24/04/2026
ওড়িশার হাওয়ায় বাংলার ভোট—এক অন্য অভিজ্ঞতার দিনলিপি
✍️প্রিজাইডিং অফিসার হিসাবে রওনা হওয়ার মুহূর্তে মনে ছিল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। গুরুদায়িত্ব যেমন দৃঢ় করেছিল মন, তেমনি কোথাও যেন অজানা আশঙ্কার হালকা ছায়াও ঘুরপাক খাচ্ছিল। লক্ষ্য একটাই—একটি নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ ভোট প্রক্রিয়া উপহার দেওয়া। সেই লক্ষ্যকে বুকে নিয়েই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম রাজ্যের একেবারে প্রান্তিক একটি গ্রামে—যার পরিচয়, গোপনীয়তার স্বার্থেই, উহ্য রাখলাম।
এ যেন মানচিত্রের শেষ রেখা। বুথ কেন্দ্রটি দাঁড়িয়ে আছে দুই রাজ্যের সীমানা ছুঁয়ে—একদিকে বাংলা, অন্যদিকে ওড়িশা। একটি সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্তু তার অবস্থান যেন অসাধারণ। বিদ্যালয়ের পেছনের দেওয়ালটি দুই রাজ্যের সীমানা-রেখা টেনে দিয়েছে—ওপারে ওড়িশার বিস্তৃত মাঠ, আর এপারে বাংলার ছোট্ট, সবুজে ঘেরা গ্রাম। খেজুর আর নারিকেল গাছের সারি গ্রামটিকে দিয়েছে এক নিভৃত সৌন্দর্য। ওপারে ধানক্ষেত—আধপাকা সোনালি-সবুজ ঢেউ খেলে যাচ্ছে হাওয়ার ছোঁয়ায়। সেই মাঠের বহু দূরে, চোখে না পড়লেও অনুভবে ধরা দেয়, রয়েছে বঙ্গোপসাগর। তারই ঠান্ডা বাতাস ধানের শীষ ছুঁয়ে, সীমান্ত পেরিয়ে, স্কুলের জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়ছিল। বাইরে যখন দাবদাহের তাপ, ভেতরে তখন এক আশ্চর্য আরাম—প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া শীতলতা।
প্রকৃতির মতোই ভোটের দিন মানুষের মনও ছিল শান্ত, সহনশীল। ভোটের সকালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির পোলিং এজেন্টরা এলেন হাসিমুখে, গল্প করতে করতে। কোথাও কোনো তিক্ততা নেই, নেই উত্তেজনার ছাপ। চা-খাওয়া, হালকা কথাবার্তা—সব মিলিয়ে যেন এক উৎসবের আবহ। মনে হচ্ছিল, রাজ্যের অন্য প্রান্তে যে ঝান্ডা-ডান্ডা-স্লোগানের উত্তাপ, তার থেকে এ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ।
তাদের কাছেই জানা গেল, এই অঞ্চলের অতীতও কম আকর্ষণীয় নয়। একসময়, ষাট-সত্তরের দশকে, এটি ছিল ওড়িশার অংশ। পরবর্তীকালে স্থানীয়দের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ভূমি হস্তান্তরের মাধ্যমে এটি বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয়। কৌতূহলবশত প্রশ্ন করেছিলাম, “বাংলাকে এতটাই ভালোবাসেন?”
প্রধান দুই দলের পোলিং এজেন্ট হেসে উত্তর দিলেন, “ভালোবাসি বলেই তো আজও গণতন্ত্রে আস্থা রাখি। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে আমরা এক।”
এই সহজ অথচ গভীর কথাগুলো যেন মুহূর্তেই অনেক জটিল তত্ত্বকে সরল করে দিল।
এরই মাঝে এক জওয়ান এসে দাঁড়ালেন। হাতে একটি কাগজ, মুখে দায়িত্বের কঠোরতা। বললেন, “ফায়ারিং কে লিয়ে পহেলে সে এক অর্ডার দে দিজিয়ে। ফর কুইক রেসপন্স।”
আমি একটু থেমে বললাম, “দোজ হু লাভ ডেমোক্রেসি ডু নট ব্রেক দ্য ল। নো টিয়ার, নো ফায়ার।”
ঠিক সেই সময়ই আবার এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়ল জানালা দিয়ে। যেন দূর সমুদ্রের শ্বাস এসে ছুঁয়ে গেল আমাদের সবাইকে। জওয়ানের মুখের কঠোরতা নরম হয়ে এল, ঠোঁটে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। স্যালুট ঠুকে তিনি চলে গেলেন।
ভোট চলতে লাগল নিজের ছন্দে। হঠাৎ ফার্স্ট পোলিং অফিসারের ডাক—
“সিরিয়াল নম্বর দুই শত সাতাত্তর, অনিল পন্ডা!”
একজন পোলিং এজেন্ট হেসে বললেন, “স্যার, একটু ভুল হচ্ছে বোধহয়।”
পাশ থেকে অন্য দলের এজেন্ট মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ স্যার, এই গ্রামে একই নামে দু’জন আছেন, একটু মিলিয়ে নিন।”
লিস্ট যাচাই করতে অফিসার ব্যস্ত, আর সেই ফাঁকে এক এজেন্ট পকেট থেকে একটি পান বের করে চুপিচুপি মুখে পুরে ফেললেন। পাশে বসা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের এজেন্ট ইতিমধ্যেই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। একটুখানি হাসি বিনিময়, আরেকটি পান তার হাতেও এল।
ফিসফিস করে বললেন, “তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, না হলে স্যার দেখে ফেলবেন!”
এই ছোট্ট মুহূর্তটুকুতে যেন রাজনৈতিক বিভাজন গলে গিয়ে মানুষ হয়ে ওঠার সহজ ছবি ফুটে উঠল।
আমি চুপ করে বসে ভাবছিলাম—এই কি সেই গণতন্ত্র, যাকে আমরা এতদিন কাগজে-কলমে খুঁজেছি? যেখানে বিরোধিতা আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই; মতভেদ আছে, কিন্তু মনভেদ নেই।
এরই মাঝে আবার সেই হাওয়া—ওড়িশার দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস, বাংলার জানালা দিয়ে ঢুকে আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। সেই হাওয়ায় বসে, দূরের অদৃশ্য সমুদ্রের গর্জন যেন কানে ভেসে আসছিল।
বুঝলাম, গণতন্ত্র শুধু ভোটযন্ত্রের বোতামে সীমাবদ্ধ নয়।
গণতন্ত্র বেঁচে থাকে মানুষের আচরণে, সৌহার্দ্যে, আর একসাথে থাকার সহজ বিশ্বাসে।
✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত