01/06/2026
সবুজ ধানক্ষেত আর রূপসা নদীর কোল ঘেঁষে শান্ত এক গ্রাম ‘পরানপুর’। এই গ্রামের বাতাসে যেমন রাখালের বাঁশির সুর ভাসে, তেমনি মিশে থাকে সম্প্রীতির এক অদ্ভুত সুবাস। এই গ্রামেরই দুই প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিল মিঠুন আর সনাতন। মিঠুন যেমন ঈদে সনাতনকে ছাড়া ভাবতেই পারত না, তেমনি সনাতনও দুর্গাপূজায় মিঠুনকে পাশে না পেলে আনন্দ খুঁজে পেত না।
কিন্তু গত বছর একটা খড়ের গাদা আর জমির সীমানা নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে এমন এক ঝগড়া হলো যে, সম্পর্কের সুতোটাই ছিঁড়ে গেল। একে অপরের ছায়াও মাড়াতেন না তারা। ভেতরে ভেতরে দুজনেরই মন পুড়ত, কিন্তু অহংকার আর রাগের দেয়ালটা কেউ ভাঙতে পারছিলেন না।
দেখতে দেখতে পরানপুরে আবার ঘুরে এলো কোরবানির ঈদ। চারিদিকে আনন্দের ধুম। নতুন জামা কাপড়ের খসখস শব্দ আর সেমাই-পায়েসের সুবাসে বাতাস ভারী। কিন্তু মিঠুনের মনে আজ কোনো আনন্দ নেই। সে উঠোনে দাঁড়িয়ে ভাবছিল—কোরবানি মানে তো শুধু বাহ্যিক কোনো পশু উৎসর্গ করা নয়; কোরবানির আসল অর্থ হলো নিজের ভেতরে পুষে রাখা রাগ, দুঃখ, হিংসা আর অহংকারকে বিসর্জন দেওয়া। মনের ভেতর এত বিষ নিয়ে ঈদের আনন্দ করা কি সম্ভব?
একই সময়ে গ্রামের অন্য প্রান্তে সনাতনও নদীর ঘাটে বসে একলা মনে ভাবছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, প্রকৃতির নিয়ম কত সুন্দর, ঋতু বদলায়, ফুল ফোটে, কোনো ভেদাভেদ থাকে না। তবে মানুষের মনে কেন এত অভিমান?
ঈদের নামাজ শেষ হতেই পরানপুর জামে মসজিদের সামনে কোলাকুলির ধুম পড়ে গেল। মিঠুন নামাজ শেষে মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার চোখ গেল দূরে, বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সনাতনের দিকে। সনাতন দূর থেকেই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলেন।
মিঠুনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সব রাগ, সব দ্বিধা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে চটি জোড়া পায়ে দিয়ে হনহন করে হেঁটে গেল সনাতনের দিকে। সনাতন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিঠুন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"ঈদ মোবারক, বন্ধু!" মিঠুনের গলাটা আবেগে বুজে এলো।
সনাতনও মিঠুনকে জাপটে ধরে কেঁদে ফেললেন, "ঈদ মোবারক রে! আজ মনের সব মেঘ কেটে গেল।"
মিঠুন হেসে বলল, "আজ কোরবানির দিনে আমার ভেতরের সব রাগ আর হিংসাকে বিসর্জন দিয়ে এলাম রে। তোকে ছাড়া কি আমার ঈদ হয়?"
সনাতন বললেন, "এটাই তো প্রকৃতির ভালোবাসা মিঠুন। মনের ময়লা দূর করে নতুন করে জীবন গড়া।"
পরানপুরের চেনা আকাশে তখন ঈদের চাঁদ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে হাসছিল। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবাই মিলেমিশে এক হয়ে গেল দুই বন্ধুর এই মিলনে। কারণ মনের ভেতরের মানুষটাকে শুদ্ধ করতে পারলেই তো জীবনের আসল উৎসব শুরু হয়।
বার্তা: এই ঈদ আমাদের শেখাক ক্ষোভ ভুলে ক্ষমা করতে, আর হিংসা ভুলে ভালোবাসতে। পরানপুরের মতো প্রতিটি গ্রাম মেতে উঠুক সম্প্রীতির আনন্দে।