23/05/2026
৬৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিল্লির একটি রাস্তার উপর থার্মাল ক্যামেরা তাক করতেই স্ক্রিনে উঠে আসে এই ভয়ংকর সংখ্যা। সাদা আর উজ্জ্বল হলুদ রঙে জ্বলতে থাকা রাস্তা যেন আগুনের চাদরে ঢেকে গেছে। একই সময়ে সরকারি আবহাওয়া দফতরের তথ্য বলছে, দিল্লির তাপমাত্রা প্রায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই দুই সংখ্যার বিশাল ফারাকই এখন আতঙ্ক, বিভ্রান্তি আর প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু। সত্যিই কি দিল্লি ৬৫ ডিগ্রিতে পৌঁছে গিয়েছিল? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য বিজ্ঞান?
পূর্ব দিল্লির নন্দ নগরীতে করা একটি গ্রাউন্ড রিপোর্টে দেখা যায়, সরাসরি সূর্যের নিচে রাস্তার surface temperature বা পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রিরও বেশি ছুঁয়ে ফেলেছে। শুধু রাস্তা নয়, রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ধাতব অংশ, সিট, দরজার হাতল, এমনকি বাইকের সাইলেন্সারও বিপজ্জনক মাত্রায় গরম হয়ে উঠেছিল। খোলা রোদের মধ্যে বাতাসের তাপমাত্রাও প্রায় ৪৮ ডিগ্রি পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছিল। থার্মাল ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে — “দিল্লির তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রি!” কিন্তু বাস্তবে এই দাবির মধ্যে অর্ধসত্য লুকিয়ে রয়েছে।
আসলে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো air temperature আর surface temperature-এর পার্থক্য বোঝা। সরকারি আবহাওয়া দফতর যে তাপমাত্রা জানায়, তা মাপা হয় ছায়াযুক্ত পরিবেশে, নির্দিষ্ট উচ্চতায়, বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে। অর্থাৎ সেটি বাতাসের তাপমাত্রা। কিন্তু রাস্তার কালো অ্যাসফল্ট, কংক্রিটের দেওয়াল, টিনের ছাদ বা গাড়ির ধাতব অংশ সরাসরি সূর্যের তাপ শোষণ করে অনেক বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই তাপই thermal camera-তে ৬৫.৮ ডিগ্রি হিসেবে ধরা পড়ে। তাই “দিল্লির অফিসিয়াল তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রি” — এই দাবি ভুল। কিন্তু “দিল্লির রাস্তার surface heat ৬৫ ডিগ্রি ছুঁয়েছে” — সেটি একেবারেই বাস্তব।
আর এই surface heat কতটা ভয়ংকর, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ৬৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার রাস্তার উপর কয়েক সেকেন্ড খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ত্বকে জ্বালা বা পোড়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের ক্ষতিও হতে পারে। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দরজার হাতল বা বাইকের সিট ছোঁয়াও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির ভিতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় আরও ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি বেশি হয়ে যায়। ফলে বন্ধ গাড়ি কার্যত একটি “হিট চেম্বার”-এ পরিণত হয়।
এই অতিরিক্ত surface heat মানুষের শরীরের উপরও ভয়াবহ চাপ তৈরি করে। সাধারণত শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু চারদিকের রাস্তা, দেওয়াল এবং যানবাহন থেকে যখন লাগাতার তাপ বিকিরণ হতে থাকে, তখন শরীরের পক্ষে ঠান্ডা হওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে দ্রুত dehydration, মাথা ঘোরা, বমি, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা এবং heat exhaustion শুরু হতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে heatstroke হতে পারে, যেখানে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড ও কিডনির উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে heatstroke প্রাণঘাতীও হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে থাকেন রাস্তার শ্রমিক, রিকশাচালক, ডেলিভারি কর্মী, ট্রাফিক পুলিশ এবং ফুটপাথে থাকা মানুষজন। যাদের দিনের বেশিরভাগ সময় রাস্তায় কাটাতে হয়, তারা শুধু গরম বাতাস নয়, নিচ থেকে উঠে আসা তীব্র surface radiation-এরও শিকার হন। অর্থাৎ শরীর একসঙ্গে দুই দিক থেকে তাপের আঘাত পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কারণেই অনেক সময় অফিসিয়াল তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি হলেও মানুষের শরীর সেটিকে ৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি অনুভব করতে পারে।
শুধু মানুষ নয়, এই তাপ শহরের পশুপাখিদের জন্যও ভয়ংকর। রাস্তার কুকুর, বিড়াল বা পাখিরা গরম কংক্রিট আর অ্যাসফল্টের উপর হাঁটতে গিয়ে মারাত্মক কষ্টের মুখে পড়ে। অনেক পশুর পায়ের তলায় ফোসকা পর্যন্ত পড়ে যেতে পারে। শহরের গাছপালা কমে যাওয়ায় ছায়াও দ্রুত কমছে, ফলে প্রাণীদের আশ্রয় নেওয়ার জায়গাও কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দিল্লির মতো বড় শহরে “Urban Heat Island” প্রভাব এখন ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। শহরের অধিকাংশ জায়গা কংক্রিট, কাচ, ধাতু আর পিচের রাস্তা দিয়ে ঢাকা। এগুলো দিনে প্রচুর তাপ শোষণ করে এবং রাতেও ধীরে ধীরে সেই তাপ ছাড়ে। ফলে রাতের দিকেও শহর ঠান্ডা হতে পারে না। বস্তি এলাকা বা টিনের ছাউনি থাকা ঘরগুলিতে এই সমস্যা আরও মারাত্মক। ছোট ঘরের ভিতর গরম আটকে থাকে, ফ্যান চললেও স্বস্তি পাওয়া যায় না, আর অনেক পরিবার সারারাত ঘুমোতে পারেন না।
তাপপ্রবাহের এই পরিস্থিতি বিদ্যুতের ব্যবহারও দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এয়ার কন্ডিশনার, কুলার এবং ফ্যানের অতিরিক্ত ব্যবহারে বিদ্যুতের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। অনেক জায়গায় ট্রান্সফরমার অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে। পাশাপাশি জল সংকটও আরও তীব্র হচ্ছে, কারণ এই ধরনের গরমে শরীরকে বাঁচিয়ে রাখতে বেশি জল প্রয়োজন হয়।
এই ঘটনার পরে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে শুধু “অফিসিয়াল তাপমাত্রা” দেখে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায় না। শহরের রাস্তায়, কংক্রিটের গলিতে, টিনের ছাউনির নিচে মানুষ যে তাপ অনুভব করছে, সেটাই আসল বাস্তবতা। দিল্লির ওই ৬৫ ডিগ্রি হয়তো অফিসিয়াল air temperature নয়, কিন্তু সেই surface heat যে মানুষের জীবনের জন্য ভয়ংকর সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
Collected