04/11/2025
#জঙ্গলমহল_কলকাতার_চেয়ে_অনেক_ভালো — এই কথাটি শুনে অনেকেই অবাক হয়। কিন্তু যে কেউ যদি একবার মন খুলে, পক্ষপাতহীনভাবে দুই জায়গার তুলনা করে, তাহলে বুঝতে পারবে যে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, সামাজিক ভারসাম্য, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের দিক থেকে জঙ্গলমহল আসলে কলকাতার চেয়ে অনেক এগিয়ে।
জঙ্গলমহলের পাহাড়, শাল-পিয়াল-মহুয়ার বন, নদী আর মাটির রঙই বলে দেয়, এ অঞ্চলে এখনো প্রকৃতি বেঁচে আছে। যেখানে কলকাতার বাতাসে প্রতিদিন গড়ে ২০০-এর ওপর AQI, সেখানে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামের বনের বাতাসে সেই সূচক ৫০-এর নিচে। শহরে আকাশে ধোঁয়া, নদীতে নোংরা জল, আর গ্রামে এখনো কোকিলের ডাক, কুলের গাছ, ঝরনার জলের স্রোত। এখানকার মাটি লাল, কিন্তু প্রাণ সবুজ।
কলকাতায় মানুষ দৌড়োয় — বাস ধরতে, ট্রেন ধরতে, চাকরি বাঁচাতে, নাম কামাতে। জঙ্গলমহলে মানুষ এখনো বাঁচে — মাঠে ধান কাটে, মেলায় গিয়ে গান গায়, পাড়ার মেয়েরা একসঙ্গে মাদল বাজায়। শহরের জীবন গতি দেয়, কিন্তু শান্তি কেড়ে নেয়। গ্রামীণ জীবন ধীর, কিন্তু মানবিক। কলকাতার বহুতল বাড়িতে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ চেনে না একে অপরকে, আর জঙ্গলমহলের গ্রামে এখনো বাড়ির চুলায় রান্না হলে পাশের বাড়িতে থালা যায় ভাগ করে।
জঙ্গলমহল কেবল প্রাকৃতিক নয়, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বাংলার আসল ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। এখানে কুড়মালি, সাঁওতালি, কুড়মি, বাংলা সব ভাষা একসঙ্গে বেঁচে আছে। ছৌ নাচ, টুসু, ভাদু গান, মাদলের তালে তালে একতা — এইগুলিই বাংলার প্রাণ। কলকাতার থিয়েটার, পপ গান, বা আড্ডা এগুলো শহুরে অভিজাত সংস্কৃতি, কিন্তু মাটির গন্ধ নেই তাতে। জঙ্গলমহল সেই গন্ধই ধরে রেখেছে, যেখানে দেবতা মানে গরম থানের নিচের সাল গাছ, আর উৎসব মানে প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও জঙ্গলমহল অবহেলিত হলেও সম্ভাবনাময়। মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ, ফুল ও গাছের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, আর প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন — এগুলো যদি সঠিক পরিকল্পনায় কাজে লাগানো যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই এখানকার মানুষ আত্মনির্ভর হতে পারে। এখানকার জীবনের খরচ শহরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম, অথচ জীবনযাত্রার মানে শান্তি ও সততা অনেক বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও এই অঞ্চলের মানুষ এগিয়ে। এখানে রাত মানে সত্যি রাত — তারা দেখা যায়, আকাশ দেখা যায়, নিঃশব্দতা শোনা যায়। কলকাতায় রাত মানে গাড়ির হর্ন, আলো আর অনিদ্রা। শহরের মানুষ সাইকিয়াট্রিস্ট খোঁজে, গ্রামের মানুষ সন্ধ্যাবেলায় পুকুরঘাটে বসে গান ধরে — "ঝুমইর যে জন গাহে তারে বলিহারি , ঝুমইর গাহা বড়ই ... "।
সবশেষে একটা বড় সত্য — পৃথিবী যত এগোচ্ছে, টেকসই জীবনের গুরুত্ব তত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে যেখানে শহর ভাসে বৃষ্টিতে, হাঁপায় গরমে, সেখানে জঙ্গলমহল এখনো প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখে টিকে আছে। এ অঞ্চলের মানুষ কম ভোগে, কিন্তু বেশি বাঁচে। তাদের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এটাই ভবিষ্যতের সভ্যতার শিক্ষা।
কলকাতা হোক সভ্যতার প্রতীক(???), কিন্তু জঙ্গলমহলই বাংলার আত্মা। শহর গড়েছে ইট দিয়ে, জঙ্গলমহল গড়েছে গান, গাছ আর ঘামের গন্ধে। একদিকে বাহুল্য, অন্যদিকে মৌলিকতা — আর এই মৌলিকতার কারণেই জঙ্গলমহল এখনো কলকাতার চেয়ে সুন্দর, সজীব ও শ্রেষ্ঠ।
বি: দ্র:- এটা যারা জঙ্গলমহল চেনে না তাদের জন্য