Society of Social Scientists - SOSS

Society of Social Scientists - SOSS Society of Social Scientists is a Social organisation with an academic purpose.

30/07/2026

"নাস্তিক ফার্ম" থেকে কুসংস্কার বিরোধী আইন: গুজরাটের কিংবদন্তি অলৌকিক-বিরোধী এক যোদ্ধার স্মৃতিচারণ"

​"যুক্তিবাদের প্রসার সবচেয়ে কার্যকরভাবে তখন ঘটবে, যখন সমাজ যুক্তিবাদী জীবনযাপন করা কিছু আদর্শ মানুষকে (মডেল ব্যক্তি) নিজের চোখে দেখতে পাবে"।

​"কেবলমাত্র একজন অন্ধবিশ্বাসী বা বিবেকহীন (mindless) মানুষই জীবনজুড়ে একটি অপরিবর্তনশীল মতামত বজায় রাখে"(বার্ট্রান্ড রাসেল)।
এই কথাগুলো কোন নেতার ভাষন নয়, সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত অন্যায় ও শোষনের শিকড়গুলো তুলতে যাঁরা নীরবে কাজ করে যান, তাঁদের একজনের বোধ ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ। তাঁরা সাধারণের মধ্যে মিশে থাকা অসাধারণ কর্মের জীবন্ত উদাহরন।
ইন্ডিয়ান রেনেসাঁ ইনস্টিটিউট (দিল্লি)-এর মিটিং এর পরে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার অবসরে প্রয়াত কিরন নানাবতীর মুখে শোনা একটা বাক্য মনকে নাড়া দিয়েছিল - ইন্টেলেকচুয়াল অনেস্টি (intellectual honesty), যা তিনি জীবনের সব কাজে প্রমাণ করে গেছেন। কিছুদিন হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর আলোকিত মনের কিরন অনুভব করেছি। অনেক পরিকল্পনার বাস্তবে পরীক্ষা চালিয়েছেন। শীঘ্রই তাঁর বাবার (মিলিটারি বিভাগে) জীবনী। নিয়ে একটি বই প্রকাশ করবেন, একথাও জানিয়েছিলেন। তারপর হঠাৎ ২০২০ অগাষ্ট মাসে তাঁর মৃত্যু সংবাদ।

সম্প্রতি তাঁর উপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ দেখে ভীষন ভালো লাগে। জীবনে কিছুই হারায় না, বিশেষত মানুষের সৎকর্ম।
৩০ জুন ,২০২৬ ,শ্রী জগজীবন প্রেরিত ইংরেজি প্রতিবেদনের তথ্য অবলম্বনে ও নেট থেকে সংগৃহীত তথ্যের সাহায্যে আমরা প্রয়াত কিরন ডি. নানাবতীর কৃতি জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাওয়ার চেষ্টা করতে পারি।
‌[২]
​গুজরাটের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে, আহমেদাবাদ ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে "এক কিরণ - র‍্যাশনালাইজম নু" --'যুক্তিবাদীতার এক আলোকরশ্মি' শিরোনামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এই বইটিতে সংকলন করা হয়েছে প্রয়াত কিরণ ডি. নানাবতীর চূড়ান্ত চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণাত্মক লেখা এবং আজীবন অবদানের কথা। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে শুরু করে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সমগ্র রাজ্য জুড়ে তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একজন অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব ।
তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সহ-আন্দোলনকারী লঙ্কেশ চক্রবর্তী কর্তৃক অত্যন্ত যত্নসহকারে এই বইটি
সম্পাদনা করেছেন এবং গুজরাটে ​'র‍্যাশনাল প্রকাশন' বইটি প্রকাশ করে রাজ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ সংস্কারের জন্য একাধারে একটি শিক্ষণীয় আলোকবর্তিকা এবং অন্যদিকে ঐতিহাসিক রোডম্যাপের দিক নির্দেশনা স্থাপন করেছে।
সংকলনটি তুলে ধরেছে কিরন নানাবতীর বহুমুখী জীবনযাত্রাকে। মূলত ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে এই কাজ শুরু হয়েছিল- আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংশয়বাদীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যখন তিনি মুম্বাইয়ের একটি অলৌকিক-বিরোধী কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন।
​অবসরপ্রাপ্ত জেএনইউ (JNU) অধ্যাপক ড. ঘনশ্যাম শাহের লেখা বইটির মুখবন্ধে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে নানাবতী কালক্রমে কঠোর সংশয়বাদ থেকে 'নতুন মানবতাবাদ'-এ (New Humanism) সমাজ দর্শনের ভাবনায় নিজেকে রূপান্তরিত করেছিলেন। কিরন
দাবি করেছিলেন যে যুক্তিবাদকে কেবল অলৌকিক চাল বা প্রতারণা ফাঁস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং প্রান্তিক মানুষের মানবাধিকারের সংগ্রামেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
​তাঁর যুক্তিবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি একজন সামাজিক গবেষক হিসাবে ক্ষেত্র- সমীক্ষায় দ্বারা নানাবতীর অমূল্য অবদানকেও এই গ্রন্থে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। যেমন, তিনি নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি নৃবিজ্ঞানী জেন ব্রেমানের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরতে সরাসরি বস্তি, ইটের ভাটা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া টেক্সটাইল মিলগুলোর ভেতরে গিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন।

​প্রকাশনা ও সহযোগী সমাজ
​অ্যাক্টিভিস্ট বা আন্দোলনকারী মহলের ব্যাপক সহযোগিতার ফলেই এই বইটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে প্রধান সাংগঠনিক ও আর্থিক দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতীক মুন্সী এবং শীলা মুন্সী।
যুক্তিবাদী নেতা গিরিশ সুন্ধিয়া, নটুভাই প্যাটেল এবং পীযূষ জাদুগরের সহায়তায় প্রাথমিক তথ্য ও উপাদানগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে মুম্বাই-গুজরাট যুক্তিবাদী সমিতির (Mumbai-Gujarat Rationalist Association) সভাপতি ড. সুজাত ওয়ালী সকলকে আন্তরিক স্বাগত জানান।
​'র‍্যাশনাল প্রকাশন' কর্তৃক ব্যক্তিগত ও অ-বাণিজ্যিক বিতরণের জন্য ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি এমন একজন মানুষের স্থায়ী স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে, যিনি যুক্তির আলোয় বিশ্বকে দেখতেন এবং অজ্ঞতার প্রাচীর ভেঙে ফেলার জন্য তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। গুজরাটের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নানাবতী কুসংস্কারবিরোধী প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং নাস্তিক ফার্ম নামে একটি নাস্তিক কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০২০ সালের ২১শে আগস্ট প্রয়াত হন।

​ কিরণ নানাবতী ১৯৫০ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মুম্বাইতে বড়ো হয়ে ওঠেন। তাঁর বাবা-মা তাঁর মধ্যে একটি অনুসন্ধিৎসু মনোভাব এবং এমন এক নৈতিক দিকদর্শন গড়ে দিয়েছিলেন, যা তাঁর জীবনের কাজকে পরিচালিত করেছিল। কীভাবে একটি কঠোর গোঁড়ামিহীন পারিবারিক পরিবেশে তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতা (exposure) তাঁকে চারপাশের জগতকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছিল। উদারপন্থী" (cosmopolitan) শৈলীতে বেড়ে ওঠার কারণে অলৌকিক ঘটনা, জাতিভেদ বা ভূতের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো বিশ্বাস গড়ে ওঠেনি।
অলৌকিক ঘটনার মুখোশ উন্মোচন ও আন্দোলন
​ মুম্বাইতে নানাবতীর কলেজ জীবনের দিনগুলি থেকে শুরু করে তাঁর যাত্রাপথের শুরু। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি তাঁর বন্ধু যুক্তিবাদী অজয়ের সাথে যৌথভাবে একটা অলৌকিক ঘটনা অনুসন্ধান কেন্দ্র ("চমৎকার চকাসানি কেন্দ্র" ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এইরকম প্রচন্ড কর্মকাণ্ডের সময় তাঁরা তথাকথিত অলৌকিক ঘটনার পেছনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শিখেছিলেন এবং তা প্রদর্শন করেছিলেন; ভণ্ড সাধু ও জাদুকরদের প্রতারণা ফাঁস করতে তাঁরা প্রায়শই তাদেরই ব্যবহৃত কৌশলগুলো প্রয়োগ করতেন।
বিজ্ঞান যাত্রা​র মূল দর্শন ছিল -
​একজন সংশয়বাদীর কাজ মিথ্যা প্রতিপাদন বা ভুল প্রমাণের নীতিটিকে (principle of falsification) বিজ্ঞানের একটি মূল স্তম্ভ বলে বিশ্বাস করা। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা ১৯৮০-এর দশকে "বিজ্ঞান যাত্রা"র আয়োজন করেছিলেন, যার অধীনে তাঁরা গুজরাটের ৪০টিরও বেশি শহর ও গ্রামে ভ্রমণ করেন। সেখানে তাঁরা অলৌকিকতার কারবারিদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন এবং যেকোনো আসল অলৌকিক ঘটনা দেখানোর জন্য এক লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন—যে চ্যালেঞ্জটি গ্রহন করতে কাউকে পাওয়া যায়নি।। অসহায় ও দুর্বল মানুষদের শোষণ করার জন্য প্রতারক ভণ্ড সাধুদের ব্যবহৃত গোপন রসায়ন, পদার্থবিদ্যা এবং হাতের কৌশলগুলো তিনি পদ্ধতিগতভাবে জনগণের সামনে উন্মোচন করেছিলেন।

যুক্তিবাদের প্রসার ও সামাজিক আন্দোলন
​১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে, তাঁর মৌলিক কাজগুলো তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা "র‍্যাশনালিস্ট পত্রিকা" (Rationalist Patrika)-র মাধ্যমে একটি নিয়মিত কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছিল। তীক্ষ্ণ ভাষায় লেখা প্রবন্ধগুলো সমাজে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসা শোষণগুলোকে নিশানা করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল 'পল্লী পরিবর্তন অভিযান', যা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আগুনে খাঁটি ঘি অপচয় করার বিরোধিতা করেছিল; এবং শামলাজিতে ভূত তাড়ানোর নামে আদিবাসী নারীদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর দশকব্যাপী চলা ঐতিহাসিক আন্দোলন। এই অবিরাম সক্রিয়তাই অবশেষে গুজরাটে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক 'অন্ধবিশ্বাস বিরোধী আইন' প্রণয়নের পথ সুগম করেছিল।।
​আদর্শ জীবন ও ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
​নানাবতী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক সততার জন্য একজন মানুষের নিজস্ব দর্শন এবং দৈনন্দিন আচরণের মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
তাঁর নিজস্ব কথায়: ​"যুক্তিবাদের প্রসার সবচেয়ে কার্যকরভাবে তখন ঘটবে, যখন সমাজ যুক্তিবাদী জীবনযাপন করা কিছু আদর্শ মানুষকে (মডেল ব্যক্তি) নিজের চোখে দেখতে পাবে"।
​এই সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য তিনি কিছু আমূল ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যার মধ্যে ছিল খেদা জেলার একটি গ্রামে 'নাস্তিক ফার্ম' (Atheist Farm) নামে একটি বিকল্প কৃষি যৌথ খামার গড়ে তোলা এবং এমনকি দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে আইনগতভাবে নিজের পদবী পরিবর্তন করে "স্কেপটিক" (Skeptic বা সংশয়বাদী) রাখা।
​সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা
​গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের প্রতি এক আপসহীন নিষ্ঠার পক্ষ সওয়াল করতেন নানাবতী। সহকর্মীদের এটি মনে করিয়ে দিতে তিনি প্রায়শই বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি উক্তি উদ্ধৃত করতেন:
​"কেবলমাত্র একজন অন্ধবিশ্বাসী বা বিবেকহীন(mindless) মানুষই জীবনজুড়ে একটি অপরিবর্তনশীল মতামত বজায় রাখে।"

নীরদশ্রী চৌধুরীর একটি বাক্য দিয়ে আপাতত শেষ করছি- "খ্যাতিতে বিদ‌্যাসাগর একক হইলেও চারিত্রিক বলে একক নহেন। এই চরিত্রের বাঙ্গালীরাই(মানুষেরাই)
বা বাঙ্গালী (মানব) সমাজে দৃঢ়তা আনিয়াছিলেন"।

-অঞ্জলি চক্রবর্তী ।
৪/৭/২৬

05/07/2026

'the captive of the past can never conquer the future'.

05/07/2026

এম. এন. রায়
মার্ক্সবাদ থেকে মানবতাবাদ
জি. পি. ভট্টাচার্য
​(ইংরেজিতে: M.N. Roy / FROM MARXISM TO HUMANISM / G.P. Bhattacharjee)

মুখবন্ধ
​ভারতীয় রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব এম. এন. রায় সবার দ্বারা প্রশংসিত হলেও, তাঁর অনুসারী ছিলেন খুব কম। তিনি বেশ কয়েকবার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছেন, তবে সত্য ও স্বাধীনতার সন্ধানে তিনি সর্বদা অবিচল ছিলেন। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে এক কিশোর হিসেবে তিনি জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। প্রায় বত্রিশ বছর বয়সের এক যুবক হিসেবে তিনি শ্রেণী নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের দিকে, যখন তাঁর বয়স প্রায় ৫৯ বছর, তখন তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মানবতাবাদী পর্বে প্রবেশ করেন। তিনি এক দশকেরও কম সময় মানবতাবাদী হিসেবে ছিলেন (১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা যান), এবং এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তিনি দলহীন এবং ক্ষমতা দখলের রাজনীতির পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক পথ দেখান। অবশ্য তাঁর মানবতাবাদী রাজনীতি ক্ষমতাশূন্য ছিল না, তবে ক্ষমতা কোনো দলের দ্বারা কুক্ষিগত করা উচিত নয়—সে দল যতই বড় হোক না কেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে এবং এই আদর্শের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকতে হলে জনগণকে ক্ষমতা নিজেদেরই প্রয়োগ করতে হবে। আধুনিক যুগের বড় দেশগুলোতে জনগণের পক্ষে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করা স্পষ্টতই সম্ভব নয়। তাঁদের এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে, তবে তাঁদের প্রতিনিধিদের অবশ্যই নিরবচ্ছিন্নভাবে জনগণের নির্দেশনায় চলতে হবে। প্রতিনিধিরা যদি কোনো দলের নির্দেশনায় চলেন, তবে সেই ব্যবস্থাটি দলতন্ত্র (Partycracy) হবে, গণতন্ত্র নয়।
জনগণের প্রতিনিধি হতে হলে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হতে হবে এবং তাঁদের দ্বারাই পরিচালিত হতে হবে। রায়ের রাজনীতি এই উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল—দলের শাসনকে জনগণের শাসনে রূপান্তরিত করা।
​একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে একজন প্রতিনিধি প্রকৃতপক্ষে তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং তিনি যে দলের অন্তর্ভুক্ত সেই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁকে দলের নির্দেশ মেনে চলতেই হবে। এটা সত্য যে, সংসদীয় গণতন্ত্র স্বতন্ত্র নাগরিকদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তাত্ত্বিকভাবে নাগরিকদের যে অধিকারগুলো পাওয়ার কথা, তা প্রয়োগ করার জন্য তাদের প্রস্তুত করতে যেমন এটি ব্যর্থ হয়, তেমনি—আমরা আগেই যা উল্লেখ করেছি—দেশের প্রশাসনে ক্রমাগত তাদের কণ্ঠস্বর তোলার সুযোগ করে দিতেও এটি ব্যর্থ হয়। জনগণের সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্র দলীয় সরকারের জন্ম দেয় এবং জাতীয় রাজনীতি দলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পর্যবসিত হয়। রায় গণতন্ত্রকে জনগণের শাসনে উন্নীত করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কীভাবে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন, তা এই বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

​রায় একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবে তাঁর জীবন শুরু করেছিলেন এবং একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবেই তিনি আমেরিকায় যান, যেখানে তিনি মার্ক্সবাদী ধারণার সংস্পর্শে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত তা গ্রহণ করেন। মার্ক্সবাদে তাঁর এই রূপান্তর পর্ব বইটির প্রথম অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তিনি প্রথমে বিদেশ থেকে ভারতে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন এবং এই প্রয়োগের পদ্ধতিটি দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ভারতে ফিরে আসার পর (ডিসেম্বর ১৯৩০) তিনি সরাসরি দেশের পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেন এবং এর ফলে তাঁর মার্ক্সবাদ প্রয়োগের পদ্ধতি একটি ভিন্ন রূপ নেয়।

শেষ পর্যন্ত তিনি এক নতুন রাজনৈতিক ভাবাদর্শের পক্ষে মার্ক্সবাদ ত্যাগ করেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম (আমূল মানবতাবাদ) বা নিউ হিউম্যানিজম (নব্য মানবতাবাদ)।​এই প্রক্রিয়াটি তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।

বইয়ের বাকি অংশ এই নতুন ভাবাদর্শের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করে—চতুর্থ অধ্যায়ে দার্শনিক দিক, পঞ্চম অধ্যায়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, ষষ্ঠ অধ্যায়ে রাজনৈতিক দিক এবং সপ্তম অধ্যায়ে অর্থনৈতিক দিক।
একটি সংক্ষিপ্ত সমাপনী অধ্যায়ের মাধ্যমে বইটি শেষ হয়েছে।
​বইটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমি নৃপেন চৌধুরী এবং কানাই পালের কাছ থেকে অকুণ্ঠ সাহায্য পেয়েছি, যাঁদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
​জি. পি. ভট্টাচার্য

[ সম্পূর্ন গ্রন্থটি এখন বাংলায় পাওয়া যাবে।]

04/07/2026

ব্যক্তিবাদের (Individualism) পুনঃ: বিবৃতি
রায়ের চিন্তাধারা যাতে ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করা হয়, সেজন্য এই পর্যায়ে তিনটি সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ জরুরি। প্রথমত, রায়ের ব্যক্তিবাদকে (Individualism) কোনোভাবেই 'অহং-কেন্দ্রিকতা' (ego-centrism) হিসেবে দেখা যাবে না। সমাজ মানেই হলো সমবায়ভিত্তিক জীবন; আর সমাজে বসবাস করা যেহেতু ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য অপরিহার্য, তাই রায় বলেছিলেন, মানুষকে "অন্যান্য মানুষের প্রয়োজন, আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের সাথেও নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়।"
​দ্বিতীয়ত, রায় ব্যক্তিদের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা এবং ব্যক্তিদের সঠিক সীমার মধ্যে রাখার জন্য আইন ও বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেননি। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন:
​"যখন বিপুল সংখ্যক মানুষ একসাথে বাস করে, তখন মানুষের উন্নয়ন অসম হওয়ার কারণে সবসময়ই সংঘাতের সম্ভাবনা থাকে, যা এমনকি সহিংস রূপ নিতে পারে। ফলে, রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সবসময়ই থাকবে।"

​রায় কোনো নৈরাজ্যবাদী (Anarchist) ছিলেন না এবং মানুষের আচরণের ওপর থেকে সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার পক্ষেও ছিলেন না।

​তৃতীয়ত, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধানগুলো মানুষের পক্ষে স্বেচ্ছায় মেনে চলা ক্রমবর্ধমানভাবে সম্ভব হতে পারে। মানুষের যৌক্তিক এবং নৈতিক বোধের বিকাশের সাথে সাথে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছাতেই আইন ও নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে। তিনি বলেন:
​"যেহেতু সমাজ গঠনের মূল প্রেরণা হলো স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা... তাই ব্যক্তির সামাজিক দায়িত্ব বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় এটি স্বেচ্ছায় পালিত হতে বাধ্য; কারণ সমাজের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বিবর্তন প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য অপরিহার্য। তাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা সামাজিক দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।"

​এখানে রায় নৈরাজ্যবাদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, যদিও তিনি বলেছিলেন যে সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে 'রাষ্ট্র' সবসময়ই থেকে যাবে। বাকুনিন-ক্রোপোটকিন ঘরানার নৈরাজ্যবাদীদের মতো তিনি মনে করতেন না যে রাষ্ট্র ও সরকারের বিদ্যমান দমনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে পূর্ণ সামাজিক সহযোগিতা ও পারস্পরিকতার যুগে পৌঁছানো সম্ভব। বরং তিনি মনে করতেন, এটি সম্ভব কেবল নারী ও পুরুষের নৈতিক বোধ বিকাশের মাধ্যমে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন:
​"আমি মনে করি যে, সমাজের সাথে এবং নিজের সাথে শান্তিতে বসবাস করা এবং নৈতিক ও বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ করা বহুলাংশে ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে।"

04/07/2026

সমাজের মতো রাষ্ট্রও মানুষেরই সৃষ্টি। তিনি রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন 'একটি মানব সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সংগঠন' হিসেবে। তাঁর মতে, মানুষ দুটি প্রয়োজনে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল—প্রথমত, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি পরিচালনা এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা; এবং দ্বিতীয়ত, সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। সুতরাং, স্বাধীনতার সন্ধানে মানুষ নিজের স্বার্থেই রাষ্ট্র গঠন করেছিল। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা শ্রেণি কর্তৃক সমাজকে শাসন করার জন্য রাষ্ট্রকে উপর থেকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিপীড়নমূলক প্রতিষ্ঠান ছিল না, কিংবা এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সম্পাদিত কোনো বিশেষ চুক্তির ফলও ছিল না। 'রাষ্ট্র ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া যা প্রায় যান্ত্রিকভাবেই ত্বরান্বিত হয়েছিল—সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা এবং জনহিতকর কাজ পরিচালনার জন্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির মাধ্যমে।

' রাষ্ট্র সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয় ছিল না, এবং তাই এটি মানুষের স্বাধীনতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব (রাষ্ট্র হলো শ্রেণি শোষণের যন্ত্র) কিংবা ধ্রুপদী উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি (রাষ্ট্র হলো একটি প্রয়োজনীয় মন্দ বা necessary evil)—এর কোনোটিই গ্রহণ করা হয়নি।
সমাজ গঠনের পর মানুষ তার অস্তিত্ব এবং বিকাশের প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। রাষ্ট্র ছিল এই 'প্রতিষ্ঠানগুলোর' মধ্যে একটি, কিন্তু একে 'সর্বাত্মক গুরুত্ব' (totalistic significance) দিয়ে রায় লিখেছেন-
রাষ্ট্র অনেকগুলি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, যার প্রতিটিই তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে—অর্থনৈতিক, শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক—সমভাবে স্বায়ত্তশাসিত ছিল।"

04/07/2026

"জৈবিক বিবর্তনের পটভূমি থেকে বেরিয়ে এসে মানব প্রজাতি একক ব্যক্তি হিসেবেই তার সংগ্রাম শুরু করে।" তাঁর মতে, মানুষ সমাজ সৃষ্টি করেছিল অস্তিত্ব রক্ষার এই সংগ্রামকে-(যা সে একজন ব্যক্তি হিসেবে শুরু করেছিল)—আরও সফল এবং কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য। অন্য কথায়, সমাজের এই সৃষ্টির নেপথ্যে ছিল মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।

02/07/2026

Man will be moral if he can respect himself and remain loyal to his own conscience. Man, therefore, must be made conscious of his own self if the problem of morality is to be solved. It is true that in some cases immorality results frome objective condition such as poverty. Its solution lie in changing the environment. But all cases of immorality can not be explained by the environmental factor. Much depends upon the character of man -- his inordinate ambition for wealth and power, callous disregard of the legitimate rights of others, cynical attitude to universal moral values etc. The basic moral problem cannot be solved unless the character of man is reformed. It involves a training of the will and education in values. This training will be secular in character and would awaken the conscience of man which would serve as the best policeman. In an atmosphere of all-pervading corruption and dishonesty, Roy retained his faith in man, because he thought him essentially rational and potentially moral.

01/07/2026

For his existence and prosperity man tries not simply to adjust himself to environment but also to change the environment and to create conditions favourable for his development. Man can change the vironment because he possesses a developed brain which enables him to know the laws and principles operating in nature.
In order to realise his freedom (that is, to unfold his potentialities) man, therefore, tries to find out the laws of Nature.

01/07/2026

Because of his highly developed brain and complex nervous system, man feels within himself innumerable desires of various kinds.
He wants to have a comfortable physical existence, to think freely on subjects of his interest, to express his thoughts and feelings through various media etc.
This urge of man for development in multifarious directions has been called by Roy the urge for freedom. This will to freedom has a biological origin since it is a continuation of the animal urge for existence.
In man this urge for existence develops into the urge for freedom. Freedom has been defined as "progressive disappearance of all restrictions on the unfolding of the potentialities of individuals as human beings.12
The urge for freedom, therefore, is the urge of the individual to unfold his potentialities.

22/05/2026

(৮)

রোমান্টিকতাবাদ এবং এম. এন. রায়ের ইতিহাস দর্শন:)

আর্ভিং ব্যাবিটের (Irving Babitt) ভাষায়, "কোনো বিষয় তখনই রোমান্টিক হয়ে ওঠে, যখন তা রোমাঞ্চের নেশায় কার্যকারণ সম্পর্কের স্বাভাবিক ধারাকে লঙ্ঘন করে"। এটি অদ্ভুত, অভাবিত, তীব্র, অত্যুচ্চ, চরম এবং অনন্য; সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি সর্বদা রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর কিছুর জন্য ক্ষুধার্ত এবং সংশোধনাতীত অতি নাটকীয়”। রোমান্টিকতাবাদ রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পরিবর্তে মধ্যযুগ থেকে অনুপ্রেরণা আহরণ করতে চায়—যেখানে আধিপত্য ছিল বীর যোদ্ধা ও বীরত্বগাথা, গভীর অরণ্য, দুর্গ এবং ড্রাগন জগতের।
​রোমান্টিকতাবাদ আসলে মানবপ্রকৃতির অযৌক্তিক বা যুক্তিবহির্ভূত বিভিন্ন দিকের বহিঃপ্রকাশ। রেইনহোল্ড নিবুর-এর (Reinhold Niebuhr) মতে, এটি হলো "যৌক্তিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে সৃষ্ট অবসাদের বিপদের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রাণশক্তির এক বলিষ্ঠ ঘোষণা"। এটি মূলত বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আবেগগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার বা সেগুলো সৃষ্টির ক্ষেত্রে 'যুক্তির ভণ্ডামিকে' উন্মোচন করার একটি প্রচেষ্টা “। রোমান্টিকতাবাদ অন্তহীন বৈপরীত্য এবং অস্পষ্টতায় ঘেরা, কারণ রোমান্টিকরা বিশ্বাস করেন যে জীবন নিজেই স্ববিরোধী এবং রহস্যময়। তারা একদিকে যেমন ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ান, আবার ঠিক তেমনি ‘নিয়তি’ বা ভাগ্যেও বিশ্বাস রাখেন। তারা যেমন এই বাস্তব জগতকে ভালোবাসেন, তেমনি আবার অতিন্দ্রীয় বা পারলৌকিক জগতের পেছনেও ছোটেন। তারা বিপ্লবকে স্বাগত জানান, অথচ একইসাথে অতীতের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। রোমান্টিকতাবাদ যুক্তিবাদী হিসাব-নিকাশ এবং বিশ্লেষণকে অস্বীকার করে। প্রকৃতপক্ষে, এম. এন. রায় যখন ‘প্রকৃত রোমান্টিকতাবাদ’-এর সাথে ‘যৌক্তিকতা’র সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি আসলে রোমান্টিক আন্দোলনের মূল সুরটিকেই নাকচ করে দিয়েছিলেন।

(এম. এন. রায় এবং মার্ক্সীয় ইতিহাসতত্ত্বের সমালোচনা:)

এম. এন. রায় মার্ক্সীয় ইতিহাস ব্যাখ্যার বিকল্প হিসেবে তাঁর নিজস্ব 'ইতিহাসতত্ত্বের নীতি' (Principles of Historiology) প্রণয়ন করেন। কার্ল মার্ক্সের ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাকে তিনি মানব স্বাধীনতার পরিপন্থী, যৌক্তিকভাবে ভ্রান্ত, ঐতিহাসিকভাবে অচল এবং স্ববিরোধী হিসেবে বিবেচনা করতেন। এটি মানব স্বাধীনতার প্রতিকূল, কারণ এটি মানব ইতিহাসকে এমন এক অনিবার্য প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে যা অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা দ্বারা নির্ধারিত; যেখানে মানুষকে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়।
​রায়ের যুক্তি ছিল, "যদি সবকিছুই অর্থনৈতিকভাবে নির্ধারিত হয়, তবে মানুষ কীভাবে ইতিহাস তৈরি করবে? ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটবে, মানুষের সেখানে কিছুই করার থাকবে না। সে হবে 'অর্থনৈতিক বিধাতা'র হাতের এক ক্রীড়নক মাত্র"। রায় কার্ল মার্ক্সের এই অর্থনৈতিক নিয়তিবাদকে (Economic Determinism) "মানব ইতিহাসে প্রয়োগকৃত হেগেলবাদ"(Hegelianism applied to human history") হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে মার্ক্স কেবল 'বিশ্ব আত্মা'র (World Spirit) স্থলে 'অর্থনৈতিক শক্তি'কে (Economic Force) প্রতিস্থাপন করেছেন।
​ রায়ের মতে, অর্থনৈতিক নিয়তিবাদের এই মতবাদটি 'অনবস্থা দোষ' (Regresso ad Infinitum) বা অন্তহীন পশ্চাদ্ধাবনের ত্রুটিতে দুষ্ট। মার্ক্স অর্থনৈতিক উৎপাদন পদ্ধতির প্রেক্ষাপটে সমাজের বিবর্তন ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু রায় প্রশ্ন তুলেছিলেন— "প্রথম উৎপাদনের মাধ্যম কে এবং কীভাবে তৈরি করেছিল" ? আদিম উৎপাদনের মাধ্যম তৈরির আগে অবশ্যই মানুষের মস্তিষ্কে একটি 'ধারণা'র (Idea) উদয় হয়েছিল। উৎপাদনের অর্থনৈতিক উপায়গুলো সামাজিক বিবর্তনের প্রারম্ভিক বিন্দু হতে পারে না, কারণ মানুষ যখন পৃথিবীতে প্রথম এসেছিল, তখন এই উপায়গুলো তার সাথে ছিল না। সামাজিক বিবর্তনের প্রারম্ভ বিন্দুটি খুঁজতে হবে মানুষের নিজের মধ্যে—তার মস্তিষ্কের গভীরে, যা "মানুষ নিজে তৈরি করেনি, বরং তার প্রাণিকুলীয় পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে"। এই মস্তিষ্ক দিয়েই মানুষ প্রথম উৎপাদনের উপকরণ তৈরি করেছিল এবং উৎপাদনের সেই উপকরণের ক্রমবিকাশ কেবল নতুন নতুন চিন্তা ও ধারণার মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মার্কসবাদ উৎপাদনের উপকরণের উদ্ভব ও বিকাশের নেপথ্যে মানুষের ধারণার ভূমিকাকে স্বীকার করার পরিবর্তে, সেগুলোকে উৎপাদনের উপরি-কাঠামো (superstructure) হিসেবে বিবেচনা করেছে।
কার্ল মার্কস তাঁর অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের তত্ত্বের ভিত্তিতে মানব সমাজের ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, কিন্তু ইতিহাস তাঁর সেই বাণীকে মান্যতা দিতে অস্বীকার করেছে। রায় উল্লেখ করেছেন যে, রুশ বিপ্লব নিজেই "মার্কসবাদী বিপ্লবের কাঠামোর সাথে খাপ খায় না"। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন: "সর্বহারা বিপ্লব যদি মার্কসীয় পূর্বাভাস অনুযায়ী বিকশিত হতো, তবে এটি আধুনিক বিশ্বের কোনো অনগ্রসর জনপদের পরিবর্তে ইংল্যান্ডের মতো শিল্পোন্নত দেশে প্রথম ঘটা উচিত ছিল। রুশ বিপ্লব ছিল একটি আকস্মিক ঘটনা—কিছু পরিস্থিতির দৈব সংযোগের ফল। ফলস্বরূপ, এটি নিজেই ঐতিহাসিক নির্ধারণবাদের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অস্বীকার করে"। রাশিয়ায় সর্বহারা বিপ্লবের এই "অ-ঐতিহাসিক বিজয়"-এর পরপরই এটি জার্মানিতে ব্যর্থ হয়, অথচ "মার্কস যদি মিথ্যা নবী না হতেন, তবে সেখানেই এর জয়লাভ করার কথা ছিল"। পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মার্কসীয় ভবিষ্যদ্বাণী এবং সমাজতন্ত্র দ্বারা পুঁজিবাদের অনিবার্য প্রতিস্থাপনের তত্ত্বটিও ইতিহাস দ্বারা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
রায় মার্কসবাদকে একটি স্ববিরোধী দর্শন হিসেবেও অভিযুক্ত করেছেন। মার্কস পুঁজিবাদ ধ্বংস করে এক নতুন সামাজিক ব্যবস্থা গড়ার জন্য সশস্ত্র বিদ্রোহের ওকালতি করেছিলেন, আবার একই সাথে পুঁজিবাদের পতন এবং সমাজতন্ত্রের উত্থানকে অনিবার্য বলে মনে করতেন। রয়ের মতে, "যদি কোনো সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষয় এবং বিলুপ্তি অনিবার্যই হয়, তবে তাকে উৎখাত করার জন্য সহিংস বিপ্লব স্পষ্টতই অনাবশ্যক। বিপরীতক্রমে, পরিবর্তন যদি শক্তির মাধ্যমেই আনতে হয়, তবে তা আর অনিবার্য থাকে না; কারণ উন্নততর শক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সেই পরিবর্তনকে রুখে দেওয়া সম্ভব"।
রায় মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বেরও কড়া সমালোচনা করেছিলেন। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে লড়াইয়ের অস্তিত্ব অস্বীকার না করেই তিনি মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বকে বর্জন করেন—বিশেষ করে এই ধারণাটি যে, শ্রেণিসংগ্রামই সমাজের যাবতীয় প্রগতির একমাত্র চালিকাশক্তি। রায় যুক্তি দিয়েছিলেন, "যদি শ্রেণিসংগ্রামই সামাজিক অগ্রগতির একমাত্র পথ হয়, তবে একটি শ্রেণিশূণ্য সমাজ বা সাম্যবাদ অনিবার্যভাবেই একটি স্থবির সমাজকে নির্দেশ করবে"। শ্রেণী ও শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কে তিনি তাঁর অভিমত এভাবে ব্যক্ত করেছেন: "সমাজ নিঃসন্দেহে সব সময় বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল এবং সেই শ্রেণীগুলোর স্বার্থ ছিল পরস্পরবিরোধী। কিন্তু একই সাথে সমাজে একটি সংহতিমূলক প্রবণতাও ছিল, যা সমাজকে একত্রে ধরে রাখত। তা না হলে সমাজ বারবার ভেঙে চুরমার হয়ে যেত এবং কোনো সামাজিক বিবর্তনই ঘটত না"।
ইতিহাসের মার্কসীয় ব্যাখ্যার বিষয়ে রায়ের সমালোচনা ছিল অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং যুক্তিনির্ভর; তবে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে মার্কসবাদের চিরস্থায়ী অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানের ইতিবাচক অবদান ছিল মানুষের চিন্তা ও ইতিহাসের বিকাশের ওপর আর্থ-সামাজিক উপাদানগুলোর প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া, যদিও ভাববাদকে (idealism) প্রতিহত করার উৎসাহে মার্কস একটি চরম অবস্থানে চলে গিয়েছিলেন। সাধারণ নীতি হিসেবে রায় ইতিহাস গঠনের ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা এবং সামাজিক উপাদান—উভয়ের গুরুত্বই স্বীকার করেছেন।।>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
সমাপ্ত।

Address

Kolkata

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Society of Social Scientists - SOSS posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share