22/08/2026
আজ ২২ অগস্ট। বাংলার রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে যে নামটি একবার উচ্চারিত হলেই চুপ হয়ে যেতে হয়, সেই মানুষটির জন্মদিন। শম্ভু মিত্র।
অনেকেই তাকে চিনেন বহুরূপীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে, নবান্নের সেই অমর নির্দেশক হিসেবে, রক্তকরবী বা রাজা অয়দিপাউসের সেই অবিস্মরণীয় উপস্থাপনার পেছনের মানুষ হিসেবে। কিন্তু তার জীবনের অনেক কথা এখনও খুব কম মানুষের জানা। আজ তার জন্মদিনে সেই অজানা দিকগুলো একটু খুলে বলি।
১৯১৫ সালের আজকের এই দিনে কলকাতার ডোভার রোডে জন্ম হয়েছিল তার। বাবা শরৎকুমার মিত্র ছিলেন জিওলজিক্যাল সার্ভের কর্মী, মা শতদলবাসিনী। মাত্র বারো বছর বয়সে মা হারিয়েছিলেন তিনি। সেই শূন্যতা হয়তো সারা জীবন তাকে একটু অন্যরকম মানুষ বানিয়ে রেখেছিল। স্কুলের দিনগুলোতেই নাটকের প্রতি টান তৈরি হয়েছিল। কলেজ ছেড়ে দিয়ে বাণিজ্যিক থিয়েটারে ঢুকেছিলেন। কিন্তু সেখানকার স্টেরিওটাইপড নাটক আর মেলোড্রামা আর সহ্য হচ্ছিল না। একের পর এক থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন।
১৯৪৩-৪৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় গণনাট্য সংঘে যোগ দিয়ে বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে নবান্ন মঞ্চস্থ করেছিলেন। সেই নাটক শুধু একটা প্রযোজনা ছিল না, বাংলা নাটকের ইতিহাসে একটা বাঁক ছিল। কিন্তু দলীয় রাজনীতির চাপ আর শিল্পের স্বাধীনতার দ্বন্দ্বে তিনি আর থাকতে পারলেন না। ১৯৪৮-এ কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে বহুরূপী গড়ে তুললেন। শুরুর দিনগুলোতে এতটাই অভাব ছিল যে তিনি আর তৃপ্তি মিত্র অনেকদিন শুধু চা আর সেদ্ধ সবজি খেয়ে কাটিয়েছেন। ফিল্মের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন।
বাইরে থেকে দেখলে তিনি ছিলেন খুব কঠোর, শৃঙ্খলাপ্রিয়। রিহার্সালে পাঁচ মিনিট দেরি হলে আর ঢুকতে দিতেন না। কিন্তু পরিবারের লোকেরা বলেন, ভিতরে তিনি ছিলেন একেবারে অন্য মানুষ। পাড়ার প্লাম্বার, ঝাড়ুদার, ইলেকট্রিশিয়ানের সঙ্গে গল্প করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারা বলত, “দাদা আপনি যদি একদিন ভোটে দাঁড়ান, আমরা সবাই ভোট দেব।” তিনি শুধু হাসতেন। ভুল করে কাউকে ধমক দিলে পরে নিজে গিয়ে ক্ষমা চাইতেন। এমন মানুষ খুব কম দেখা যায়।
১৯৬৪-তে রাজা মঞ্চস্থ করার পর তিনি নিজেই চেয়েছিলেন থিয়েটার ছেড়ে দিতে। তখন তার বয়স মাত্র ৪৯। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে আরও অনেকদিন ধরে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯-এ বহুরূপী থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই আঘাত তিনি কোনোদিন প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেননি। চুপ করে সরে গিয়েছিলেন। কন্যা শাঁওলী মিত্র পরে বলেছেন, বাবা কোনোদিন অভিযোগ করেননি, শুধু নিঃশব্দে সব সহ্য করেছেন।
জীবনের শেষের দিকে তিনি কয়েকবার ইচ্ছাপত্র লিখে রেখেছিলেন। চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর যেন কোনো হইচই না হয়। রবীন্দ্রসদনে দেহ রাখা যাবে না, কোনো শোভাযাত্রা হবে না, কোনো গান স্যালুট হবে না। রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে রাত দুটোর পর যখন তিনি চলে গেলেন, তখন তার সেই ইচ্ছাই পালন করা হয়েছিল। ভোর হওয়ার আগেই শ্মশান শেষ। সকালে মানুষ যখন খবর পেল, তখন আর কিছু করার ছিল না।
এমন মানুষ আর হয় না। যিনি মঞ্চে যতটা জোরালো ছিলেন, জীবনে ততটাই নীরব। যিনি শিল্পের জন্য সবকিছু দিয়েছেন, কিন্তু নিজের জন্য কিছুই চাননি।
আজ তার জন্মদিনে শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেই হয় না। একটু ভেবে দেখা দরকার— আমরা কি তার মতো নির্লিপ্ত থাকতে পারি? সত্যের জন্য একা দাঁড়াতে পারি? আর সবকিছুর শেষে নিঃশব্দে চলে যেতে পারি?
শম্ভু মিত্রকে গভীর শ্রদ্ধা।
তার অজানা গল্পগুলো এখনও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।