15/04/2021
*দ্বেষ, হিংসা, বিভেদের বিপরীতে*
বাংলার প্রাণ, বাংলার মন, বাংলার ঘরে যত ভাই বোন--
"এক হউক, এক হউক, এক হউক..."
আমাদের এই বাংলা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। কোনো কিছুই একদিনে গড়ে ওঠেনা। সুদীর্ঘ দিনের মানুষের মেহনত, মানুষের সম্মিলিত জীবনচর্যা এবং তা থেকে গড়ে ওঠা জ্ঞান দিয়ে এক-একটা দেশ গড়ে ওঠে। ঠিক তেমনই আমাদের এই বাংলা। নদীমাতৃক বঙ্গভূমিকে দীর্ঘকাল ধরে সোনার ফসলে ভরে রেখেছে কৃষিজীবী মানুষের শ্রম। অন্যদিকে চা-পাট-ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের হাত ধরে মেহনতী বাংলার মানচিত্রে ভীড় জমিয়েছে ভারতবর্ষের নানা ভাষা-সংস্কৃতির মানুষ। আবার শহর কলকাতা ঘিরে যে হরেক কিসিমের মানুষের হরেক রকম জীবনগাথার এক অনবদ্য ইতিহাস, সেও তো কম দিনের নয়। এই ইতিহাসের যারা চরিত্র, যারা কারিগর, তাদের সকলেরই মুখের ভাষা/মাতৃভাষা বাংলা-ই ছিল, এমনটা কিন্তু নয়। অথচ ভারী অদ্ভুত বিষয়টি হল, এই ইতিহাস বাংলার ভাষা-সংস্কৃতিরই ইতিহাস।
বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির ইতিহাস একবগ্গা ভাষা-আগ্রাসনের বা ভাষা-সর্বস্বতার ইতিহাস নয়। বরং তা একটি দীর্ঘকালীন, বৈচিত্র্যপূর্ণ, সহগামী, সমাজ-সাংস্কৃতিক যৌথ যাপন গ'ড়ে ওঠার ইতিহাস, যার সামাজিক ভিত্তিভূমি হয়ে থেকেছে এই বাংলার মাটি এবং সাংস্কৃতিক যোগসূত্র হয়ে থেকেছে বাংলা ভাষা। সে কারণেই বাংলার মুখে পৃথিবীর মুখ অনায়াসেই দেখতে পান কবি। তুলসীদাসী রামায়ণের সুর রবীন্দ্রনাথের বাংলায় এসে হয়ে যেতে পারে “বিস্মিত নিমেষহত বিশ্ব চরণে বিনত,/ লক্ষশত ভক্তচিত বাক্যহারা॥/ বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা”।
অনন্ত আনন্দধারা কোন বাংলা দিয়ে বয়ে চলে? কী সেই বাংলার মানে? কোন বাংলা উদযাপনমুখর? কোন সে বাংলা-ভাবনা, যা আমাদের সকলের শিরা-ধমনী-রক্তজালিকায় সৃষ্টি করেছে অনুরণন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বাস্তবের অনুভূতি-অভিজ্ঞতায় কীভাবে আমাদের রোজনামচায় ছাপ রেখে যায় এই বাংলা? বলাই বাহুল্য, এই বাংলার বহু বহু অর্থ হতে পারে।
বাংলা মানে শ্রীচৈতন্যের সীমানাভাঙা প্রেম বিলোনো। বাংলা মানে লালন সাঁইয়ের মনের মানুষের মিলনমেলা। বাংলা মানে বহুরূপী-সাজে শিব-দুর্গাকে প্রতিবেশী করা। বাংলা মানে পীরের লাল শালুতে নিজের সঞ্চয় অর্পণ। বাংলা মানে রাঙামাটির ধুলোয় বাউলের মনভেজানো সুর। বাংলা মানে আজান শুনে চাষী-মজুরের প্রহর গোনা। বাংলা মানে আলকাপ-গম্ভীরা-ভাদু-টুসু-ছৌ-কারাম-ভাওয়াইয়া। বাংলা মানে হারমোনিকা-গীটার-বাঁশি-একতারা, বাংলা মানে ধামসা-মাদল-খোল-করতাল আর মন্দিরা।
বাংলা মানে হাজার সুরে মা-কে ডেকে বায়না করা, "আসছি" ব'লে সহজিয়া হাতছানিতে বেরিয়ে পড়া। বাংলা মানে কফিহাউস, পুকুরঘাটের কূটকচালি, বাংলা মানে তর্কজীবন, অবিশ্বাসের অলিগলি। বাংলা মানে কালবোশেখী, আম-কুড়োনো অপরাজিত, ছোটো-বড়োর ভেদ ঘুচিয়ে ভো-কাট্টা ঘুড়ির সুতো। বাংলা মানে ইস্টবেঙ্গল, রিফিউজিদের মাথা-তোলা, বাংলা মানে মোহনবাগান, ব্রিটিশ মেরে এগিয়ে চলা। বাংলা মানে বৃষ্টি-বাদল, উপচে পুকুর পুঁটি-ল্যাটা, বাংলা মানে ঈদের সিমাই, বড়দিনে কেকটি কাটা। বাংলা মানে চড়ক মেলা, পিঠেপুলি হুলের শপথ, বাংলা মানে ছট-ঠেকুয়া, গাজন মেলা কতশত।
এই বাংলার আসল 'রাম' ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ রাজা রামমোহন। বীরসিংহের সিংহশিশু ঈশ্বরচন্দ্র এই বাংলার চির-চেনা 'ঈশ্বর'। আচার্য জগদীশের 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' হল এই বাংলার জ্ঞান 'মন্দির'। এই বাংলায় রাখী মানে জোড়াসাঁকো থেকে নাখোদা প্রতিবাদ-মিছিলে রবীন্দ্রনাথ। এই বাংলায় নারী মানে আগল-ভাঙা কাদম্বিনী। এই বাংলায় বিদ্রোহিনী প্রীতি-বীণা-মাতঙ্গিনী।
এতেও কী বলে ওঠা গেল এই বাংলার সবটুকু? নিঃসন্দেহে না। অগণিত বৈচিত্র্যে, সহ-উদযাপনে ঐক্যকে সমৃদ্ধ করার পূণ্যভূমি আমাদের বাংলা। প্রবল চেষ্টা করেও মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশ আমাদেরকে কেরানীসুলভ একটামাত্র ধাঁচে আটকে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে একদিন। আজও তাই কোনো এক হিন্দুত্ব-নামধারী একত্ববাদী আধিপত্য আমাদের ওপর চেপে বসতে পারবে না।ব্রিটিশ ভারতে প্রথম মেহনতি মানুষের প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছিল এই বাংলায় পালকির বেহারারাদের সংঘবদ্ধ উদ্যোগে। বাংলার আপোষহীন প্রতিবাদী চরিত্রকে কোনোদিনই ভেঙে দেওয়া যায়নি কোনো সাম্প্রদায়িক তাস খেলে। ৪৬-এর ভাতৃঘাতি দাঙ্গার আবহে ট্রাম-শ্রমিকদের মহল্লায় মহল্লায় পাহাড়া দেওয়া রাতগুলোতেই জেগে থাকে নিরন্তর প্রবাহমান বাংলা-ভাবনা। প্রগতিশীল রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা, মুক্তচিন্তা, বহুবিধ সৃজন-প্রবণতা ও আপোষহীন সংগ্রামের যুগ-যুগান্তব্যাপী ঐতিহ্য ও পরম্পরার সূত্রেই আমাদের বাংলা-ভাবনা। এই পথচলার মধ্যেই এসেছেন শ্রীচৈতন্য, এসেছেন রামমোহণ-বিদ্যাসাগর-রোকেয়া-রবীন্দ্রনাথ.... এসেছেন অকুতোভয় বিপ্লবীরা। চলতে থেকেছে নিরন্তর ইতিবাচক ঐতিহ্যের নিয়ত পদচারণার ধারা।
এই ইতিবাচক নিরন্তরতাবোধকেই আমরা উদযাপনের কথা বলছি৷ বলছি নতুন কিছু আবিষ্কার বা খোঁজের যে আনন্দ বাংলার পথচলার হৃদয়জুড়ে থেকেছে, তাকে উদযাপন করার। বলতে চাইছি, বাংলার সমাজের বহুস্তরে বিন্যস্ত মানুষের সম্মিলিত এই চিরনতুন যাত্রাপথ অক্ষয়। পয়লা বৈশাখ তো নববর্ষের সূচনা। নববর্ষই তো অক্ষয় এই যাত্রার সাথে জড়িত প্রতিদিনের বহুবিচিত্র উদযাপনের সম্মিলনীর ক্ষণ হতে পারে, তাই না?
(Peoples film collective এর দেওয়াল থেকে সংগৃহীত। সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশিত)