যিক বিতরণের জন্য ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি এমন একজন মানুষের স্থায়ী স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে, যিনি যুক্তির আলোয় বিশ্বকে দেখতেন এবং অজ্ঞতার প্রাচীর ভেঙে ফেলার জন্য তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। গুজরাটের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নানাবতী কুসংস্কারবিরোধী প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং নাস্তিক ফার্ম নামে একটি নাস্তিক কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০২০ সালের ২১শে আগস্ট প্রয়াত হন।
কিরণ নানাবতী ১৯৫০ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মুম্বাইতে বড়ো হয়ে ওঠেন। তাঁর বাবা-মা তাঁর মধ্যে একটি অনুসন্ধিৎসু মনোভাব এবং এমন এক নৈতিক দিকদর্শন গড়ে দিয়েছিলেন, যা তাঁর জীবনের কাজকে পরিচালিত করেছিল। কীভাবে একটি কঠোর গোঁড়ামিহীন পারিবারিক পরিবেশে তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতা (exposure) তাঁকে চারপাশের জগতকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছিল। উদারপন্থী" (cosmopolitan) শৈলীতে বেড়ে ওঠার কারণে অলৌকিক ঘটনা, জাতিভেদ বা ভূতের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো বিশ্বাস গড়ে ওঠেনি।
অলৌকিক ঘটনার মুখোশ উন্মোচন ও আন্দোলন
মুম্বাইতে নানাবতীর কলেজ জীবনের দিনগুলি থেকে শুরু করে তাঁর যাত্রাপথের শুরু। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি তাঁর বন্ধু যুক্তিবাদী অজয়ের সাথে যৌথভাবে একটা অলৌকিক ঘটনা অনুসন্ধান কেন্দ্র ("চমৎকার চকাসানি কেন্দ্র" ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এইরকম প্রচন্ড কর্মকাণ্ডের সময় তাঁরা তথাকথিত অলৌকিক ঘটনার পেছনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শিখেছিলেন এবং তা প্রদর্শন করেছিলেন; ভণ্ড সাধু ও জাদুকরদের প্রতারণা ফাঁস করতে তাঁরা প্রায়শই তাদেরই ব্যবহৃত কৌশলগুলো প্রয়োগ করতেন।
বিজ্ঞান যাত্রার মূল দর্শন ছিল -
একজন সংশয়বাদীর কাজ মিথ্যা প্রতিপাদন বা ভুল প্রমাণের নীতিটিকে (principle of falsification) বিজ্ঞানের একটি মূল স্তম্ভ বলে বিশ্বাস করা। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা ১৯৮০-এর দশকে "বিজ্ঞান যাত্রা"র আয়োজন করেছিলেন, যার অধীনে তাঁরা গুজরাটের ৪০টিরও বেশি শহর ও গ্রামে ভ্রমণ করেন। সেখানে তাঁরা অলৌকিকতার কারবারিদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন এবং যেকোনো আসল অলৌকিক ঘটনা দেখানোর জন্য এক লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন—যে চ্যালেঞ্জটি গ্রহন করতে কাউকে পাওয়া যায়নি।। অসহায় ও দুর্বল মানুষদের শোষণ করার জন্য প্রতারক ভণ্ড সাধুদের ব্যবহৃত গোপন রসায়ন, পদার্থবিদ্যা এবং হাতের কৌশলগুলো তিনি পদ্ধতিগতভাবে জনগণের সামনে উন্মোচন করেছিলেন।
যুক্তিবাদের প্রসার ও সামাজিক আন্দোলন
১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে, তাঁর মৌলিক কাজগুলো তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা "র্যাশনালিস্ট পত্রিকা" (Rationalist Patrika)-র মাধ্যমে একটি নিয়মিত কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছিল। তীক্ষ্ণ ভাষায় লেখা প্রবন্ধগুলো সমাজে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসা শোষণগুলোকে নিশানা করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল 'পল্লী পরিবর্তন অভিযান', যা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আগুনে খাঁটি ঘি অপচয় করার বিরোধিতা করেছিল; এবং শামলাজিতে ভূত তাড়ানোর নামে আদিবাসী নারীদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর দশকব্যাপী চলা ঐতিহাসিক আন্দোলন। এই অবিরাম সক্রিয়তাই অবশেষে গুজরাটে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক 'অন্ধবিশ্বাস বিরোধী আইন' প্রণয়নের পথ সুগম করেছিল।।
আদর্শ জীবন ও ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
নানাবতী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক সততার জন্য একজন মানুষের নিজস্ব দর্শন এবং দৈনন্দিন আচরণের মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
তাঁর নিজস্ব কথায়: "যুক্তিবাদের প্রসার সবচেয়ে কার্যকরভাবে তখন ঘটবে, যখন সমাজ যুক্তিবাদী জীবনযাপন করা কিছু আদর্শ মানুষকে (মডেল ব্যক্তি) নিজের চোখে দেখতে পাবে"।
এই সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য তিনি কিছু আমূল ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যার মধ্যে ছিল খেদা জেলার একটি গ্রামে 'নাস্তিক ফার্ম' (Atheist Farm) নামে একটি বিকল্প কৃষি যৌথ খামার গড়ে তোলা এবং এমনকি দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে আইনগতভাবে নিজের পদবী পরিবর্তন করে "স্কেপটিক" (Skeptic বা সংশয়বাদী) রাখা।
সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা
গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের প্রতি এক আপসহীন নিষ্ঠার পক্ষ সওয়াল করতেন নানাবতী। সহকর্মীদের এটি মনে করিয়ে দিতে তিনি প্রায়শই বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি উক্তি উদ্ধৃত করতেন:
"কেবলমাত্র একজন অন্ধবিশ্বাসী বা বিবেকহীন(mindless) মানুষই জীবনজুড়ে একটি অপরিবর্তনশীল মতামত বজায় রাখে।"
নীরদশ্রী চৌধুরীর একটি বাক্য দিয়ে আপাতত শেষ করছি- "খ্যাতিতে বিদ্যাসাগর একক হইলেও চারিত্রিক বলে একক নহেন। এই চরিত্রের বাঙ্গালীরাই(মানুষেরাই)
বা বাঙ্গালী (মানব) সমাজে দৃঢ়তা আনিয়াছিলেন"।
-অঞ্জলি চক্রবর্তী ।
৪/৭/২৬