25/11/2025
সকালের নরম রোদটা জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে তিথির মুখে পড়ছিল। শীতের হালকা কুয়াশার ভেতর দিয়ে উঠোনটা যেন প্রায় অদৃশ্য—সবই কেমন মায়াবী আর শান্ত। দূরে পুকুর পাড়ের নারিকেল গাছের পাতায় হাওয়া লাগলে ঝিরঝির শব্দ হয়, তিথির মনও আজ সেই শব্দের মতোই অদ্ভুত অস্থির। ছেঁড়া কম্বলটা ঠিকঠাক করে গায়ে চাপিয়ে তিথি উঠে বসল। মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ তার জীবনের একটা খুব বড় দিন।
তিথি খুব সাধারণ এক গ্রামের মেয়ে। বাবা হরেন মিস্ত্রি—লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেন। মা মালতীদেবী গৃহবধূ—পরিবারটাকে সামলাতেই দিন কেটে যায়। সংসার বলতে বাবা-মা আর ছোট ভাই তমাল। সংসারের অবস্থা ভালো নয়, প্রতিমাসেই কখনো ঔষধের জন্য টাকা লাগে, কখনো স্কুলের ফি’তে সমস্যা হয়। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও তিথির চোখে একটা আলাদা জ্যোতি আছে—স্বপ্নের জ্যোতি।
তিথি পড়াশোনায় ছোট থেকেই ভালো। শিক্ষকরা সবাই তাকে আদর করেন, তার বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ। কিন্তু তিথির জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—দারিদ্র্য। সে জানে, এই আর্থিক পরিস্থিতি তাকে অনেক সময় পিছিয়ে দেয়, অনেক স্বপ্নের সামনে বিশাল দেয়াল তুলে দেয়। তবুও সে থামে না।
আজ সকালটা অন্য রকম। কারণ আজ তিথির ভবিষ্যতের প্রথম বড় পরীক্ষা—জেলা পর্যায়ের স্কলারশিপ পরীক্ষা। এই স্কলারশিপ যদি সে পায়, তাহলে তার পড়াশোনার বড় একটা বোঝা কমে যাবে। কোচিং, বই—সবকিছু সম্ভব হবে। কিন্তু পরীক্ষা মানেই শুধু প্রশ্নোত্তর নয়; পরীক্ষা মানে তার স্বপ্ন, পরিবার, দারিদ্র্য, সমাজ—সবকিছুর সাথে যুদ্ধ।
তিথি চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। মা গরম চা বানিয়ে রেখেছেন। তিথি চা ধরে বারান্দায় দাঁড়াতেই মা বললেন,
— “মা, ভয় পাস না। যা হবে ভালোই হবে।”
তিথি মৃদু হেসে বলল,
— “মা, আমি আর ভয় পাই না। কতবার যে হেরেছি আর উঠেছি, এখন তো হার মানাই আমার শক্তি। আজ আমার দিন হবে।”
মালতীদেবী কিসের যেন অজানা সুখে চোখ ভিজিয়ে তিথিকে বুকে টেনে নিলেন। মেয়েকে এত শক্ত, এত নিজের ওপর বিশ্বাসী দেখে তার বুকটা ভরে ওঠে। কিন্তু তিনি জানেন, এই মেয়েটা কতো কস্ট করে এতদূর এসেছে।
চা শেষ করতে না করতেই বাবা এলেন। রোদে পুড়ে গায়ের রঙটা যেন আরও কৃষ্ণবর্ণ। চোখদুটো ক্লান্ত, কিন্তু মেয়ের মুখ দেখলে তাতে আশা জন্মায়।
— “তুই ঠিক মতো খেয়ে পরীক্ষা দিতে যাবি, না হলে মাথা ঘুরে যাবে।”
বাবার এই কথায় তিথি হেসে বলল,
— “হ্যাঁ বাবা, তুমি চিন্তা করো না। আমি ঠিক আছি।”
কিন্তু তিথি জানে—বাবা চিন্তা করেন। খুব চিন্তা করেন। কারণ তাদের বাড়িতে প্রতিদিন এমনভাবে দিন কাটে, যেন আগামীকাল কী হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কখনো কাজ আসে, কখনো আসে না। তিথি যদি ভালোভাবে পড়াশোনা করে চাকরি পায়—তাহলে তবেই এই পরিবারের ভাগ্য বদলাবে। তিথি জানে, তার স্বপ্ন শুধু তার নিজের নয়—পুরো পরিবারের।
পরীক্ষার আগে সে বইগুলো আরেকবার দেখে নিল। পেছন থেকে তমাল জিজ্ঞেস করল,
— “দিদি, তুই কি সত্যিই বড় কিছু হবি?”
তিথি একচুল দেরি না করে উত্তর দিল,
— “হবই। তুমি দেখবে। আমাদের পরিবার একদিন গর্ব করবে।”
এই কথাটাই যেন তিথির অস্তিত্ব। সে জানে, একটাই রাস্তা—স্বপ্নকে ধরে রাখা, রান্না করা পথ যত কঠিন হোক না কেন।
---
পরীক্ষার হল শহরমুখী। সাইকেলে বাবা সাথে যাবে। বেরোবার সময় বাড়ির সামনের মাঠে কয়েকজন প্রতিবেশী দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল—তারা আশাবাদী নয়।
এক বয়স্কা প্রতিবেশী হাসতে হাসতে বলল,
— “এই মেয়ে বড় বড় পরীক্ষা দেবে! এসব পরীক্ষায় কি এত সহজে পাশ করা যায় নাকি?”
আরেকজন বলল,
— “ওসব পড়াশোনা করে কী হবে? শেষে তো বাপের মতো কাজই করতে হবে!”
তিথির কানে সব পৌঁছায়। কিন্তু সে কিছু বলে না। কষ্ট হয়, চোখ ভিজে আসে—তবু মুখে হাসি রেখে এগিয়ে যায়। কারণ সে জানে—মানুষ কথাই বলবে। আর যে লড়াই করে, তাকেই সমাজ সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।
বাবা মেয়ের মন খারাপ বুঝতে পারেন।
— “মা, মানুষের কথা নিয়ে মাথা ঘামাবি না। তুই শুধু মনে রাখ—একদিন এই মানুষগুলো তোকে দেখেই গর্ব করবে।”
তিথি মাথা নাড়ল।
যেন পুরো পৃথিবীকে নতুন করে জয় করার সাহস পেল।
---
সাইকেলে করে বাবা তাকে নিয়ে যাচ্ছেন শহরের স্কুলে, যেখানে পরীক্ষা হবে। কুয়াশায় রাস্তা ঝাপসা, মাঝে মাঝে গাড়িঘোড়ার আওয়াজ, দূরে বাজারের ভিড়—সবকিছুই যেন আজ অন্যরকম লাগে।
তিথির মনে আজ আশার সাথে সাথে ভয়ও আছে।
যদি ফেল করে?
যদি সবাই ঠিকই বলে?
যদি তার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যায়?
কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে শক্ত করে।
— “না! আমি পারব। আমি ভেঙে পড়ার মেয়ে নই।”
তার ভেতরেই যেন নতুন এক আগুন জ্বলে উঠল।
স্কুলে পৌঁছাতেই দেখা গেল শত শত ছাত্রছাত্রী। কারো মুখে টেনশন, কেউ বইয়ের পাতায় তাকিয়ে আছে, কেউ আবার ফিসফিস করে শেষ মুহূর্তের আলোচনা করছে।
তিথি শেষবার বাবার মুখের দিকে তাকাল।
— “বাবা, আমার জন্য দোয়া করো।”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “আমি সবসময় তোর পাশেই থাকব। যা শিখেছিস, মন দিয়ে লিখে আয় মা।”
তিথির চোখ ভিজে এল। সে পরীক্ষার হলে ঢুকে গেল।
---
হলের ভেতরে প্রবেশ করতেই এক অদ্ভুত টেনশন চেপে বসল। পরীক্ষকরা প্রশ্নপত্র সাজিয়ে দিচ্ছে। ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও যেন আজ বেশি শোনা যাচ্ছে। তিথির পাশের মেয়েটি খুব আত্মবিশ্বাসী—প্রতিটা প্রশ্ন দেখেই লিখছে। তিথির মন আরও অস্থির।
কিন্তু সে গভীর শ্বাস নিল।
প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর সে প্রথমে চোখ বুলিয়ে নিল।
প্রথম কয়েকটা প্রশ্ন দেখে মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল—এগুলো সে জানে।
তিথি মন দিয়ে লিখতে শুরু করল।
সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে।
একসময় টেনশন কমে গিয়ে তার মন পুরোপুরি প্রশ্নপত্রে ডুবে গেল।
কিন্তু শেষ অংশটা আসতেই তার হাত কেঁপে উঠল—
কিছু প্রশ্ন কঠিন… খুব কঠিন।
মনে হলো, মাথাটা ঘুরছে।
কিন্তু তিথি নিজেকে বলল—
— “এখন হার মানলে চলবে না!”
সে আবার মনোযোগ দিল।
যা জানে লিখল, যা বুঝতে পেরেছে তার ব্যাখ্যা দিল।
আর বাকিগুলো নিজের বুদ্ধি দিয়ে সাজিয়ে লিখে দিল।
ঘণ্টা পড়তেই পরীক্ষার খাতা জমা দিল।
তার বুক ধকধক করছে।
---
পরীক্ষা শেষে হল থেকে বের হতে না হতেই বাবা ছুটে এলেন।
— “কী হলো মা? ভালো দিয়েছিস তো?”
তিথি একটু চুপ করে রইল। তারপর হেসে বলল,
— “হ্যাঁ বাবা… যতটা পারি ভালোই দিয়েছি।”
বাবা হাসলেন।
মেয়ের চোখ দেখে তিনি বুঝলেন—মেয়ে লড়েছে… খুব লড়েছে।
ফিরে আসার পথে হাওয়া একটু বদলে গেছে।
তিথির মুখে একটা আলাদা আলো—যে আলো শুধু লড়াকুদের মুখে দেখা যায়।
গ্রামে ফিরে লোকেরা আবার কথাও বলবে—
“কেমন হলো তোর পরীক্ষা?”
“মনে হয় পারবি না।”
“এত বড় স্বপ্ন দেখিস কেন?”
কিন্তু আজ তিথি আর কেয়ার করে না।
কারণ আজ সে জানে—স্বপ্নে বিশ্বাস রাখলে, পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে থামাতে পারে না।
---
রাতে তিথি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
চাঁদটা আজ খুব উজ্জ্বল… যেন তাকে বলছে—
“হাল ছাড়িস না। সামনে আরও লড়াই আছে।”
তিথি মৃদু হেসে বলল,
— “আমি হারব না। যতো বাধাই আসুক, আমি জিতবই।”
এভাবেই শুরু হয় তার জীবনের বড় লড়াই—
একটা মেয়ের, একটা পরিবারের, একটা স্বপ্নের লড়াই…
চলবে.....
#গল্প_সপ্নের_পথচলা
#পর্ব_১
#কলমে_মন্দিরা_পাল
#স্বপ্নেরপথচলা #মোটিভেশনালগল্প
#বাংলাগল্প
#গল্পপড়ুন 'sStory
#উদ্যম #পরিশ্রম