11/08/2025
জেলে থাকা কালীন ক্ষুদিরাম বসুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী
বন্দেমাতরম্
আমার পিতার নাম শ্রী ত্রৈলক্যনাথ বসু। আমার তিন ভগিনী ও ২টি সহোদর ছিল। তাহার মধ্যে বড় ভগিনী ও আমার উপরোক্ত ভগিনীটি বর্তমান। আমার পিতার উপরে নীচে সহোদর ছিল। তাঁহাদের নাম টাম লইয়া আমার এখন সময় নাই কেবল আমার নিজের জীবনীটুকু সংক্ষেপে লিখিব। আমার বাড়ি বা পৈত্রিক ভিড়া মেদিনীপুর হইতে ১০/১২ ক্রোশ উত্তর মুখে মৌ-বনী নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রামে। মেদিনীপুরে আমার জন্ম হয়। মেদিনীপুরে নারাজোল রাজ কাছারীতে আমার পিতা কাজ করিতেন। ছেলেবেলায় আমি অত্যন্ত দুষ্ট ছিলাম। আমার পিতা আমাকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। যখন যা চাইতাম তখন তাহার কোন ত্রুটি হইলে বড়ই গোলমাল বাধাইতাম। যখন আমার বয়স ৪/৭ বৎসর হইল তখন আমি পাঠশালায় পড়িতে যাইতে লাগিলাম। এই সময় আমার পিতা-মাতা দুজনেই মরিয়া গেলেন।
প্রথমে আমার মাতা মরিয়া যান। আমার পিতা আবার বিবাহ করিলেন। এই বিমাতা অভিমানবশত তাঁহার পিত্রালয়েই থাকেন। বিবাহের ১/২ মাস পরেই আমার পিতা মরিয়া গেলেন। আমার একটি দিদিমা ছিলেন, তিনিও ইহাদের সঙ্গে সঙ্গে গত হইলেন। তারপর আমার এক জ্যাঠতুতো ভাই আছেন ইনি আমাদেরই বাড়িতে মানুষ হইয়াছিলেন। এখন ইহার উপরেই সমস্ত ভার চাপা পড়িল। কারণ এই সময়ে অভিভাবক স্বরূপ আর কেহ ছিল না। তারপর বিষয়-পত্র ইত্যাদি কি যে গোলমাল হইয়া গেল তাহা অজ্ঞানতা বশতঃ কিছুই জানিতে পারি নাই।
তারপর দিন কতক পর আমার বড় ভগিনীপতি তাঁহার বাড়ি হইতে আসিয়া আমাকে লইয়া গেলেন। কিন্তু আমার দুষ্ট স্বভাব কিন্তু পূর্ববৎ ঠিক রহিল। ইহার অনেক সাধনেও কিছু হইল না। তখন আমার ভ্রাতাকে ইনি আমাকে লইয়া যাইবার জন্য চিঠি লিখিলেন। তিনি আসিয়া আমাকে লইয়া গেলেন। ইনি মেদিনীপুরের ৮ ক্রোশ উত্তরে আনন্দপুর গ্রামেই তার শ্বশুর বাড়িতে থাকিতেন। আমি সেইখানেই গেলাম। এখানে একটি ছাত্রবৃত্তি স্কুল আছে তাহাতে ভর্তি করিয়া দিলেন। বেশ পড়িতে লাগিলাম। কিন্তু দুষ্ট স্বভাব গেল না। এবার আমার ভ্রাতার কঠিন শাসনে দুষ্টামি মনোভাবটা ভাল হইয়া গেল। এখানে সর্বদা তিরস্কার বশতঃ বিরক্ত হইয়া লুকাইয়া মেদিনীপুর পলাইয়া থাকিলাম। এখানে আমাদের পূর্ব পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে রহিলাম। এদিকে আমার ভ্রাতা খুঁজিতে খুঁজিতে এখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও আমাকে কিন্তু খুব তিরস্কার করিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন এবার কোথায় যাইবে। আমি চাইলাম আমি ভগিনীর নিকটে যাইব ও ইংরাজী শিখিব। এই সময়ে আমার ভগিনীপতি তমলুকে বদলী হইয়া আসিয়াছিলেন। এখান হইতে আমার এক মামাবাড়ির আত্মীয়ের সহিত তমলুকে আসিলাম।
এখানে আসিয়া স্কুলে ভর্তি হইয়া বেশ ভালো পড়া করিতে লাগিলাম। এখানে আমার দুষ্ট স্বভাব একেবারে বদল হইয়া গেল। তারপর ৫ম শ্রেণীতে পরীক্ষা দিলাম। এমন সময় আমার ভগিনীপতি মেদিনীপুরে বদলী হইয়া আসিলেন তখন মেদিনীপুর কলেজে ৪র্থ শ্রেণীতে (মেদিনীপুর কলেজ প্রকৃতপক্ষে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল। কলেজ সংলগ্ন এই স্কুলটি কলেজ নামেই অভিহিত হত। ৪র্থ শ্রেণী মানে ক্লাস সেভেন। সেই সময় এন্ট্রান্স পরীক্ষা চালু ছিল। ক্লাস টেনকে বলা হত ফার্স্ট ক্লাস, ক্লাস নাইনকে সেকেণ্ড ইত্যাদি। ক্ষুদিরামও তাই ব্যবহার করেছেন- সম্পাদক) ভর্তি হইলাম। ইহার কিছুদিন পরেই আমার পরিবর্তন ঘটিতে লাগিল, পড়াশুনার দিকে সেরকম মন না দিয়া শারীরিক পরিশ্রমের দিকে মনঝুঁকিয়া পড়িল ও সমপাঠী সকলের মধ্যে বলিষ্ঠ হইব এই চেষ্টা করিতে লাগিলাম। কিন্তু ইতিমধ্যে আর একটি চিন্তার উদয় হইল যে দেশের জন্যও কিছু করা চাই। এই কথা লইয়া আমার আরও দুইটি বন্ধু এ বিষয়ে সর্বদা আলোচনা করিতাম। এই সময় শুনি দেশে দুর্ভিক্ষ হইতেছে। ক্লাসে ক্লাসে চাঁদা উঠিতে লাগিল। কিন্তু যে চাঁদা তুলিল সে হয় অর্ধেক পাঠাইয়া অর্ধেক নিজে গাপ্ করিয়া লইল। এই লইয়া মন অত্যন্ত খারাপ হইল।
এই কথা মনে হইল যে গভর্নমেন্ট এ বিষয়ে নির্লিপ্ত। ইহার পর হইতে গভর্নমেন্টের উপরে একটা ঘৃণা হইতে লাগিল। কেবল ঐ কারণে হইল তাহা নহে আরও অনেক কারণ মিলিল। তারপর প্রকৃত ইতিহাস ও বহি ইত্যাদিতে ইংরাজের ভারতে আগমন ও তাহার অধিকারের সকল বিষয় যখন প্রকৃত জানিতে পারিলাম তখন মনে অত্যন্ত একটা বিজাতীয় ঘৃণা জন্মিয়া গেল।
আমি এবং আমার উক্ত দুইটি বন্ধু পরস্পর প্রতিজ্ঞা করিলাম দেশের জন্য কিছু একটা করিয়া মরিব। এমন সময় বঙ্গভঙ্গ হইল। সমস্ত ভারতবাসী দেশের উপকারের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল। এই গোলমালে আরও অনেক ছাত্র এই প্রতিজ্ঞার মতো প্রতিজ্ঞা করিল। আমরাও প্রতিজ্ঞা করিলাম যে যতটুকু পারি হৃদয়ের রক্ত দিয়া মাতৃভূমির উপকার করিব। তারপর একটা কথা ভাবিলাম ঘরে বসিয়া এ ব্রত উদ্যাপন হইতে পারে না। কিছুদিন পরে মন অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল, মনে মনে এক যুক্তি আঁটিলাম। কাহাকেও না বলিয়া এক ত্রিশূল বানাইয়া লইয়া সন্ন্যাসী হইয়া একদিন রাত্রে পলাইয়া গেলাম। কিছুদিন পরে ভারী কষ্ট হওয়াতে ফিরিয়া আসিলাম ও ভাবিলাম এরূপ করিয়া কিছু হইবে না। এমন সময়ে একজন খাঁটি স্বদেশহিতৈষীর হাতে পড়িলাম। তাঁহার নিকট এ বিষয়ে উপদেশ পাইতে লাগিলাম কি করিয়া দেশের কাজে লাগিতে হইবে। এই সময় আমার ভগিনীপতি আবার স্কুলে ভর্তি হইবার জন্য অনুরোধ করিলেন ও কিছু টাকা দিলেন। আমি আমার উক্ত গুরুর উপদেশ অনুসারে আর একটি বন্ধুর সহিত পূর্বউক্ত আনন্দপুরে তাঁত শিখিতে গেলাম। আনন্দপুরে অনেক তাঁতীর বাস। এইজন্য ঐখানে গিয়া আমার ভ্রাতার বাড়িতে থাকিয়া দিন কতকের মধ্যে তাঁতে কাপড় বুনা শিখিয়া আসিলাম। এখন কি করি। আমরা অনেক ছাত্র মিলিয়া ভদ্রলোকদের নিকট হইতে চাঁদা করিয়া কিছু টাকা তোলা ছিল। সেই টাকা লইয়া আমার বন্ধুটি কলিকাতা হইতে একটি তাঁত কিনিয়া আনিল। সেই তাঁতে আমরা কিছু বেশ কাপড় বুনিলাম। আমাদের উৎসাহ দেখিয়া আরও অনেক ছাত্র তাঁত শিখিতে আসিতে লাগিল। এই সময় 'যুগান্তর' কাগজ বাহির হইল। রীতিমত পড়িয়া বুঝিতে পারিলাম তাঁত বুনিয়া দেশ উদ্ধার হইবে না। ইহাতে একটি প্রবন্ধ মনে পড়ই লাগিয়াছিল সেটি এই- 'স্বদেশ পরের হাতে দিয়ে স্বদেশী চাও কোন আশায়, ঘরের ভিতর চোর ঢুকিয়ে পাহারা দাওয় চৌমাথায়'। ইহার পর হইতে তাঁদের উপর আর ততটা মন লাগিল না। কেবল কি করিব, কি করিব, এবং কিছু একটা করিতে যেন মন আনন্দে বিহ্বল হইয়া উঠিল। ক্রমশ সময় মেদিনীপুরে এজিবিশন হইল। আমি ভলান্টিয়ার হইলাম। ইংরাজের দোষগুণ লইয়া কতকগুলো কাগজ আমার হাতে পড়িল, সেই গুলো নিয়ে আমি সাবধানে বিলি করিতে লাগিলাম। কিন্তু ধরাও পড়িলাম। শরীরের শক্তিতে মারধোর করিয়া পালাইয়া গেলাম। দিন কতোক চুপচাপ রইলাম। জানিতে পারিলাম যে আমাকে গ্রেপ্তার করিবে। একদিন রাত্রে তাঁতশালায় বসিয়া আহার করিতেছি এমন সময় ১০/১২ জন কনস্টেবল ও দুইজন Inspector আসিয়া আমায় গ্রেপ্তার করিল (প্রায় ১ মাস পর)। হাজতে তিন দিন রহিলাম জামিনে খালাস হইয়া আসিলাম। সেশন সোপর্দ হইল। আবার একদিন হাজতে রহিলাম। জামিনে খালাস হইলাম। জজের নিকট ১ দিন বিচার হইয়া ২য় দিন মোকদ্দমা গভর্ণমেন্ট উঠাইয়া লইল, শুনিলাম। তখন আমার বয়স প্রায় ১৫ বৎসর হইবে।
__________________________________________