06/07/2026
অশ্রুতে শেষ অধ্যায়
১৬ বছর আগে যে মাঠে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, ঠিক সেই মাঠেই শেষ হল এক মহাকাব্যের। যেন ভাগ্য নিজের হাতে লিখে রেখেছিল এক পূর্ণবৃত্তের গল্প। আমেরিকার মেটলাইফ স্টেডিয়াম যে মাঠ একদিন তরুণ নেইমারকে বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, সেই মাঠই রবিবার রাতে সাক্ষী থাকল তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল জীবনের শেষ দৃশ্যের। বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের পরাজয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার।
শেষ বাঁশি বাজতেই যেন সব অনুভূতির বাঁধ এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। স্কোরবোর্ড তখন ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের গল্প বলছে, আর মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নেইমারের চোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রু। নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সবুজ ঘাসের উপর। চোখের জল যেন বলে দিচ্ছিল, এই বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের নয়, ভেঙে যাওয়া এক অসম্পূর্ণ স্বপ্নেরও। সতীর্থরা ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছু হারানোর যন্ত্রণা ভাষায় বোঝানো যায় না।
পরে মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে নেইমার বললেন, "আমি অনেক চেষ্টা করেছি। নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছি। কিন্তু এবার সব শেষ। এখানেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ করলাম।" কথাগুলো বলার সময়ও তাঁর কণ্ঠে ছিল অপার ক্লান্তি, চোখে ছিল দীর্ঘ ১৬ বছরের পথচলার অসংখ্য স্মৃতি।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আরও একবার মাঠে নেমেছিলেন ৩৪ বছর বয়সি এই তারকা। দীর্ঘ কেরিয়ারে অসংখ্য চোট, ফর্মের ওঠানামা, মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেও তিনি বিশ্বাস হারাননি। নতুন কোচ কার্লো আন্সেলোত্তিও তাঁর উপর আস্থা রেখেছিলেন। নেইমারকে সুযোগ দিয়েছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটিকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হল না। ষষ্ঠবারের চেষ্টাতেও ব্রাজিলের 'হেক্সা' জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল। ইউরোপীয় দলের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ব্যর্থতার অভিশাপও কাটাতে পারল না সেলেসাওরা।
এই বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ভাগ্য যেন নেইমারের বিরুদ্ধে ছিল। চোট নিয়েই টুর্নামেন্টে এসেছিলেন তিনি। সেই কারণে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন। জাপানের বিরুদ্ধে খেলাই হয়নি। নরওয়ের বিরুদ্ধে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালেও কোচ তাঁকে প্রথম একাদশে রাখেননি। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে খেলেন মাত্র ৩৭ মিনিট। সেই অল্প সময়ের মধ্যেই ম্যাচের শেষদিকে পেনাল্টি থেকে একটি গোল করে ব্যবধান কমিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল হয়তো আবারও কোনও অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই গোল শুধু পরাজয়ের ব্যবধানই কমাতে পেরেছিল, ব্রাজিলকে জয়ের পথে ফেরাতে পারেনি।
ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নেইমারের চোখের জল যেন কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থকের কান্নার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল। যে ফুটবলারকে ঘিরে একসময় নতুন যুগের ব্রাজিল ফুটবলের স্বপ্ন দেখেছিল গোটা দেশ, সেই ফুটবলারই শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠ ছাড়লেন নীরব বেদনা নিয়ে।
২০১০ সালে ব্রাজিলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন নেইমার। জাতীয় দলের হয়ে ১৩০টি ম্যাচে করেছেন ৮০টি গোল। রয়েছে চারটি হ্যাটট্রিকও। ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই তিনি আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ইতি টানলেন। পরিসংখ্যানের বিচারে তিনি দেশের অন্যতম সেরা, কিন্তু তাঁর গল্প শুধুই সংখ্যার নয়; এটি আনন্দ, যন্ত্রণা, প্রত্যাশা, সমালোচনা, প্রত্যাবর্তন আর অবিরাম লড়াইয়ের গল্প।
জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ। জিতেছেন ২০১২ অলিম্পিকে রুপোর পদক, ২০১৬ অলিম্পিকে ঐতিহাসিক সোনার পদক এবং ২০১৩ কনফেডারেশনস কাপের শিরোপা। অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন ব্রাজিলকে। কিন্তু ফুটবলার হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলা। সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে গেল।
ফুটবলে অনেক কিংবদন্তির গল্প সুখের পরিণতি পায় না। কেউ কেউ ইতিহাসে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে অমর হন, আবার কেউ থেকে যান অপূর্ণতার প্রতীক হয়ে। নেইমারের নাম সম্ভবত সেই দ্বিতীয় তালিকাতেই লেখা থাকবে। কারণ তিনি ব্রাজিলকে অসংখ্য গোল, অসংখ্য জয়, অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, কিন্তু দিতে পারেননি সেই একটিমাত্র ট্রফি, যার জন্য একটি ফুটবলপাগল দেশ যুগের পর যুগ অপেক্ষা করে থাকে।
তবু ইতিহাস শুধু ট্রফি দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া আবেগ দিয়ে। আর সেই আবেগের নামই নেইমার। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে তাঁর চোখের জল হয়তো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু সেই অশ্রুর ছবি থেকে যাবে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে। এক অসমাপ্ত স্বপ্ন, এক অপূর্ণ ভালোবাসা আর এক অনন্য প্রতিভার বিদায়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে সেই রাত। ব্রাজিলের জার্সিতে আর কোনও দিন মাঠে নামবেন না নেইমার। কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারিত হবে বহু বছর, হয়তো বহু প্রজন্ম ধরে ব্রাজিল ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আবার একই সঙ্গে এক চিরন্তন ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে।