21/05/2026
ওন্দার #সোনাতপল সূর্য মন্দির, #কোনারকের থেকেও প্রাচীন! ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
লালমাটির সরু পথ পেরিয়ে, সবুজ ধানখেত আর ছোট ছোট গ্রামের মাঝখানে হঠাৎই চোখে পড়ে লাল ইটের এক প্রাচীন মন্দিরচূড়া। যেন সময়ের সঙ্গে লড়াই করে আজও টিকে থাকা এক ইতিহাস। #বাঁকুড়া জেলার #ওন্দা থানার অন্তর্গত সানতোড় পঞ্চায়েতের সোনাতপল গ্রামের এই প্রাচীন #সূর্য_মন্দির আজও রহস্যে ঘেরা। বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এই দেউল বাংলার অন্যতম #ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি বলে মনে করা হয়।
ভারতের সূর্য মন্দির বললেই প্রথমে মনে পড়ে ওড়িশার কোনারক সূর্য মন্দিরের কথা। অথচ অনেকের মতে, সোনাতপলের এই মন্দির কোনারকের থেকেও প্রাচীন। আনুমানিক একাদশ শতকে নির্মিত এই ইটের দেউলটি পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র প্রাচীন সূর্য মন্দির হিসেবেও পরিচিত। যদিও মন্দিরটির প্রকৃত পরিচয় নিয়ে আজও মতভেদ রয়েছে। এটি আদৌ সূর্য মন্দির, না কি জৈন বা বৌদ্ধ স্থাপত্য—তা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
মন্দিরটি দেউল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। লম্বা বক্ররেখার মতো উঁচু স্থাপত্য, প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতা, চারদিকে চতুর্ভুজাকার বেষ্টনী এবং সরু পুরনো ইটের গাঁথুনি আজও বিস্মিত করে দর্শনার্থীদের। প্রবেশদ্বারের উপরে রয়েছে কারুকার্যমণ্ডিত চৈত্য-জানালা। মন্দিরের গায়ে সূক্ষ্ম ভাস্কর্যশিল্পের কাজ অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিখুঁত। বিশাল অর্ধগোলাকার চূড়াটি দূর থেকেই নজর কাড়ে। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝে ভেসে আসে পাখিদের কলরব। মাঝে মধ্যে মন্দিরের ভিতর থেকে শোনা যায় ঘণ্টাধ্বনি। নির্জন পরিবেশে সেই শব্দ যেন আরও রহস্যময় করে তোলে প্রাচীন এই স্থাপত্যকে।
বর্তমানে মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনও সূর্যমূর্তি নেই। বহু বছর ধরে সেখানে ছোট্ট একটি শিবলিঙ্গ দেবতা রূপে পূজিত হয়ে আসছেন। স্থানীয় এক পূজারি প্রতিদিন নিয়ম মেনে এখানে পুজো করেন। তবে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তদের আনাগোনা খুব একটা দেখা যায় না। তবে অতীতে মন্দির-সংলগ্ন এলাকা থেকে সূর্যদেবের একটি মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই কারণেই অনেকের মতে, এটি একটি সূর্য মন্দির। এছাড়াও মন্দিরটি পূর্বমুখী হওয়ায় এবং আশপাশে একসময় সূর্য-উপাসক ব্রাহ্মণদের বসবাস থাকায় এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, সূর্য ওঠার পর প্রথম আলো এসে পড়ে মন্দিরের প্রবেশমুখ ও ভিতরের অংশে। সেই কারণেও অনেকের বিশ্বাস, এটি আদতে একটি সূর্য মন্দির ছিল।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, পালযুগের রাজা শালিবাহন এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। শোনা যায়, সোনাতপলের প্রাচীন নাম ছিল হামিরডাঙা। মন্দিরের আশপাশে এখনও কয়েকটি প্রাচীন ঢিবি দেখা যায়, যেগুলিকে স্থানীয়রা রাজার গড়ের ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করেন।
যদিও ইতিহাসের নিরিখে এত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপত্য আজ কার্যত অবহেলিত। মন্দিরে পৌঁছানোর উপযুক্ত রাস্তা পর্যন্ত নেই। সরু কাঁচা পথ ধরে ধানজমির আল পেরিয়েই পৌঁছতে হয় মন্দিরে। বর্ষাকালে সেই পথ সম্পূর্ণ বেহাল হয়ে পড়ে। বর্তমানে মন্দিরের চারপাশ জঙ্গল ও আগাছায় ঢেকে গিয়েছে। বড় বড় গাছের শিকড় মন্দিরের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে এই প্রাচীন স্থাপত্য। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে একসময় ইতিহাসের এই অমূল্য নিদর্শন হারিয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সঠিক সংরক্ষণ ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন ঘটলে এই ঐতিহ্য আরও সুরক্ষিতভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
হাজার বছরের ইতিহাস আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সোনাতপলের সূর্য মন্দির। প্রয়োজন শুধু প্রশাসনের আন্তরিক উদ্যোগ, যাতে আগামী প্রজন্মের কাছেও বাংলার এই ঐতিহ্য সমানভাবে বেঁচে থাকে।
ছবি: ©️সমু ভট্টাচার্য্য।
স্থান: ওন্দা, বাঁকুড়া।