Dreamful Life

04/03/2026

একজন বাবার তার পুত্রকে দেওয়া সাতটি উপদেশ।।।।।




Dreamful Life

আশ্রয় :~ সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্যচারটে সাড়ে চারটার দিকে একজন বয়স্ক লোককে নিয়ে হেসে কথা বলতে বলতে যখন মামি ঘরের দিকে যাচ...
08/02/2026

আশ্রয় :~ সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য

চারটে সাড়ে চারটার দিকে একজন বয়স্ক লোককে নিয়ে হেসে কথা বলতে বলতে যখন মামি ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন আমি তখন কলতলায় বসে দুপুরের রান্নার পর ভিজিয়ে রাখা কড়াটা মাজছিলাম, লোকটা আমার দিকে শকুনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসছিল, মামি সেটা দেখতে পেয়ে হেসে লোকটাকে যেন কি বললেন লোকটাও হেঁসে আমার দিকে তাকিয়ে অসভ্য ইঙ্গিত করে মামীর সঙ্গে ঘরে চলে গেল। মিনিট পাঁচেক পর মামা ছুটে এসে আমাকে কলতলা থেকে তুলে আড়ালে নিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, তুই এখান থেকে পালিয়ে যা, ওই যে লোকটা গেল দেখলিনা ওর সাথে তোর মামি টাকার লোভে বিয়ে দিতে চাইছে ! বিয়েটা হচ্ছে উপর উপর আসলে তোর মামী তোকে বিক্রি করে দিচ্ছে। লোকটা আগে দু'বার বিয়ে করেছিল কিন্তু তার কোন বউ বেশি দিন টেকেনি ! একজন মারা গিয়েছিল আর একজন অন্য একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে বলে আমার দুই বাহু ধরে বললেন, তোর এত বড় ক্ষতি হোক আমি চাইনা।
তোকে তোর মামি ডাকলে বাথরুমে যাওয়ার নাম করে পিছনের দরজা দিয়ে যেদিকে পারিস বেরিয়ে যাস ততক্ষণ আমি ওই লোকটা আর তোর মামীর সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত থাকবো। তোর উচ্চ মাধ্যমিকের মার্কশিট, এডমিট কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সব গুছিয়ে আমি একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটের মধ্যে রেখে দিচ্ছি, তুই রাত্তিরে যেখানটায় শুয়ে থাকিস সেখানকার বাক্সের পাশে থাকবে, যখন যাবি ওটা নিতে যেন ভুলিস না। তোর মামি মনে করে তোকে না সরালে তার দুটো মেয়ের কারুরই বিয়ে হবে না কারণ, তোর সুন্দর চেহারা আর তোর মামির মেয়ে দুটো একেবারে মামির মত ! জানিনা শেষ পর্যন্ত তোর কপালে কি লেখা আছে !! তবে ঈশ্বরের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তোর যেন কোন বিপদ-আপদ না হয়, যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস বলে মামা আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন, কোন সমস্যায় পড়লে ভয় পাবি না সাহস করে সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াবি কথাটা বলে মামা একটু মুখ বাড়িয়ে মামীর ঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
তোর সঙ্গে এত সময় ধরে কথা বলছি সেটা তোর মামি যদি দেখে ফেলে তাহলে আমায় আর আস্ত রাখবে না। আমি ওদিকে গেলাম, পারলে আমায় ক্ষমা করিস বলে মামা আমার হাতে পাঁচটা ১০০ টাকার নোট দিয়ে মাথা নিচু করে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন।

আমি ১৯ বছরের অনিমা, দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে মামার বাড়িতে থাকি। যখন আমার সাত বছর বয়স তখন ডেঙ্গুতে আমার মা মারা গিয়েছিলেন, শুনেছি আমার জন্মের দেড় বছর পর বাবা শহরে ধান বিক্রি করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। সেই থেকে মামার বাড়িতে মানুষ। মানুষ কতটা হয়েছি বলতে পারব না তবে সমস্ত কাজে পটু হতে হয়েছে মামির তাড়ায়। মামির দুই মেয়ে, এক মেয়ে কলেজে পড়ে আর এক মেয়ে ক্লাস টেনে। আমি ৪০৬ নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা সত্ত্বেও মামি বললেন তোর আর পড়াশোনা করতে হবে না, বাড়ির কাজকর্ম কর। মামা যদিও বলেছিলেন কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য, কিন্তু মামি সেটা চাননি। মামির বক্তব্য ছিল, বেশি লেখাপড়া শিখে গেলে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র পাওয়া যাবে না। তাই আমার আর মামার ইচ্ছা থাকলেও কলেজে আর যাওয়া হয়নি।

সন্ধের একটু আগে লোকটার জন্য মামা মিষ্টি এনে দিলে মামি যখন ভালো কাপড়চোপড় পরে মিষ্টির প্লেটটা সাজিয়ে নিয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দিতে বললেন, মামিকে বললাম বাথরুম থেকে হাতে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে দিচ্ছি বলে মামার কথা মত আমার জিনিসগুলো নিয়ে পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
যখন আমি জয়নগর স্টেশনে এলাম তখন সাতটা বাজে চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, ঠান্ডাটা ও বেশ পড়েছে।পাতলা চেরা উলের একটা সোয়েটার গায়ে আছে ঠিকই কিন্তু তবুও শীত করছে। ওড়নাটা মাথার উপর দিয়ে কান দুটো ঢেকে ফাঁকা বেঞ্চিতে বসে ভাবছি, আমার তো কোথাও কেউ পরিচিত নেই ! যাব কোথায় ? আর থাকলেও সেখানে যাওয়া যেত না তাহলে মামির কাছে খবর চলে যেত। তখনই এনাউন্স হল শিয়ালদা যাওয়ার ট্রেন এক নম্বর প্লাটফর্মে আসবে।

ট্রেনে উঠে পড়লাম, শিয়ালদা স্টেশনে নেমে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি নটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। হাঁটছি আর ভাবছি একেতো ঠান্ডা তার উপর রাত হয়েছে, কোথাও বসে থাকার থেকে কোন ট্রেনে উঠে পড়াই ভালো, যে কোন এক জায়গায় তো যাবে, তারপর দেখা যাক ভাগ্য আমাকে কোন দিকে নিয়ে যায়।
জীবনে প্রথম অচেনা অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি তাও এই শীতের রাতে নিজেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে, শেষ পর্যন্ত আমি কি পারবো নিজেকে বাঁচাতে ! টেনশন তো একটা হচ্ছেই সঙ্গে ভয়ও যে হচ্ছে না তা না, তেষ্টায় গলাটা শুকিয়ে ছিল কল দেখে পিপাসাটা যেন বেড়ে গেল। জল খেয়ে চোখে মুখে একটু দিয়ে ওড়না দিয়ে মুখটা মুছে সামনের দিকে কিছুটা হেঁটেছি দেখলাম একটা ট্রেন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দিকে হেঁটে মাঝামাঝি একটা কম্পার্টমেন্টে উঠে বসে পড়লাম, একটু পরেই ট্রেনটা ছেড়ে দিল, আমি অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা করলাম।

ট্রেনটা এক দেড় ঘন্টা চলার পর যখন প্রায় সব ফাঁকা হয়ে গেল দেখলাম আমি যেখানে বসেছিলাম তার উল্টো দিকের কোনায় একটা ছেলে বসে বই পড়ছে। আগে ভিড় ছিল বলে অতটা খেয়াল করিনি কিন্তু ট্রেন এখন ফাঁকা। ছেলেটার চেহারা আর বই পড়ার ভাব দেখে মনে হল একে বোধহয় বিশ্বাস করা যায় ! আরো কিছু সময় তাকে দেখার পর মনে সাহস করে আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ছেলেটার সামনে দাঁড়ালাম। সে বই থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাতেই তাকে বললাম, আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন ? ছেলেটা বইটা ভাঁজ করে আমাকে আপাদমস্তক দেখে বলল, কি সাহায্য বলুন ?? বললাম, জোর করে বিয়ে দিচ্ছিল বলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। কাউকে চিনিনা, আর এই ট্রেন কোথায় যাচ্ছে তাও জানি না। এরকম অবস্থায় আমাকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা যদি করে দেন তাহলে খুব ভালো হয়। আমি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছি কিন্তু বাড়ি থেকে কলেজে ভর্তি হতে দেয়নি। ছেলেটি সব শুনে বলল, ট্রেনের মধ্যে তো অনেক লোক ছিল তাদের কাউকে কিছু না বলে আপনি আমাকে কথাগুলো বললেন কেন ? আস্তে আস্তে বললাম, আপনাকে দেখে মনে হল বলা যায় তাই বললাম বলে যেখানে বসেছিলাম সেখানে আবার বসতে যাব বলে ঘুরেছি ছেলেটি বলল, এইভাবে বাড়ি থেকে চলে এসেছেন অথচ কোথায় যাবেন জানেন না ! আপনার মা-বাবা তো চিন্তা করবেন। ঘুরে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললাম, মা-বাবা থাকলে কি আর আমার এই অবস্থা হতো ! আমি যখন ছোট তখন তারা সব মারা গেছেন। মামার বাড়ীতে থেকে বড় হয়েছি এখন মামি জোর করে একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করেছিলেন, মামা আমাকে পালিয়ে আসার জন্য সাহায্য করেছেন। এবার ছেলেটা কিছু না বলে কিছুসময় চুপ করে থাকার পর বলল দেখুন, একে ঠান্ডা তার উপর অনেক রাত হয়েছে, অন্য কোথাও আপনাকে নিয়ে যাওয়া খুব রিক্স। হাজারো রকম কৈফিয়ত দিতে হবে, তার থেকে যদি আপনার আপত্তি না থাকে আপনি আমাদের বাড়িতে যেতে পারেন, বাড়িতে আমি আর আমার মা ছাড়া আর কেউ থাকেনা। মা-ও হয়তো অনেক রকম প্রশ্ন আপনাকে করতে পারেন সেইসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ভুলেও দিতে যাবেন না, আমি পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে হোক ম্যানেজ করে নেব। তারপর খোঁজ খবর নিয়ে দেখি আপনাকে কোন একটা কাজে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় কিনা বলে ছেলেটা ব্যাগটা উপর থেকে নিয়ে তারমধ্যে বইটা রেখে মাফলারটা বার করে কানের উপর জড়াতে জড়াতে বলল, পরের স্টেশনে আমাদের নামতে হবে। বাই দি বাই আমার নাম সুমন, আপনার নাম ? বললাম অনিমা দত্ত।

স্কুটির পিছনে বসিয়ে কান মাথা ভালো করে ঢেকে নিতে বলে মিনিট পাঁচেক গাড়িটা চলার পর একটা একতলা বাড়ির গেটের একপাশে স্কুটি টাকে দাঁড় করিয়ে সুমনবাবু আমাকে নামতে বলে সেটা লক করে রেখে ডোর বেল বাজিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মা দরজা খুললেই আপনি মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবেন। তারপর যা বলার আমি বলবো, আপনি দয়া করে চুপ করে থাকবেন। সেই মুহূর্তে আমি সুমনবাবুর পিছনে দাঁড়িয়ে খুব নার্ভাস ফিল করছিলাম কারণ সামনে আবার কাকে দেখব তিনি আবার কি রিয়াক্ট করেন এইসব যখন ভাবছি তখনই
৫০/৫৫ বছর বয়সের একজন সাদা কাপড় পরা ভদ্রমহিল দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালেন। আমাকে দেখে তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই আমি এগিয়ে এসে টুপ করে প্রণামটা সেরে নিলাম। ভদ্রমহিলা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ কে সুমন ? সুমনবাবু বললেন ভিতরে চলো বলছি। আমার দিকে ফিরে বললেন এসো অনি ! আমার তখন হোঁচট খাওয়ার মত অবস্থা, কিছু না বলে একবার সুমনবাবুর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ভিতরে ঢুকে এলাম। সুমনবাবু ব্যাগটা সোফার এক প্রান্তে রেখে মাকে ধরে সোফায় বসিয়ে বললেন, ওর বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল, তাই ও এক জামা কাপড়ে বাড়ি থেকে চলে এসেছে। সুমনবাবুর মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তা তোর সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক ? সুমনবাবু ঢোঁক গিলে বললেন, ওই তো, ওর সঙ্গে আমি এক বছর ধরে বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন তুমি বলোনা ! আমি তখন ভাবছি আমাকে কিছু বলার কথা বারণ করে এখন বলছে তুমি বলো !! আমি কি বলবো !? সুমনবাবুই ব্যাপারটা ম্যানেজ করে মার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, মানে ওকে ভালোবাসি !! আমি সুমনবাবুর কথা শুনে তার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম, সুমনবাবুর মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন এই যে মেয়ে ওদিকে না আমার দিকে ফিরে বলতো, ছেলেটা আমার সকালে অফিস যায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়, এরমধ্যে প্রেম ভালোবাসাটা তোমরা কখন করলে ? আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম সেটা বুঝতে পেরে সুমনবাবু বললেন, এক'বছর আগে ও যখন কলেজে যেত তখন ট্রেনে আলাপ হয়েছিল, তারপর থেকে আস্তে আস্তে আমরা একে অন্যের প্রেমে পড়েছি। আমি সুমনবাবুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগলাম, এছেলে যখন ট্রেনে বসে ছিল তখন তো দেখে একবারও মনে হয়নি ইনি এত কথা বানাতে পারেন ! কি সাংঘাতিক ছেলেরে বাবা মুখে তো কোন কিছুই আটকাচ্ছে না !! এ কি চাকরি করে নাকি কোর্টে উকিল গিরি করে ? মাকে চুপ থাকতে দেখে সুমবাবু তাড়াতাড়ি বললেন, মা এগারোটা বেজে গেছে, খুব খিদে পেয়েছে। আর যা যা জিজ্ঞাসা করার কাল সকালে না হয় কোরো, এখন দুটো খেতে দাও।
সুমনবাবুর মা উঠে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো এক জামাকাপড়ে চলে এসেছে, তোমাকে আমি এখন কি পরতে দেই বলতো ? এসো আমার সঙ্গে দেখি কি করা যায়। সুমনবাবুর মা একটু এগিয়ে যেতে আমি সুমনবাবুর দিকে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললাম, আমি আপনার এই অবদান কোনদিন ভুলতে পারবো না। সুমনবাবু উইন চিটারের চেনটা খুলতে খুলতে বললেন, মাকে যা বললাম সেটা কিন্তু শুধু আপনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য, সত্যি বলে ভেবে নেবেন না। আপনি আমার কাছে সাহায্য চেয়ে ছিলেন, আমি আপনাকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এবার এই আশ্রয়টাকে নীড় বানাতে চাইলে মা-কে সন্তুষ্ট করে চলুন। কাল শুক্রবার বড়দিন, আমার সঙ্গে দোকানে যাবেন, আপনার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং কয়েকটা জামা কাপড় পছন্দ করে নেবেন। আমি সুমনবাবুর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু হেসে ভিতরে চলে গেলাম।

সুমন শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে ভাবতে লাগল, মেয়েটার চেহারাটা যতটা না সুন্দর তার থেকে তার চোখ দুটো আর হাসিটা আরো বেশি সুন্দর।

হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খাওয়ার টেবিলে এসে সুমনবাবু দেখলেন তার মা হটপট থেকে ভাত তরকারি তার থালায় দিচ্ছেন আর আমি তারই পাজামা আর টি-শার্ট পরে লজ্জায় মায়ের পিছনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছি। সে আমার দিকে তাকিয়ে তার মাকে বলল তোমরাও খেয়ে নিলে পারতে রাত তো অনেক হয়েছে। তোর খাওয়া হয়ে গেলে আমরাও খেতে বসব বলে ওনার মা বললেন, আমার জন্য তো দুটো রুটি আছে অনির জন্য প্রেসার কুকারে চাল বসিয়ে দিয়েছি এক্ষুনি হয়ে যাবে বলে ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে কি দেখছিস তোর পাজামা আর জামা পরেছে বলে ! এত রাতে তো মেয়েটাকে নিয়ে এলি একবার ভেবেছিলিস মেয়েটা পরবে কি বলে আমার দিকে ঘুরে বললেন সাদা কাপড় ওকে পরতে দেওয়া যায় তাইতো ওকে তোর জামা প্যান্টের সেট থেকে এই দুটো বার করে দিলাম বলে আবার ঘুরে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, কাল তো তোর ছুটি তুই ওর জন্য কটা জামা কাপড় কিনে নিয়ে আসিস তো। ঠিক তখনই প্রেসার কুকারের সিটিটা উঠলে সুমনবাবুর মা সেদিকে যেতে যেতে ছেলেকে বললেন, খেয়ে গিয়ে তুই শুয়ে পড় আমার আর অনির খাওয়া হয়ে গেলে আমরাও শুয়ে পড়বো।
গল্পটা তিনটে পর্বের
।সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য।

আশ্রয় :~ সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য
পর্ব ২

শোয়ার পর থেকে সারাদিনের ছবিটা যেন চোখের সামনে ভাসতে লাগলো ! আমার জন্য মামার চোখের জল ফেলা, বিয়ের নামে মামির আমাকে বিক্রি করার ছক, লোকটার সেই হাসি আর নোংরা চাউনি আবার পাশাপাশি সুমনবাবু আর তার মায়ের আমার প্রতি করা তাদের ব্যবহার কোথায় যেন বাঁধছে !! বিছানায় শুয়ে এদিক ওদিক করছি আর ভাবছি পাশে শুয়ে থাকা দেবীর মত মানুষটা যিনি আমাকে এত যত্ন করে খাওয়ালেন তাকে ঠকানো কি আমার ঠিক হচ্ছে ? মিথ্যে তো একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই তখন যদি উনি আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন কিংবা ঘৃণা করতে শুরু করেন !? না না সেই মিথ্যে অপবাদ তখন হয়তো আমি সহ্য করতে পারব না তার থেকে যা হওয়ার হোক সত্যিটা ওনাকে বলা দরকার ভেবে উঠে বসলাম। পাশে শুয়ে থাকা সুমনবাবুর মা বললেন, উঠলে কেন বাথরুমে যাবে ? না বলে বললাম, তখন সুমনবাবু আমার যা পরিচয় দিয়েছেন সেটা সত্যি না ! সত্যিটা হলো বলে আমার সব কথা ওনাকে বললাম এমনকি ট্রেনে সুমনবাবুর সাথে যে কথা হয়েছিল তাও। সুমনবাবুর মা উঠে ঘরের আলো জ্বালিয়ে বিছানায় আমার পাশে বসে বললেন, সুমন তোমাকে তো সত্যিটা বলতে বারণ করেছিল তাহলে তুমি বললে কেন ? বললাম সত্যিটা হয়তো আপনি একদিন জানতে পারবেন তখন আমার কথা বাদ দিন আপনি আপনার ছেলেকে প্রশ্ন করবেন না ?? জানতে চাইবেন না কেন আপনাকে মিথ্যে বলা হয়েছিল !? দেখলাম সুমনবাবুর মা অনেক জিজ্ঞাসা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন ! কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বললাম, আমার যখন সাত বছর বয়স তখন আমার মা মারা যান বাবা তো তার অনেক আগে থেকেই নিরুদ্দেশ। তিনি বেঁচে আছেন কি মারা গেছেন আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। মামা মামির কাছে বড় হয়েছি, মামার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেলেও মামি কোনদিন শান্তিতে দুটো ভাত খেতে দেয়নি। আজ আপনি যখন আমাকে গরম ভাতে ঘি দিয়ে ডিম আলু সিদ্ধ মেখে দিলেন সেটা খেতে খেতে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল কারণ, মা মারা যাওয়ার পর এত যত্ন করে আর কেউ আমাকে খেতে দেয়নি। সুমনবাবুর মা আবার বিছানা থেকে নেমে খাটের পায়ার পাশে রাখা জলের বোতলটা নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বললেন, জল খেয়ে শুয়ে পড়ো বলে আলোটা নিভিয়ে নিজে শুতে শুতে বললেন, তুমি যে তোমার আসল পরিচয় আমাকে বলেছ সেটা যেন সুমন জানতে না পারে। সত্যিটা জানার পরও প্রায় কিছুই বললেন না দেখে শ্রদ্ধায় আবেগে বলে ফেললাম, আপনাকে কি মা বলে ডাকতে পারি ? কিছু সময় চুপ করে থেকে পাশ ফিরে শোয়ার আগে বললেন, তোমার যদি ভালো লাগে তাহলে ডেকো। মা মারা যাওয়ার পর যে ডাকটা ডাকতে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম আজ এতগুলো বছর পর মন থেকে কাউকে আবার মা বলে ডাকতে পারবো সেই আনন্দে আমার চোখে জল চলে এলো।

অভ্যাসের কারণে পরদিন খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলে মা ঘুমাচ্ছেন দেখে খুব সন্তর্পনে পাশ থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে এসে সিঙ্কের মধ্যে রাখা রাতের প্রেসার কুকার থালা-বাসন গুলো যখন পরিষ্কার করে মুছছি তখন মা উঠে এসে বললেন, তুমি এগুলো করছ কেন এর জন্য তো লোক আছে বলে একটা বড় স্টিলের পাত্র থেকে খানিকটা আটা বার করে একটা কানা উঁচু স্টিলের পাত্রে রেখে বললেন, তুমি বরং এটা মেখে রাখো আমি ততক্ষণে স্নান আর পুজোটা করে আসি।

সুমনবাবু সকালে উঠে চা বিস্কুট খেয়ে মার কাছ থেকে কি কি আনতে হবে শুনে স্কুটিটা নিয়ে বাজারে বেরিয়ে গেলেন।
ন'টার দিকে কাজের দিদি এলে মা তাকে বললেন, হ্যাঁরে সবিতা তুই আজকে এত দেরি করলি কেন ? তোর আশায় বসে থাকলে তো আমার বাসন গুলো পড়েই থাকতো। সবিতাদি বললেন আজ বড় দিন বলে মেয়েটা আমার মাংস খাওয়ার বায়না করে কাঁদছিল ! ওকে অনেক বুঝিয়ে বলেছি আমাদের মত মানুষদের বড়দিন ছোটদিন বলে কিছু হয় না তাছাড়া এখন তো মাসের শেষ বছরের প্রথমে কাজের টাকা পেয়ে মাংস খাওয়াবো বলে পিংকির মার কাছে ওকে বলে বুঝিয়ে রেখে আসতে দেরি হয়ে গেল। মা বললেন ঠিক আছে আমার রুটি তরকারি হয়ে গেছে সুমনও বাজারে গেছে। ততক্ষণ তুই ঘরদোর পরিষ্কার করতে লাগ ওকে বলেছি কেক আর মাংস নিয়ে আসতে। কাজ সেরে যাওয়ার সময় তোর মেয়ের জন্য কেক আর এক বাটি মাংস নিয়ে যাস। মায়ের কথাগুলো শুনে আমি যখন মাকে দেখছি আর মনে মনে ভাবছি, এরকম মনের মানুষও হয় ! তখন সবিতাদি মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ও মাসিমা মেয়েটি কে ? মা আমার দিকে একবার তাকিয়ে হেসে বললেন, ও আমার বন্ধুর মেয়ে !! ওর বাবা আর আমার বন্ধু আজ আর কেউ বেঁচে নেই !? এতদিন ও ওর মামা মামির কাছেই ছিল। মামার অবস্থাও তেমন ভালো না তার উপর তারও দুটো মেয়ে আছে, মামি ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করত জানতে পেরে গতকাল ওকে আমার কাছে নিয়ে এসেছি, এখন ও আমার কাছেই থাকবে। সবিতাদি হেসে বললেন খুব ভালো করেছেন মাসিমা, এমন সুন্দর দেখতে মেয়েটাকে সুমন বাবার বউ করে রেখে দেন খুব ভালো মানাবে। মা এবার রেগে গিয়ে বললেন, একে তো দেরি করে এসেছিস তার উপর আমি কি করবো না করবো সে কথা বলছিস ! যা আগে গিয়ে বাসি ঘরদোর পরিষ্কার কর সুমন এখনই বাজার থেকে ফিরবে। মায়ের রাগ দেখে সবিতাদি তাড়াতাড়ি ঝাড়ুটা নিয়ে সুমনবাবুর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন l রীতিমতো অবাক হয়ে আমি যখন মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছি আমাকে বন্ধুর মেয়ে বলে পরিচয় দিলেন কেন ! তখন আমার তাকিয়ে থাকা দেখে মা বললেন, আমাকে কি দেখছিস এদিকে এসে পেঁয়াজ আদা রসুন গুলো ছাড়িয়ে পেস্ট করে দে।
সুমন বাজার থেকে এলে মাংসটা ধুয়ে পরিষ্কার করে দিবি যাতে সবিতার কাজ শেষ হওয়ার আগেই রান্নাটা হয়ে যায়। মায়ের মুখে তুই শুনে অবাক হলেও কিছু না বলে ঝুড়ি থেকে পেঁয়াজ আদা রসুন নিয়ে ছাড়াতে লাগলাম।

প্রায় এক ঘন্টারও বেশি সময় পার করে সুমনবাবু বাজার থেকে এসে হাত পা ধুয়ে নিজের ঘরে চলে গেলে মা একটা প্লেটে রুটি তরকারি আর একটা কেকের টুকরো দিয়ে বললেন টিফিনটা সুমনকে দিয়ে আয়। সুমনবাবুকে টিফিনটা দেওয়ার আগে প্লাস্টিকে রাখা আমার মার্কশিট সহ অন্যান্য কাগজগুলো নিয়ে সুমনবাবুর ঘরে এসে দেখি উনি ল্যাপটপে কাজ করছেন। টিফিনের প্লেটটা নিয়ে ওনার সামনে দাঁড়ালে ল্যাপটপে চোখ রেখেই বললেন, হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে কেন এখানে রাখো। আমি প্লেটের তলা থেকে প্লাস্টিকে মোড়া মার্কশিট সহ অন্যান্য কাগজগুলো এবং টিফিনের প্লেটটাও সুমনবাবুর সামনে রেখে বললাম, কোথায় রাখবো শেষে হারিয়ে যাবে এগুলো কাল থেকে আমার জামার মধ্যে রেখেছিলাম এখন আপনি রেখে দিন। সুমনবাবু ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে প্লাস্টিক প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে বললেন এতে কি ! বললাম আমার আধার কার্ড এডমিট কার্ড সহ মার্কশিট ভোটার কার্ড এইসব আছে। সুমনবাবু ল্যাপটপটা সরিয়ে রেখে প্যাকেটটা খুলে এক এক করে কাগজগুলো সব দেখতে দেখতে মার্কশিটটা দেখে বললেন তোমার উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট তো ভালোই ছিল বিশেষ করে ম্যাথে। কিছু না বলে ওনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি মার্কশিটে চোখ রেখেই বললেন, তুমি কি ম্যাথ নিয়ে পড়তে চাও ? আমার মুখটা যেন নিমেষেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বললাম আপনি পড়াবেন ! উনি মার্কশিট থেকে চোখ তুলে আমাকে একবার দেখে আবার মার্কশিটের দিকে তাকিয়ে বললেন, যদি তুমি পড়তে চাও আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি তবে তার আগে মাকে বোধ হয় তোমার সত্যি পরিচয়টা বলতে হবে বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন কারণ, আমি মাকে আগেই বলেছি তুমি যখন কলেজে যেতে তখন তোমার সাথে আমার ট্রেনে আলাপ হয়েছিল। তাহলে বুঝতেই পারছো তুমি যদি পড়তে চাও তাহলে মাকে সত্যিটা এখন বলতেই হবে তারপর দেখি কি করা যায় বলেই বললেন, এগারোটার দিকে রেডি হয়ে নেবে। ঠিক আছে বলে সুমনবাবুর দিকে কৃতজ্ঞচিত্তে তাকিয়ে বললাম, আপনার এই ঋণ আমি শোধ করবো কি করে ! সুমনবাবু খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে বললেন, তুমি যেদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কোন বিপদে পড়া মানুষকে আশ্রয় দিয়ে তার পাশে থাকবে সেদিন না হয় এই ঋণটা শোধ হয়ে যাবে। মনটা ভার হয়ে গেল, সুমনবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে ভাবতে লাগলাম, আমি কি কোনদিন পারবো এই মানুষটা যা চাইছে সেটা করতে !

এগারোটার দিকে সুমনবাবু যখন অনি চলো বলে ডাক দিলেন তখন আমি রান্নাঘরে মার সাথে রান্নায় ব্যস্ত ছিলাম। সুমনবাবুর ডাক শুনে মাকে বললাম, দোকানে যাওয়ার জন্য ডাকছেন। মার মাংস রান্না হয়ে গেছে, সবিতাদিকে একবাটি মাংস আর দু টুকরো কেক দিয়ে আধ ঘন্টা আগে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন উনি নিরামিষ পনিরের তরকারি রান্না করতে করতে বললেন, এইভাবে যাসনে কাল যে চুরিদারটা পরে এসেছিলিস সেটা পরে যা। ঠিক আছে বলে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে যখন চুরিদার পরছি তখন সুমনবাবু স্কুটির হর্ন বাজিয়ে তাড়া দিলেন। চুড়িদার পরা শেষ করে মামার দেওয়া ৫০০ টাকা নিয়ে চুল না আঁচড়িয়ে আবার দৌড়িয়ে মার কাছে এসে বললাম যাচ্ছি। মা রান্না ঘরের দরজার সামনে এসে বললেন প্রয়োজনীয় যা যা লাগবে সেগুলো কিন্তু মনে করে নিস। ঠিক আছে বলে বাইরের দরজাটা ভেজিয়ে সুমনবাবুর স্কুটিতে উঠে বসলাম।

মলে মেয়েদের জামা কাপড়ের সেকশনে এসে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে সুমনবাবু বললেন, তুমি যে সব জামাকাপড় পরো এমনকি তোমার যা যা লাগে তুমি তোমার পছন্দমত নিয়ে নাও আমি এখানে আছি।
আগে কখনো নিজের জিনিস পছন্দ করে কেনার সৌভাগ্য হয়নি তার উপর এত বড় বিশাল স্টোরের মধ্যে ঢুকে কোন দিকে যাব যখন ভেবে পাচ্ছি না তখন সুমনবাবু বললেন, সামনের দিকে এগিয়ে যাও ওদিকে সব পাবে। এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে যেদিকে চুড়িদার ঝুলছে সেদিকে গিয়ে একসেট চুড়িদার সঙ্গে কিছু মেয়েলি জিনিসপত্র নিয়ে কাউন্টারের সামনে এলে সুমনবাবু বললেন আর কিছু নেবে না ! বললাম এইতাই অনেক টাকা হয়ে গেছে বলে নিজের কাছে রাখা ৫০০ টাকা সুমনবাবুর দিকে বাড়িয়ে ধরলে উনি হাসির মতো ভাব করে বললেন, টাকাটা তুমি তোমার কাছে রেখে দাও। এই একটা চুড়িদারে তোমার হবে কি ? আর একটা অন্তত নিয়ে নাও বলে বললেন চলো দেখি। শেষ পর্যন্ত দুটো চুড়িদার সেট একটা চাদর এবং অন্যান্য জিনিস নিয়ে সাড়ে বারোটার মধ্যে বাড়ি চলে এলাম। বাড়ি আসা মাত্র মা বললেন কই দেখি কি কি জিনিস কিনেছিস ! মা চাদর চুড়িদার ও অন্যান্য জিনিস গুলো দেখে ঠিক আছে বলে বললেন একটা কাপড় নিসনি কেন ? বললাম আমি তো কাপড় পরিনা। মা সুমনবাবুকে ডাক দিলেন, সুমনবাবু এলে মা বললেন ওর একটা কাপড় কিনে দিসনি কেন ? মেয়েদের কাপড় না পরলে ভালো লাগে ! তুই আবার যা, ওর জন্য একটা ভাল কাপড় পছন্দ করে নিয়ে আয়। সুমনবাবু বললেন ও তো একটা চুড়িদার নিয়ে চলে আসছিল আমিই তো জোর করে আর একটা নিতে বললাম সেই সঙ্গে শীতের কথা ভেবে চাদরটাও নিলাম। তখন অবশ্য কাপড়ের কথাটা মাথায় আসিনি ঠিক আছে এখন আর যাব না পরে নিয়ে নেব বলেই বললেন, তোমার কি রান্নার ঝামেলা মিটেছে ? মা হ্যাঁ বলে বললেন কেন ?? তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল বলে সুমনবাবু আমার দিকে তাকালেন। আমি তখন কিনে আনা জিনিসগুলো আবার প্যাকেটের মধ্যে গুছিয়ে রাখছিলাম। মা আমাকে বললেন, বেলা অনেক হয়েছে তুই স্নানটা করেনে বলে ছেলের দিকে ফিরে বললেন তোর ঘরে চল।

রাতে মার পাশে শুয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সকালে সবিতাদিকে আমি আপনার বন্ধুর মেয়ে বলে কেন পরিচয় দিলেন বুঝতে পারলাম না ! মা বললেন সবিতা বিশ্বাসী হলেও বাইরের লোক, আর বাইরের লোকের কাছে সব সময় সব সত্যিটা বলতে নেই কারণ কথার গুরুত্ব না বুঝে ভুল করেও সে যদি কখনো সেটা কোথাও বলে ফেলে তাহলে তার ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কিছু সময় চুপ করে থেকে আবার বললাম, সবিতাদির স্বামী কি কিছু করেন না ? করবে কি সে তো নিরুদ্দেশ বলে মা বললেন, কিছু কিছু পুরুষ মানুষ আছে যারা নেশা ছাড়া থাকতে পারে না সবিতার স্বামীও ছিল তাদের মত একজন। সবিতা ওর লরিচালক স্বামীর সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছিল। বছর যেতে না যেতে ওর স্বামী রাত দিন নেশা করতে লাগলো, সেই কারণে শুরু হল ওদের সংসারে অশান্তি। এইভাবে দিনের পর দিন চলতে চলতে একদিন সবিতা জানতে পারলো সে মা হতে চলেছে। তখন সে তার বাচ্চার কথা বলে স্বামীকে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু কুকুরের লেজ কি কখনো সোজা হয় ! মাস দুই নেশার মাত্রা কমিয়ে লরি চালানোর কাজে মন দিয়েছিল তারপর আবার আস্তে আস্তে যে কে সেই। সবিতার তখন পাঁচ মাস, সেদিন তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হলে সেই রাতেই ওর স্বামী ডাবের গাড়ি নিয়ে দিল্লির পথে রওনা হয়ে যায় তারপর থেকে আজও সে ফেরেনি। স্বামী চলে যাওয়ার পর দিন দশেক কোনরকমে চলেছিল তারপর একদিন আমার বাড়িতে এসে বলল তাকে একটা কাজ দিতে। সুমন তখন হোস্টেলে থেকে তার দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিল। তার বাবা যে কিডনির অসুখে ভুগছে সেটা জানতে পারলে সে হয়তো হোস্টেল ছেড়ে বাড়ি চলে আসবে এই ভয়েতে তাকে বলতাম, তোর বাবার শরীর ইদানিং ভালো যাচ্ছে না তবে আমি তো আছি ডাক্তার হসপিটাল যা করতে হয় আমি করব তুই পড়াশোনাটা ঠিক মতো করে যা।
দিন দিন সুমনের বাবার শরীর খারাপ হতে লাগলো একা ডাক্তার হসপিটাল সংসার করে উঠতে পারছিলাম না আমারও একজন লোকের দরকার ছিল। তাই সেদিন সবিতাকে দেখে বলেছিলাম তুমি কি পারবে এই অবস্থায় রান্না আর ঘরদোর পরিষ্কার করতে ? তবে তোমার একবেলা খাওয়াটা আমি দেব। ও তখন হ্যাঁ পারবে বলে রাজি হয়ে গিয়েছিল। সেই পাঁচ বছর আগে থাকতে ও আমার বাড়িতে কাজ করছে, ওর মেয়েটার বয়স এখন সাড়ে চার বছর। তবে সবিতা খুব ভালো মেয়ে ওর কোন অসুবিধে হলে আমি এখনো ওকে দেখি কারণ সুমনের বাবা মারা গেলে ও আমাদের জন্য অনেক করেছিল। সেই সময় এমন দিন গেছে ওকে বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে সুমনের বাবার ব্যাংকের হেড অফিসে দিনের পর দিন যাতায়াত করতে হয়েছে টাকা পয়সা গুলো উদ্ধার করতে। এখন আমি পেনশনের টাকা পেলেও সুমন ওর বাবার চাকরিটা পায়নি। ব্যাংক বড়ই টালবাহানা করছিল বলে সুমন অন্যত্র চেষ্টা করছিল, শেষ পর্যন্ত ও পাস করার সাত মাসের মধ্যেই বেসরকারি সংস্থায় একটা ভালো চাকরি পেয়ে যায় তারপর থেকে আমি আর ওর বাবার চাকরির ব্যাপারে চেষ্টা করিনি। সবিতা আমার বাড়িতে এখন বাসনমাজা কাঁচাকুচি আর বাইরের কাজ করে চলে যায়। ওর কাছেই শুনেছি ও এখান থেকে গিয়ে অন্য দু জায়গায় রান্নার কাজ করে, মোটামুটি ওর এখন চলে যায়। বলেছি ওকে মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করবি যখন আমাকে বলবি ওর স্কুলের ব্যাগ ড্রেস এমনকি ভর্তির ফি যা লাগে সব আমি দেবো।
সবিতাদির কথা শুনতে শুনতে আমি যেন আমার ছোটবেলার জীবনে ফিরে গিয়েছিলাম সম্বিত ফিরল মার কথায়। মা বলছেন, সুমন তখন আমাকে ডেকে তোর কথা সব বলে এও বলছিল, অত রাতে নাকি তোকে ছেড়ে আসলে যদি তুই কোন বিপদে পড়ে যেতিস তাই তোকে একা না ছেড়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসে আমার কাছে মিথ্যে পরিচয় দিয়েছিল বলেই মা বললেন, শুনলাম তোর নাকি উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট ভালো ছিল। কলেজে কি ভর্তি হতে চাস ? শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বললাম, দু'বছর আগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে কলেজে যাব ভেবেছিলাম কিন্তু মামী যেতে দেয়নি, আমার পড়ার খুব ইচ্ছা সেদিনও ছিল আজও আছে। আমিও চাই তুই উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিজের পায়ে দাঁড়া বলে আমাকে আবার শুতে বলে মা বললেন, সুমনকে বলেছি তুই যদি পড়তে চাস তাহলে যেভাবেই হোক তোকে যেন কলেজে ভর্তি করে দেয়।
।সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য।
আশ্রয় :~ সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য
তৃতীয় ও শেষ পর্ব

আমার ভর্তির ব্যাপারে সুমনবাবু দু'দিন অফিস ছুটি নিয়ে প্রিন্সিপাল এবং ভাইস প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করে অনেক কাট খড় পুড়িয়ে একাউন্টেন্সিতে অনার্স দিয়ে ভর্তি তো আমাকে করে দিলেন কিন্তু সমস্যা হল চার মাস পর পরীক্ষা। দু'বছর পড়াশুনোর বাইরে থেকে এখন সুমনবাবু আর মায়ের মান রাখাটাই আমার কাছে সব থেকে বড় সমস্যা।
কলেজ থেকে ফেরার পথে একটা স্মার্টফোন কিনে সুমনবাবু বললেন এটা এখন থেকে তোমার দরকার হবে। তুমি কি স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারো ? বললাম চোখে দেখেছি কিন্তু হাতে নিয়ে কখনো দেখিনি তাছাড়া এই ধরনের ফোন ব্যবহার করা মানে তো বিলাসিতা। সুমনবাবু হেসে বললেন এখন আর এটা বিলাসিতার মধ্যে পড়েনা, এখন এটা জানার মাধ্যম তাইতো স্টুডেন্ট বলো বা যেকোনো পাবলিক তাদের অজানাকে জানতে সবাই এই ফোনই ব্যবহার করে। ক্যাশমেমো সমেত ফোনটা আমার হাতে দিয়ে বললেন এটা তোমার ব্যাগে রাখো বাড়িতে গিয়ে কিভাবে এটা ব্যবহার করতে হয় সেটা তোমাকে আমি দেখিয়ে দেবো।

শুধু ফোনটাই উনি দেখিয়ে দেননি, এই চার মাসে যখন সময় পেয়েছেন তখনই আমাকে নিয়ে বসে পড়িয়েছেন লিখিয়েছেন নোট তৈরি করে দিয়েছেন। অফিসে থাকলেও যখন যেটা আমার বুঝতে অসুবিধা হয়েছে সেটা ফোন করে ওনাকে জিজ্ঞাসা করে নিয়েছি, কখনো বিরক্ত হননি। আমি নিজেও এই চার মাস রাত দিন আমার সাবজেক্টের মধ্যে ডুবে ছিলাম ফলস্বরূপ পাসটা কোনরকমে করেছি। মা খুশি হলেও সুমনবাবু বলেছেন, দ্বিতীয় বর্ষে কিন্তু ভালো রেজাল্ট করতে হবে সেই সঙ্গে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কম্পিউটারটাও এবার ভালো করে শিখতে হবে বলে প্রায় এক মাস উনি আমাকে ওনার ল্যাপটপে যখন সময় পেয়েছেন শিখিয়েছেন প্র্যাকটিস করিয়েছেন তারপর ব্রেনওয়্যারে নিয়ে এসে অনেকগুলো টাকা দিয়ে বিসি এ কোর্সে ভর্তি করে দিয়ে বললেন, তোমার পড়াশুনোর সাথে সাথে এই কোর্সটাও করা থাকলে চাকরি তুমি অবশ্যই একটা পাবে।
সেদিনই বইয়ের দোকানে কোর্সের বই কিনে দিতে নিয়ে এসে বললেন, তোমার মত সুযোগ সবাই হয়তো পায় না তুমি পেয়েছো কাজে লাগাও।
এখন থেকে নিজের ক্যারিয়ারের দিকে নজর দাও ভুলে যাও তুমি কোথা থেকে এসেছে মাথায় রাখো তোমাকে কোথায় যেতে হবে।

রাতে শুয়ে সুমনবাবুর সাথে কাটানোর সারাদিনের টুকরো টুকরো ছবি চোখের সামনে ভাসতে লাগলো, পড়াশুনোর প্রতিটা ব্যাপারে প্রতিনিয়ত তার কেয়ার নেওয়ায় দিন দিন তার উপর প্রত্যাশা বেড়েই গিয়েছিল ! তাকে শুধু মনের কথাটা না বলে সব বলতাম। আজ যেমন খিদের কথাটা বললাম ! ব্রেনওয়্যারে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে বুক স্টোর ঘুরে খিদে লাগায় যখন সেটা সুমনবাবুকে বললাম তখন উনি আমাকে একটা রেস্টুরেন্ট নিয়ে গিয়ে মিক্সড চাউয়ের অর্ডার দিয়ে পকেট থেকে রুমালটা বার করে সেটা আমার হাতে দিয়ে মুখের ঘাম মুছে নিতে বলে বলেছিলেন, এখন অনেক পুরুষের হাতছানি পাবে নিজেকে সংযত রেখো। কথাটার মানে তখন বুঝতে না পারলেও এখন মনে হচ্ছে সুমনবাবু ঘুরিয়ে আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন ! কিন্তু কি সেটা ? তখনই পাশ থেকে মা বললেন এখনো ঘুমাসনি, সারাদিন তোদের বোধহয় খুব ধকল গেছে !! মার দিকে ফিরে ব্রেনওয়্যার থেকে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত শুধু সুমনবাবুর বলা অন্য পুরুষের হাতছানির কথাটা বাদ দিয়ে সব বলতে লাগলাম।

দু'দিন পর সেদিন ছিল রবিবার, সকালের টিফিনের রুটিটা করে দিয়ে আমি মার ঘরে বসে পড়ছি, এমন সময় ডোর বেলের আওয়াজ হলে মা রান্না করতে করতে বললেন দেখতো অনি কে ডাকছে। মনে মনে ভাবলাম ন

 #লড়াই নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে মল্লিকা তার  চারদিনের সদ্যজাত ছেলের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবল কি করে অনিরুদ্ধ এমন ...
08/02/2026

#লড়াই
নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে মল্লিকা তার চারদিনের সদ্যজাত ছেলের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবল কি করে অনিরুদ্ধ এমন কথা বলতে পারে।এই ছেলেকে নিয়ে তার সংগে শ্বশুর,শাশুড়ি ও স্বামী অনিরুদ্ধের সংগে তার চারদিন ধরে নিরন্তর লড়াই চলছে।ফুটফুটে একরাশ জুঁই ফুলের মতো শিশুটি এখন মায়ের বুকের দুধ খেয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

মল্লিকা ছেলের গায়ে আলতো হাত রেখে বলল--কি রে ব্যাটা বেশ তো নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিস।তুই কি টের পাচ্ছিস তোকে নির্বাসনে পাঠানোর জন্য তোর জন্মদাতা বাপ,তোর আপন জনেরা কি গভীর ষড়যন্ত্র করছে।এবার তো প্রতিপক্ষদের সংগে চ্যালেঞ্জ করে আমার এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ময়দানে নামার সময় হয়েছে।তুই আমার সংগে থেকে আমাকে জিতিয়ে দিতে পারবি তো?

অনিরুদ্ধ তো শেষ কথা একরকম বলেই গেছে এই সন্তানকে সে মেনে নিতে পারবে না।এই অনিরুদ্ধকে মল্লিকা চিনতে পারছে না।তার সুদর্শন চেহারা মার্জিত ব্যবহার ক্রমশ এই চারদিনে গিরগিটির মতো ধীরে ধীরে রঙ পাল্টাচ্ছে।

পেশায় টগবগে চেহারার সুদর্শন তরুণ অধ্যাপক অনিরুদ্ধের সংগে ইউনিভার্সিটিতে এম এ সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় তার আলাপ। দীর্ঘ পাঁচ বছর মেলামেশার পর ও নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে মল্লিকা গড়িমসি করছিল। মাত্র মাস ছয়েক হল সে স্কুলে জয়েন করেছে।ইতিমধ্যে সে একবারই অনিরুদ্ধর অনুরোধে এক রবিবার তাদের বাড়ি ঘুরে এসেছে।তাদের বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ী,চারদিকে বিত্ত ও বৈভবের ছড়াছড়ি নিজে চোখে দেখে এসেছে।বাড়িতে তিনজন মেম্বারের জন্য হাফডজনের বেশি কাজের লোক।অবশ্য অনিরুদ্ধের বাবা মা তাকে সাদরে আন্তরিক অভ্যর্থনা করেছে।

চাকরি পাওয়ার পরে এক রবিবার অনিরুদ্ধ বলল--মল্লিকা এবার নিশ্চয়ই আমার অপেক্ষার অবসান হয়েছে?আমার বাবা মা একদিন তোমার বাবা মা র সংগে আলাপ পরিচয় ও বিয়ের কথা বলতে চায়। কি হল কিছু বলবে না?

মল্লিকা বলল--আচ্ছা অনি বিয়েটা আর কিছুদিন পরে করলে হয় না?--কেন বলো তো? আমাকে নিয়ে তোমার মনে কি কোন দ্বিধা আছে?---না তোমাকে নিয়ে আমার মনে কোনো দ্বিধা নেই।অনিরুদ্ধ বলল--তাহলে?--- শুনেছি মেয়েদের শাড়ির মতো তুমি ঘনঘন দামী গাড়ি পাল্টাও।--ও এই কথা?আসলে আমার গাড়ির নেশা ছাড়া অন্য কোনো নেশা নেই।কলেজে পড়তে বাইক পাল্টাতাম।কিন্তু ঘনঘন তো নয়।চাকরি করা কালীন মাত্র দুবার পাল্টিয়েছি।

মল্লিকা বলল-- না সেটাও ঠিক নয়।আসলে তোমাদের সংগে আমাদের ক্লাসের আসমান জমিন ফারাক।এটা নিয়েই আমার দ্বিধা।আমি নিতান্তই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।আমার বাবা অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক।ভাইকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে আর একটা দু কামরার ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে তার সঞ্চয় একরকম তলানিতে।বাবাও এই অসম বিয়েতে খুব চিন্তিত।বাবার ধারণা বড়লোকদের ঘরেই আকছার ডিভোর্স,পরকীয়া বধূহত্যার মতো জিনিসগুলো ঘটে।

অনিরুদ্ধ বলল--মধ্যবিত্ত পরিবারে কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারে এসব হয় না বলছ?মল্লিকা খারাপ ভালো চিরকালই আছে এবং থাকবে।সেই জন্যেই কি তুমি নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে না করার কথা ভেবেছিলে? মল্লিকা বড়লোক হওয়া কি অপরাধ? আর বিয়ের সংগে টাকা পয়সার কি সম্পর্ক? আমার সংগে এতদিন মেলামেশার পরেও একথা তুমি বলতে পারলে?

মল্লিকা মুচকি হেসে বলল--অনি আমি মনে করি প্রত্যেকটা মেয়েরই স্বাবলম্বী হওয়া দরকার।বলা তো যায় না ভবিষ্যতে হয়তো আমাকে তোমার ভালো লাগল না।ভালোবাসাটা তোমার কাছে মোহ বলে মনে করে আমাকে ডিভোর্স দিতে চাইলে। কিংবা ধর তুমি অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে।

অনিরুদ্ধ বলল-- তাই?তো সেটা তো তোমার ক্ষেত্রেও হতে পারে।--- দেওয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা হয় না বললেই চলে।আসলে বেশিরভাগ মেয়েরা পরিস্থিতির শিকার।তারা কখনো সন্তানের মুখ চেয়ে কখনো বাবা মায়ের মুখ চেয়ে কখনো বা লোকলজ্জার ভয়ে পরিস্থিতিকে বাধ্য হয়ে মেনে নেয়।

অনিরুদ্ধ বলল--মল্লিকা মাত্র ছ সাত মাস চাকরি করে তুমি বড্ড দিদিমণি সুলভ আচরণ করছ।এখনও বিয়েটাই হল না এর মধ্যে ডিভোর্স,পরকীয়া বধূহত্যা সব একসঙ্গে টেনে আনছ।দুর তুমি আমার মেজাজটাই বিগড়ে দিলে।

মল্লিকা বলল--আরে আমি তো ঠাট্টা করছিলাম।আসলে আমি চাকরির চেষ্টা করার জন্য তোমার কাছে কিছু সময় চেয়েছিলাম।ভাগ্যগুণে আমি চাকরিটা পেয়ে গেলাম।না পেলে কি আর হত।বিয়ের পর না হয় আবার চেষ্টা করতাম। আমি আমার বা তোমার ভালোবাসা কে একবার ও অস্বীকার করিনি।তোমাকে আমি শুধু ভালোইবাসি

না সম্মান ও করি।

-- জানো মল্লিকা আমার দাদু ছিলেন স্কুলের হেড মাস্টার মশাই।শুনেছি তাঁর বাবাও শিক্ষকতা করতেন।শুনেছি আমাদের কোনো পূর্বপুরুষ চিত্রশিল্পী ছিলেন।আসলে আমাদের বংশটাই শিক্ষকতার বংশ।একমাত্র বাবাই প্রথম এই পরিবারে ব্যবসায়ী। উত্তরাধিকার সুত্রে দাদুর অনেক টাকা পয়সা বিষয় সম্পত্তি ছিল। বাবা মাত্র কয়েক বছরে ব্যবসা করে সেটা চতুর্গুণ বাড়িয়েছে।মল্লিকা বলল--আমি কি তোমার কাছে এত কৈফিয়ত চেয়েছি?--তাহলে তুমি রাজি? মল্লিকা বলল--অগত্যা।

বিয়ের পর মল্লিকার কাছে দু বছরের কিছু বেশি সময়টা ছিল গোল্ডেন টাইম।অনিরুদ্ধর বাবা মা তাকে নিজের মেয়ের মতো সাদরে তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন।মল্লিকা ছুটির দিন ছাড়া কাঁটা বাছার ভয়ে মাছ খেতে চাইত না।বিয়ের আগে মা কোনো কোনোদিন সময় পেলে মাছ বেছে জোর করে খাওয়াতো।শাশুড়ি মা তার মাছ না খাওয়াটা কয়েকদিন লক্ষ্য করে প্রতিদিন মাছের কাঁটা বেছে দিয়ে সামনে বসে খাওয়াতেন।বড়লোকের ঘরে শ্বশুর মশাই শাশুড়ি মা কেমন হবে সেটা নিয়ে তার বাবা মায়ের মতো তার মনেও যথেষ্ট আশঙ্কা ছিল। শ্বশুর মশাই একটু চুপচাপ গম্ভীর প্রকৃতির হলেও শাশুড়ি মা মানুষটা আদ্যোপান্ত ভালো ও নরম মনের মানুষ।

এই বাড়িতে তাকে কুটো ভেঙে দুটো করতে হয় না।এত আরাম বিলাস,কাজের লোকজন নিয়ে মল্লিকা একদমই অভ্যস্ত ছিল না।তার মা নিজে হাতে এখনও রান্না করে।সে নিজেও রান্না করতে,ঘর গোছাতে,সংসারের এটা ওটা কাজ করতে ভালোবাসে।

বাতের ব্যথায় মা মাঝে মাঝেই রান্না করতে পারত না।পুরো রান্নাটা তখন মল্লিকাই করত। ভাগ্যিস চাকরিটা পেয়েছিল। না হলে এত অখণ্ড অবসর কাটানো তার পক্ষে দুর্বিষহ হয়ে যেত।

বিয়ের দুবছর পর মল্লিকা সন্তানসম্ভবা হল।তার আদর যত্ন চতুর্গুণ বাড়ল।রাতে অনিরুদ্ধ মল্লিকাকে আদর করতে বলল-- আজ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।এবার আমরা পরিপূর্ণ হতে চলেছি।মল্লিকা বলল--কেন এতদিন কি আমরা অসম্পূর্ণ ছিলাম?--না পূর্ণ ছিলাম।এবার পরিপূর্ণ হব।আমার কিন্তু তিনটে সন্তান চাই। ছোটোবেলায় একটা ভাই কিংবা বোনের জন্য আমার খুব কষ্ট হত। --আহা চাইলেই যখন তখন এত কৃপণতা করে চাইছ কেন?-- ছটা আটটা চাও।--ঠাট্টা করছ?আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি।অবশ্য তুমি না চাইলে আমি অসহায়।জানো আমার দাদুদের সময়ে তো ফ্যামিলি প্ল্যানিং ছিল না।কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের পুরুষানুক্রমে এক সন্তানের বংশ।

মল্লিকা বলল--আহা তুমি মুখফুটে আমার কাছে চাইলে আমি কখনো না করতে পারি?--আবার ঠাট্টা?--আচ্ছা আচ্ছা যে আসছে তাকে তো আগে আসতে দাও।তারপর না হয় আর একটা সন্তানের কথা ভাববে।

ক্রমশ--
ধারাবাহিক গল্প
লড়াই
প্রথম পর্ব
ছবি ব্যানার্জী
ধারাবাহিক গল্প
লড়াই
দ্বিতীয় পর্ব
ছবি ব্যানার্জী

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মল্লিকা নির্দিষ্ট দিনে যেদিন একটা ফুটফুটে ছেলের জন্ম দিল সেদিন সকাল থেকে অনিরুদ্ধ তার বাবা মা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।নার্স একটা সাদা তোয়ালেতে মুড়িয়ে বাচ্চাকে নিয়ে আসতেই সবাই উদ্ভাসিত মুখে বাচ্চার ওপর ঝুঁকে পড়ল।

অনিরুদ্ধ বলল--নার্স, ছেলে না মেয়ে?নার্স বলল--ছেলে,কিন্তু--
--কিন্তু কি?তোয়ালেটা সরান।নার্স তোয়ালেটা সরাতেই সবাই একসংগে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।বাচ্চাটার দুটো পা দোমড়ানো সংগে পায়ের সব আঙুলগুলো একসংগে লেপটিয়ে আছে।ওদের সবার মুখ মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল।অনিরুদ্ধ কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।একটু পরেই মল্লিকার শ্বশুর শাশুড়ি গম্ভীর মুখে চলে গেলেন।

পরদিন অনিরুদ্ধ বেশ হাসিমুখে এসে বলল--মল্লিকা আমি সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করেছি। একটা অনাথ আশ্রমের সংগে যোগাযোগ করেছি।ওই আশ্রমের কর্মাধ্যক্ষ আমার বন্ধুর এক অকৃতদার দাদা।মোটা অঙ্কের টাকা ডোনেট করব।ওরা রাজি হয়েছে।

মল্লিকা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল--আমাদের ছেলে অনাথ?একথা বলতে পারলে?--একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দ্যাখো মল্লিকা।আমাদের সবে বিবাহিত জীবন শুরু হয়েছে।এই বিকলাঙ্গ ছেলেটা আমাদের সারা জীবনের একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।ও আমাদের জীবন থেকে সব আনন্দ মুছে দেবে।তোমার শরীর ঠিক হলে পরের বার আমাদের সুস্থ সন্তান আসবে।

মল্লিকা বলল--পরের বার ও যদি এরকম টাই কিছু হয়?তাহলে তাকেও কি তুমি মোটা টাকা ডোনেট করে ওই অনাথ আশ্রমেই ফেলে আসবে?--কিংবা ধরো তোমাদের বংশপরম্পরা মতো এই একটাই সন্তান ছাড়া আর সন্তানের জন্মই হল না। তখন? অনিরুদ্ধ বলল--যদি বলে কিছু হয় না মল্লিকা।এটা তুমিও জানো আমিও জানি।মল্লিকা বলল--শোনো অনিরুদ্ধ এগুলো সবই আমি কথার কথা বলছিলাম।একটা পরিস্কার কথা শুনে রাখো অনিরুদ্ধ। আমার সন্তান আমার কাছেই থাকবে।ওর শুধুমাত্র একটা অঙ্গ বিকল।ওর যদি সর্ব অঙ্গ ও বিকল হত তবু ও আমার কাছেই থাকত।এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে। আমি ওকে বেস্ট ট্রিটমেন্ট করাবো।একজন বাবা মা সন্তানের জন্ম দেয় শুধুমাত্র ক্ষণিকের সুখের জন্য নয়।সন্তানকে আজীবন সুরক্ষা ও একজন সফল মানুষ গড়ার জন্য তারা উভয়েই অঙ্গীকারবদ্ধও থাকে।সেই দায়বদ্ধতা তুমি অবলীলায় অস্বীকার করলেও আমি পারি না।

অনিরুদ্ধ বলল--মল্লিকা আমি তোমাকে দুদিন ভেবে দেখার জন্য সময় দিলাম।বাস্তবকে মেনে নাও।ও ছেলে জীবনেও মানুষ হওয়া তো দুরের কথা নিজের পায়ে দাঁড়াতেই পারবে না।আমি নিজে ডাক্তারের সংগে কথা বলে জেনেছি।

আজ মল্লিকার শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন।মল্লিকার বাবা মা ছোট ভাই রঞ্জন আর অনিরুদ্ধর সংগে ওর বাবা মা এসেছে।মল্লিকা শ্বশুর শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল--আপনাদের ও কি একই মত?আপনাদের বংশধর তার পরিবার থাকতেও অনাথ আশ্রমে মানুষ হবে?শাশুড়ি মা বললেন--মল্লিকা তোমার ভালোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।তোমার ছেলে অনাথ আশ্রমে থাকলেও যথেষ্ট সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে।আমরা প্রতি বছর ওখানে যথেষ্ট টাকা পাঠাবো। শুধু ওর কোনো পরিচয় থাকবে না।নিজের পরিচয়ে বড় হবে।

মল্লিকা বলল--আপনি নিজে একজন মা হয়ে একথা বলতে পারলেন?মায়ের সংগে সন্তানের নাড়ির বন্ধন।পুরুষরা তো সন্তান ধারণ করে না।একজন মা ই তিলতিল করে সন্তানকে নিজের গর্ভে ধারণ করে তাকে পৃথিবীর আলো দেখায়।আমার সন্তান আমার কাছেই থাকবে মা।

অনিরুদ্ধ বলল--মল্লিকা এটাই যদি তোমার শেষ সিদ্ধান্ত হয় তাহলে আমদের বাড়ির দরজা তোমার জন্য চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। আমি তোমাদের ভরণপোষণের জন্য অনাথ আশ্রমে যে টাকাটা ডোনেট করব বলেছিলাম সেটার সংগে প্রতি মাসে নিয়মিত টাকা পাঠাবো।শুধু তোমার আর তোমার বিকলাঙ্গ সন্তানের সংগে জীবনে কখনও যোগাযোগ থাকবে না। মল্লিকার বাবা আর রঞ্জন বলল--আমাদের বাড়ির দরজা দিদিভাইয়ের জন্য আজীবন উন্মুক্ত।

মল্লিকা বলল--অনিরুদ্ধ ভাগ্যিস আমি চাকরি পাওয়ার পরে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।ভেবোনা চাকরি না পেলেও আমি তোমার থেকে একটা টাকাও অনুদান নিতাম না।মেয়েরা তখনই অসহায় হয় যখন তার নিজের পরিবার ও পাশে থাকে না।এক্ষেত্রে আমি অসহায় নই।আমার এই লড়াইয়ে আমার বাবা মা ও ভাই আমার সহযোদ্ধা।আমি নিঃশর্তে তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব।অনিরুদ্ধ বলল--মল্লিকা আমি তোমাকে ভালোবাসি।আর তুমিও আমাকে ভালোবাসো।একটা বিকলাঙ্গ ছেলের জন্য আমাদের ভালোবাসাকে নষ্ট করার আগে বাস্তবটা মেনে নাও।তোমার আমার সামনে একটা গোটা জীবন পড়ে আছে।মল্লিকা বলল--তুমি ঠিকই বলেছো।এই সন্তান তো আমাদের ভালোবাসারই সন্তান।সেই সন্তানকে আমি কোনো মূল্যেই ত্যাগ করতে পারব না।এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।

ওরা চলে গেলে মল্লিকা রঞ্জনকে বলল-- রঞ্জু এখানে ডাক্তার বাবু বলেছেন ওরা সার্জারি করে আপাতত পায়ের আঙ্গুলগুলো আলাদা করতে পারবেন।তার পরের চিকিৎসাটা দীর্ঘমেয়াদি। সফলতার চান্স ফিফটি ফিফটি। ভাবছি পুরো চিকিৎসাটা ব্যাঙ্গালোর থেকে করব।এখানের চিকিৎসা অনেক ব্যয়সাধ্য।তোর কাছে উঠলে হোটেলের খরচটা বাঁচবে। জানিনা ও কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে কিনা।

রঞ্জন বলল--তুই এত হতাশ হচ্ছিস কেন দিদিভাই?আগে চিকিৎসাটা শুরু হতে দে।ভবিষ্যতে ও নিশ্চয়ই ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটাচলা করতে পারবে।কতজনের তো জন্ম থেকে দুটো হাত থাকে না, কিংবা আরো জটিল সমস্যা নিয়ে জন্মায়।আমার ভাগ্নের তো শুধু দুটো পায়ের পাতার সমস্যা।দেখবি ও একদিন লেখাপড়া শিখে ভালো চাকরি করবে।তোর আর অনিরুদ্ধদার জিন ওর শরীরে। হাজার প্রতিকূলতার সংগে লড়াই করে ও বিজয়ী হবেই।মল্লিকা গম্ভীর হয়ে বলল--রঞ্জু এই নামটা জীবনে কখনও তুই উচ্চারণ করবি না।--সরি দিদিভাই। আচ্ছা ভাগ্নের একটা নাম দিবি না?

মল্লিকা হেসে বলল--বেশ তো তুই একটা নাম দে।--তাহলে ওর নাম দিলাম সব্যসাচী।যার দুই হাত সমান চলে।ভবিষ্যতে ওর পায়ের কমজোরি দুই হাতেই পুষিয়ে দেবে।এটা তুই মিলিয়ে নিস।ডাকনামটা তুই দে।মল্লিকা বলল-- আমি তো ওকে জন্মের পর থেকেই সোনাই বলে ডাকি।---দুর কেমন যেন মেয়েলি নাম। ব্যাটা দেখতে পাক্কা সাহেবের মতো হয়েছে।তাই ওকে আমি সাহেব বলে ডাকব।

ছেলেকে নিয়ে মল্লিকার লড়াইটা বড় সহজ ছিল না।একমাসের ছেলেকে নিয়ে মল্লিকা প্রথম ব্যাঙ্গালোর গেল।ডাক্তার বাবু আশ্বাস দিয়ে বললেন--এখন আমরা প্রথম অপারেশনটা করব।কিন্তু এর ছমাস পর থেকে বয়স বাড়ার সংগে সংগে বেশ কয়েকবার অপারেশন করতে হবে।মল্লিকা ব্যাকুল হয়ে বলল--ডাক্তার বাবু ও আর পাঁচটা ছেলের মতো হাঁটতে খেলতে পারবে?

ডাক্তার বাবু বললেন--ছুটোছুটি করে হয়তো খেলতে পারবে না।কিন্তু দু থেকে আড়াই বছর বয়সে আশা করছি কারোর সাহায্য ছাড়াই হাঁটতে পারবে।তবে আমরা যে জুতো ব্যবহার করতে বলব সেটা রাতে ঘুমোনোর আগে পর্যন্ত পরে থাকতে হবে।সেই সময় পায়ের জন্য একটা মলম দেব ওটা লাগিয়ে দেবেন।ছমাস পর ওর জন্য জুতোর ব্যবস্থা করা হবে।

দেখতে দেখতে সাহেবের আড়াই বছর বয়স হয়ে গেল। এই নামটাই শেষপর্যন্ত সবার মুখে মুখে টিকে গেল। জন্মের পর থেকে এর মধ্যে তার পাঁচবার অপারেশন হয়ে গেছে।কিন্তু সাহেব এখনও ওয়াকার ছাড়া হাঁটতে পারে না।মল্লিকা ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ছে।রঞ্জন বহু কষ্টে চারদিনের ছুটি ম্যানেজ করে এসে বলল--দিদিভাই তুই এখনও হতাশ হচ্ছিস?সাহেবের তো অনেক ইমপ্রুভ হয়েছে।শোন ডাক্তার বাবু কিন্তু বারবার বলে দিয়েছেন এবার ওয়াকারটা সরিয়ে দে।আর বয়স্কা আয়া মাসীকে দিয়ে আর চলবে না।দরকারে বেশি টাকা দিয়ে একজন নার্স রাখতে হবে।তুই তো সারাদিন স্কুলে থাকিস।বাবা মার ও বয়স হচ্ছে।

মল্লিকা বলল--সে তো অনেক খরচের ব্যাপার ভাই।এমনিতেই ওর চিকিৎসাতে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।রঞ্জন বলল--দিদিভাই তুই আমি দুজনেই চাকরি করছি।টাকার জন্যে একদম চিন্তা করবি না।আমি বলছি সাহেব ওয়াকার ছাড়াই হাঁটতে পারবে।শুধু একটু ধৈর্য ধর।ডাক্তার বাবু তো একরকম মিরাকল ঘটিয়েছেন।উনি বলেছেন পাঁচ বছর বয়সে সাহেবের আর একটা শেষ অপারেশন হবে।তখন নিরানব্বই পার্সেন্ট পায়ের পাতা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।তখন নরম্যাল জুতো ব্যবহার করতে পারবে।
ক্রমশ--
ধারাবাহিক গল্প
লড়াই
তৃতীয় পর্ব
।ছবি ব্যানার্জী



তৃতীয় পর্ব

সাহেব বরাবর খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে।কিন্তু ওয়াকারটা সরিয়ে দেওয়ার পর সে কিছুতেই হাঁটতে চাইত না।প্রচন্ড কান্নাকাটি করত।হাতের কাছে জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দিত।কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যেই নতুন নার্সটি প্রায় অসাধ্য সাধন করল।সে ওয়াকার ছাড়াই ধীরে ধীরে হাঁটতে পারল। চারবছর বয়সে তাকে নামী একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করা হল।পাঁচ বছর বয়সে একটা অপারেশনের পর তাকে নরম্যাল জুতো ব্যবহার করতে দেওয়া হল।এরপর সাহেবের দিকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

যে বয়সে বাচ্চারা ছুটোছুটি করে খেলাধুলা করে সেই বয়সে সাহেব রঙ পেনসিল দিয়ে খাতায় ছবি আঁকায় মগ্ন থাকত।এই দীর্ঘ পাঁচ বছরের লড়াইটা মল্লিকার জীবনে খুব সহজসাধ্য ছিল না।তার ছেলে যে সত্যি সত্যিই একদিন কারো সাহায্য ছাড়াই হাঁটাচলা করতে পারবে এটা তার কাছে একরকম দুঃস্বপ্ন ছিল।তার বাবা মা এবং ভাইয়ের সহযোগিতা ছাড়া এটা তার একার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব ছিল না।সে যতোবার হতাশায় ভেঙে পড়েছে ততো বার ভাই ঢাল হয়ে তাকে সাহস যুগিয়েছে।মা বাবা সব সময় ভরসা যুগিয়েছে।

সাহেব ছোটো বেলায় আর পাঁচটা বন্ধুদের মতো বাবা কোথায়,কেন আমার কাছে আসে না বলে বায়না ধরত।

মল্লিকা তাকে আদর করে বোঝাত যে তার বাবা বিদেশে চাকরি করে।সময় হলে ঠিক ফিরে আসবে।এই মিথ্যে কথা বলে ছেলেকে সান্ত্বনা দিতে মল্লিকার কষ্ট হলেও ছেলের মন খারাপের কথা ভেবে ওর ভবিষ্যতের কথা ভেবে বলতেই হত।বাবা বারবার করে বলত --মা সাহেব বড় হচ্ছে ওকে সত্যিটা কেন জানাচ্ছিস না?ওর কাছ থেকে কতদিন এটা গোপন করতে পারবি?-মল্লিকা বলত--বাবা থাক না।এখন সবটা জানলে ওর ক্ষতি হয়ে যাবে।হয়ত ডিপ্রেশনে চলে যাবে।এমনিতেই স্কুল ছাড়া ওর কোনো বন্ধু বান্ধব নেই।সময় হলে ও সবটাই জানবে।

সাহেব যতো বড় হচ্ছে ততো তার বাবার চেহারার আদল তার মধ্যে ফুটে উঠছে।অনিরুদ্ধ তার কাছে না থেকেও ছেলের মধ্যে তার উপস্থিতি অহরহ তাকে কেন যে মনে পড়িয়ে দেয়।তার আঁকার হাত দিনদিন পরিণত হচ্ছে।এটাও ওর বাবার পূর্বপুরুষের জিন।মা বলে মাতৃমুখি সন্তান সুখি হয়। কিন্তু ছেলে তো দিনদিন তার বাবার দ্বিতীয় ফটোকপি।তার ছেলে কি ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সুখি হবে? নাকি এত লড়াইয়ের পরে তার বাবার মতো হৃদয়হীন নিষ্ঠুর চরিত্রের হবে?অনিরুদ্ধর সংগে ডিভোর্স হবার পর ও সে প্রতিদিন সিঁথিতে সিঁদুর পরে।সিঁদুরটা তার রক্ষাকবচ।সমাজে কুমারি মহিলা,বিধবা মহিলার যে সম্মান আছে বিবাহ বিচ্ছিনা মহিলার সেই সম্মানটুকুও নেই।বেশিরভাগ পুরুষ বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলাদের বেওয়ারিশ ভাবে।তাদের অবলীলায় কুপ্রস্তাব দেওয়া যায়। এই লোভ লালসার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে তার সিঁদুরে পরা।

ক্লাস এইটে পড়ার সময় সাহেব আবার ও একদিন মাকে বলল--আচ্ছা মা আমার বন্ধুদের অনেকের বাবা ই তো বিদেশে না হলেও বাইরে চাকরি করে।তারা তো মাঝে মাঝেই বাড়ি আসে,ফোনে যোগাযোগ করে।আমার বাবা তো একবার ও এলো না।আমি তো বাবাকে চোখে দেখা তো দুরের কথা একবার ফোন ও তো করে না।মল্লিকা বলল--দুর বোকা ছেলে,তোর বাবা তো আমাকে প্রায় ফোন করে।তোর কথা জানতে চায়।আসলে তোর বাবা আর মাত্র দুবছর পর নিজে এসে তোকে সারপ্রাইজ দিতে চায়।তোকে চমকে দেওয়ার জন্যেই সে তখনই তোকে দেখবে,কতো মজার মজার গল্প করবে।আর তুই কি করবি বল তো?--কি করব মা?--- তুই মাধ্যমিকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে বাবাকে চমকে দিবি।

মল্লিকার মা মেয়েকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলল--তুই কি পাগলামি করছিস মলি?কেন ছেলেটাকে মিথ্যে স্তোক দিচ্ছিস? এরপর সামলাতে পারবি তো?মল্লিকা বলল--মা সাহেব এখনও ছোটো।এখন সবকিছু জানলে ও নিজেকে সামলাতে পারবে না।আর আমার নিজেকে সামলানো?মা অনিরুদ্ধ কি আজও আমাকে ভুলতে দিয়েছে? তবু তো ঘরে বাইরে সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই করে বেঁচে আছি।--এত কিছুর পরও?--মা তাকে ভুলব কি করে?সাহেব তো অনিরুদ্ধরই ছায়া।প্রতি মুহুর্তেই সে তার অস্তিত্ব নিয়ে আমার চোখের সামনে তিলতিল করে বড় হচ্ছে।মা সাহেবের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমার খুব দুঃশ্চিন্তা হয়। ওকে ঠিক মতো মানুষ করতে পারব তো?সবটা জানলে ছেলে আমাকে ভুল বুঝবে না তো? তুমি ভেবো না মা খুব বেশিদিন সাহেবের কাছে আমি তার বাবার কথা গোপন রাখতে পারব না।

মা বলল--তুই

বরং এত ভাবিস না।তুই অন্যায় তো কিছু করছিস না।ছেলের কথা ভেবেই তো তাকে মিথ্যে বলেছিস।তবে সবটা জানার পর দাদুভাইয়ের কি প্রতিক্রিয়া হবে এটা ভেবে তোর বাবা আমি ও খুব চিন্তায় থাকি।তবে সাহেব বুদ্ধিমান বিবেচক ছেলে।ও নিশ্চয়ই সব বুঝবে।আমরা আশীর্বাদ করছি তোর এই সাধনা বিফলে যাবে না মা।
ধারাবাহিক গল্প
লড়াই
চতুর্থ পর্ব
ছবি ব্যানার্জী

সাহেব বেশ খুশি মনেই ব্যাপারটা মেনে নিয়ে লেখাপড়ায় দ্বিগুণ মনোনিবেশ করল।মল্লিকা দুটো বছরের জন্য সাময়িকভাবে নিশ্চিন্ত হল।ছেলেকে ক্রমাগত মিথ্যে বলতে বলতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল।আবার মা বাবার কথাটাও তার মনে তোলপাড় করছিল।দুবছর পর ছেলেকে তো সবটা বলতেই হবে।আবারও কি ছেলের সামনে সে ঝড়ের মুখে পড়বে?

দুটো বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল।সাহেব মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করল।শেষ পরীক্ষা দেওয়ার পর সাহেব মাকে বলল--মা আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা তো শেষ হল।এবার বলো বাবা কবে আসছে?মল্লিকা ছেলের গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে একবার ভাবল সবটা এবার বুঝিয়ে বলার সময় এসেছে।কিভাবে বললে ছেলে তাকে ভুল বুঝবে না এটা নিয়ে সে অনেকবার ভেবেছে।কিন্তু ছেলের শাণিত দৃষ্টির সামনে সবটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।

মল্লিকা ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বলল--তোর সংগে আমার কি কথা হয়েছিল?তোর রেজাল্ট না বেরোলে কিভাবে বাবাকে চমকে দিবি?রেজাল্ট তো বেরোতে দে।এখন তুই মনের আনন্দে ছবি আঁক কিংবা তুই চাইলে আমরা সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যেতেই পারি।মল্লিকার বাবা মাও বলল--সেই ভালো।দাদুভাই চল আমরা সবাই মিলে পুরী বেড়াতে যাই।

সাহেব মায়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে তাকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল--আর কতো মিথ্যে বলবে মা? তোমার সব মিথ্যে আজ আমার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে।আগে আমি বন্ধুদের কথা বিশ্বাস না করে মারপিট পর্যন্ত করেছি। আচ্ছা আজ একটা সত্যি কথা বলোতো?আদৌ আমার বাবা বলে কেউ আছে?আমি তোমার বিবাহিত সম্পর্কের সন্তান না কি তোমার যৌবনের উচ্ছৃঙ্খলতার অবৈধ ফসল?তোমাকে মা বলে ডাকতে আজ আমার ঘেন্না করছে।

মল্লিকার বাবা মেয়েকে বলল--আমি এটা আশংকা করে আগেই দাদুভাইকে সবটা জানাতে বলেছিলাম।শোন দাদুভাই তুই সবটা না জেনে মাকে অনেক অপমান করলি।তোর পাঁচ বছর বয়সের কথা কিছু মনে নেই?ওই বয়সের স্মৃতি ধুসর হলেও কিছু তো মনে থাকে। তবু না থাকলে শোন।তুই পায়ের ডিফেক্ট নিয়ে জন্মেছিলি। সেই অপরাধে তোর বাবা,দাদু,ঠাকুমা তোর মাকে তাদের বাড়িতে স্থান দেয়নি। তোকে অনাথ আশ্রমে দিতে চেয়েছিল।তোর বাবা মাকে ডিভোর্স দিয়েছে।আজ যে তুই স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিস,লেখাপড়া করছিস এর পিছনে তোর মা বহু পরিশ্রম বহু লড়াই করেছে। ছিঃ দাদুভাই ছিঃ।তোর কাছে কি তোর মায়ের এটাই প্রাপ্য ছিল?

সাহেব খানিকটা অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল--তাহলে ডিভোর্স হবার পর মা সিঁদুর পরে কেন?দাদু বলল--সিঁদুর পরাতে আমাদের সবার আপত্তি ছিল।কিন্তু তোর মা বলে সিঁদুরটা তার কাছে এই সমাজের জন্য রক্ষাকবচ।একটু অপেক্ষা কর আমি তোর মায়ের বিয়ের এলবাম

আর ডিভোর্সের কাগজপত্র দেখাচ্ছি।

মল্লিকা বলল--তুই প্রমাণ চেয়েছিলি তো?বেশ সব প্রমাণ দেখার পর তুই ইচ্ছা করলে তোর বাবা,দাদু ঠাকুমার সংগে যোগাযোগ করে ফিরে যেতে পারিস।তোর বাবার শেষ কথা ছিল জীবনে যেন তার সংগে যোগাযোগের চেষ্টা না করি।তার বিকলাঙ্গ ছেলের জন্য আপত্তি ছিল।কিন্তু তুই তো এখন বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী নোস। তুই কি তোর বাবার নাম পরিচয় জানতে চাস?সে এই শহরেই ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসরি করে। সাহেব কিছু না বলে ডিভোর্স পেপারটায় চোখ বুলিয়ে এলবামটা নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।দিদার হাজার অনুরোধেও তখন তো কিছু খেলই না,রাতেও খিদে নেই বলে কিছু খেল না।মল্লিকা বলল--থাক মা ওকে ওর মতো থাকতে দাও।আর ও বাবার কাছে ফিরে যেতে চাইলে আটকিও না।মা বলল--আমরা তোকে বারবার করে নিষেধ করেছিলাম ডিভোর্সের পর সিঁদুর পরিস না। তোর সিঁথিতে সিঁদুর না দেখলে ছেলেটার বাবা সন্বন্ধে কোনো কৌতুহলই থাকত না।তোকে এত প্রশ্নের মুখে পড়তে হত না।দাদুভাই জানত তার জন্মের পরই বাবা মারা গেছে।

মল্লিকা চিৎকার করে বলল---মা সমাজে হাজারটা মেয়ের ডিভোর্স হয়।শুধু সিঁদুর পরার জন্যে মায়ের চরিত্র পাল্টে যায় না।তাই বলে একজন জীবিত মানুষকে মৃত বলে ঘোষণা করা অন্যায়ই শুধু নয় সেটা অমানবিক।তোমরা খেয়ে নাও।আমি কিছু খাব না।--আমি সব বুঝি মা।তুই তাকে আজ ও ভুলতে পারিস নি।

সাহেব ঘরে এসে অনুশোচনা, আত্মগ্লানিতে ক্ষত বিক্ষত হচ্ছিল।আড়ালে বন্ধুদের তাকে আর মাকে নিয়ে তির্যক কথা,ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শুনে তার মাথা গরম হয়ে গেছিল।সত্যিই কি সে বিকলাঙ্গ ছিল?তার একটু একটু মনে পড়ে সে ছোটবেলায় একটু অন্য ধরনের জুতো পড়ত।ছুটোছুটি করে খেলতে পারত না।অবশ্য খেলাধুলোর থেকে ছবি আঁকতে সে বেশি ভালোবাসতো। যে মা শুধুমাত্র তার জন্যে গোটা জীবনটা স্যাক্রিফাইস করল তাকে কেন এত কটু কথা বলল।মা হয়তো ঠিক সময়ে তাকে সবটা বলত।কেন সে অপেক্ষা করল না?

সাহেব এলবাম খুলে তন্ময় হয়ে মায়ের বিয়ের ছবি,হানিমুনের ছবি ছাড়াও বিভিন্ন সময়ের ছবি দেখল। তার মধ্যে একটা ছবি বেছে নিয়ে বাবার ছবিটা কাঁচি দিয়ে কেটে আলাদা করল।বাবার ছবিটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করার আগে কি মনে করে ছবিটা টেবিলের ড্রয়ারে অবহেলায় ফেলে রাখল।

মল্লিকাও তার ঘরে বিনিদ্র রাত কাটালো।নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল সে সাহেবকে অন্তত নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পেরেছে।এরপর সে বাবার কাছে যেতে চাইলে যাবে।হয়তো সকালেই ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।এমন সময় উসকো খুশকো চেহারা নিয়ে সাহেব ঘরে ঢুকলো।একটা রাতেই ছেলের বিদ্ধস্ত চেহারা দেখে মল্লিকার চোখে জল চলে এল।গভীর অভিমানে আবার সে পাশ ফিরে শুয়ে থাকল।

সাহেব মায়ের পায়ের কাছে বসে বলল--মা তুমি আমার সংগে কথা বলবে না?মল্লিকা বলল--সাহেব তুই আমাকে মা বলে আর ডাকিস না।তুই বরং দরকারে আমাকে ম্যাডাম বলে ডাকতে পারিস।আর হয়তো কোনো সন্বোধনে তোর ডাকার দরকার হবে না।তুই নিশ্চয়ই তোর বাবার নাম ঠিকানা জানতে এসেছিস?সাহেব বলল--মা তোমাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি,অনেক অপমান করেছি।বিশ্বাস করো আমি নিজেও অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছি।সারারাত ঘুমাতে পারিনি। তুমি আমাকে শাস্তি দিয়ে ক্ষমা করে দিয়ে একটা সুযোগ দেবে না মা?আমি জীবনেও ঐ মানুষটার নাম পরিচয় জানতে চাইব না।তুমি আগে যদি সবটা বলতে।মল্লিকা বলল--ভেবেছিলাম তুই একটু পরিণত হলে সবটা বলব।বয়সে তুই এখনও অপরিণত।তোকে সবটা বলার প্রস্তুতি নিয়েও তোর উগ্রচন্ডা রূপ দেখে বলতে পারিনি।তোর ভাষা একজন পোড় খাওয়া পরিণত বয়সের যুবককেও হার মানায়।এখন মনে হচ্ছে আমার সব লড়াই ব্যর্থ।

সাহেব ব্যাকুল হয়ে বলল--মা আমি অন্যায় করেছি।আমি তিনদিন কিছু না খেয়ে এই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করব।তাহলে তো ক্ষমা করবে?

মল্লিকা বলল--শরীরকে কষ্ট দিয়ে কোনো অন্যায় বা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হয়না।--তাহলে কি করলে তুমি ক্ষমা করবে?মল্লিকা বলল--তোর জন্মের পর আমি তোকে বলেছিলাম--সোনাই আমার সামনে একটা লড়াই আসতে চলেছে।এই লড়াইয়ে তুই আমার পাশে থেকে আমাকে জিতিয়ে দিবি তো?আজ আমি আবারও বলছি তুই লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হ।সাহেব বলল---মা কথা দিচ্ছি আমি তোমার সব আশা সব স্বপ্ন পূর্ণ করব।আজ থেকে এটাই আমার সাধনা হবে।মল্লিকা ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বলল--ঠিক আছে এবার মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নে।আর একটা কথা তোর বাবার পরিচয় তো জানিস।তার নামটা জানতে চাস না কেন?বাবাকে চোখে না দেখেও তার প্রতি তোর আকর্ষণ আর টানটা তো আমি জানি।তুই কি আমার কথা ভেবে জানতে চাইছিস না?তার সংগে আমার ডিভোর্স হয়েছে।তোর সংগে তো হয় নি।

সাহেব বলল--মা আমি আর জীবনে বাবা শব্দটাই উচ্চারণ করতে পারব না।যে বাবা শুধু প্রতিবন্ধকতার কারণে সন্তানকে অনাথ আশ্রমে দেওয়ার কথা বলে সে কি বাবা নামের যোগ্য? আচ্ছা মা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?--বল কি জানতে চাস?--তুমি কি ডিভোর্সের পর ও তোমার স্বামীর মঙ্গলকামনায় সিঁদুর পরো?

মল্লিকা বলল--তুই এটা বুঝবি না।তুই এখনও অনেক ছোট। আমি সবার মঙ্গল কামনা করি।সবার আগে সন্তানের মঙ্গল কামনা করি।তারপর প্রিয়জনদের মঙ্গল কামনা করি।তুই না চাইলে আমি আর সিঁদুর পরব না।সাহেব বলল--সেই ভালো মা।তোমার তো একটা নিজস্ব পরিচয় আছে।আমি শুধু তোমার সন্তান।এটাই একমাত্র আমার পরিচয়।

চলবে--

ধারাবাহিক গল্প
লড়াই
পঞ্চম ও অন্তিম পর্ব
ছবি ব্যানার্জী

সাহেবের সংগে মল্লিকার এখন সম্পর্ক মধুর।দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি শেষ হয়েছে।মল্লিকার বাবা মার দুঃশ্চিন্তার অবসান হয়েছে।এর মধ্যে রঞ্জনের এক সহকর্মীনির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।তারা সস্ত্রীক ব্যাঙ্গালোরে থাকে।সাহেবের আঁকার হাত পরিণত হয়েছে।

সাহেবের হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পর মল্লিকা বলল----সাহেব ছোটবেলা থেকে তুই আঁকতে ভালোবাসিস।তুই কি আর্ট কলেজে ভর্তি হবার কথা ভাবছিস?সাহেব বলল--মা ছবি আঁকা আমার নেশা।ওটাকে ভবিষ্যতে পেশা হিসাবে নেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।আমি জয়েন্টে ডাক্তারি,ইঞ্জিনিয়ারিং দুটো পরীক্ষাতেই বসব।আমার প্রথম পছন্দ ডাক্তারি পড়া।

কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বছর।সাহেব এখন একজন সফল ইউরোলজিস্ট।তার মামা রঞ্জন আর মামি এসে ভাগ্নেকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল--জানিস সাহেব তোর দুটো নামই কিন্তু আমার দেওয়া।আমি দিদিভাইকে বলেছিলাম--তোর পায়ের ত্রুটি একদিন দুটো হাত পুষিয়ে দেবে।এখন তো দেখছি তোর দুই হাত আর পা দুটোই শক্তিশালী।আমার সব্যসাচী নাম রাখাটা সার্থক হয়েছে।এবার বল ব্যাটা তুই আমার কাছে কি গিফ্ট চাস?
সাহেব বলল--মামু তুমি আর মা আমাকে তো জীবনের সেরা গিফ্ট দিয়ে দিয়েছো।তোমাদের পরিশ্রম,ধৈর্য আর ভালোবাসা দিয়ে আমাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছো।আজ আমি যা হয়েছি তার সব কৃতিত্ব মায়ের, তোমার আর দাদু দিদার। আর যে মানুষটা তার গোটা জীবনটা শুধুমাত্র আমার জন্য স্যাক্রিফাইস করেছে সে আমার মা।

বেশ কিছু অপারেশন সাফল্যের সংগে করে ডাঃ সব্যসাচী সেনের বেশ নামডাক হয়েছে। সে এতটাই ব্যস্ত ডাক্তার যে পনেরো কুড়িদিনের আগে তার এপয়েনমেন্ট পাওয়া যায় না।সাহেবের সাফল্য দেখে এক বছরের আগে পিছে তার দাদু দিদা মারা গিয়েছিলেন।

গভীর রাত পর্যন্ত সাহেবের ঘরে আলো জ্বলতে দেখে মল্লিকা দরজা নক করে বলল--এত রাত পর্যন্ত কি করছিস রে? রাত জেগে আবার আঁকতে বসেছিস?সাহেব বেরিয়ে এসে বলল--মা একটা ক্রিটিক্যাল অপারেশনের জন্য স্টাডি করছিলাম।আমার কাজ হয়ে গেছে।তুমি ভিতরে আসবে?মল্লিকা বলল--না আর যাবো না।তোর বড্ড খাটুনি যাচ্ছে।তার ওপর রাত জাগলে শরীর খারাপ হবে।নে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়।

সাহেব ঘরে মনে মনে বলল----মা তুমি ঠিকই ধরেছো।বহু বছর আগে যে ছবিটা অবহেলায় একদিন ড্রয়ারের এক কোনে ফেলে রেখেছিলাম, সেই ছবি দেখে তোমার এক্স স্বামীর বর্তমান বয়সের ছবিটা নিঁখুতভাবে এঁকেছি।কে জানতো তার ছবি আঁকাটা এমন কাজে দেবে।

কয়েকদিন আগে এক বয়স্ক ভদ্রলোক স্ত্রীকে নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন কিডনির সমস্যা নিয়ে।উনি তার আগে দুজন নামকরা নেফ্রোলজিস্টকে দেখিয়েছিলেন।তারা বিভিন্ন পরীক্ষার পর তার কাছে রেফার করেছিলেন।ভদ্রলোককে তার খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছিল।ভদ্রলোক ও খানিকটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সাহেব সব রিপোর্ট দেখে বলল--দেখুন আপনার একটা কিডনিতে বেশ বড় আকারের সিস্ট আছে।সিস্ট টা বাদ দিলেও ভালো কিডনিটা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থেকে যাবে।তাই আমার ওপিনিয়ন হল একটা কিডনি পুরো বাদ দেওয়া।এটা আপনি ব্যাঙ্গালোর গিয়ে করতে পারেন।ইচ্ছা করলে আপনি আদারস ওপিনিয়ন নিতে পারেন।ভদ্রলোক বললেন--ডক্টর আমি আপনার কাছ

Address

Ranaghat Dhantala, Nadia
Ranaghat
741201

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Dreamful Life posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category