28/01/2026
ফাঁসির আগে জেলে কানাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন দাদা আশুতোষ। বলেছিলেন, ‘তোর চশমাটা দে। একটা কিছু তো আমার কাছে রাখি।’ কানাইলালের জবাব, ‘দাদা, চশমাটা আমি এখন দিতে পারব না। চোখে হাইপাওয়ার, ফাঁসির মঞ্চে যদি হোঁচট খাই, এরা ভাববে বাঙালির ছেলে আমি মৃত্যুর আগে ভয় পাচ্ছি। চশমাটা আমার মৃত্যুর পরে নিও।’
কানাইলালের গলায় দড়ি পরিয়ে দেওয়ার পর তিনি একজন পুলিশকে ডেকে বলেছিলেন, মৃত্যুর পর চশমাটা আমার বড়দাদাকে দিয়ে দিও। সেই চশমাই কানাইলাল বিদ্যামন্দিরে রাখা রয়েছে।
নরেন গোঁসাইকে খুন করেও নিরুত্তাপ ছিলেন কানাই | মুখে হাসি লেগেই থাকত সর্বদা | বিচারপর্বে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল -
- Why did you shoot the last bullet on the head of Naren Gosai when you know that he is already dead?
- So far all our attempts had been foiled and the enemy did narrowly escape. I wanted to be sure of the result. I am simply disgusted with attempts, attempts and attempts!
প্রিয় ছাত্রের ফাঁসির পর স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত থাকার দরুণ মাস্টারমশাই চারুচন্দ্র রায় নিজেও কিছুদিন আলিপুর জেলে বন্দি ছিলেন | আলিপুর জেলে যিনি কানাইলালের ওয়ার্ডার ছিলেন তিনিই কানাইয়ের ফাঁসির কার্য সম্পাদকের ভূমিকাও নিয়েছিলেন | প্রিয় ছাত্র কানাই সম্পর্কে তিনি চারুচন্দ্র রায়কে বলেছিলেন, "I am the sinner who has executed Kanailal. If you have a hundred men like him, your aim will be fulfilled."
বিচারে ফাঁসির আদেশ হয়েছিল কানাইয়ের | মৃত্যুদন্ড রদের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করবেন কিনা জানতে চাওয়া হলে কানাই বলেছিলেন, "There shall be no Appeal !" আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই কথা শুনে বলেছিলেন - কানাই শিখিয়ে গেল হে | Shall আর Will ব্যবহারের পার্থক্য কিভাবে কোথায় করতে হয় কানাই বাঙালি জাতিকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে গেল |
ফাঁসির আদেশ পাওয়ার পরে আলিপুর জেলে পাশাপাশি সেলে ফাঁসির প্রতীক্ষায় দিন গুনছে কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু | সত্যেন ব্রাহ্ম | সত্যেনের ইচ্ছে মৃত্যুর আগে একবার সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের কর্ণধার পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে তাঁর কাছ থেকে আশীর্বাদ চাইবেন | জেল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিল | পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী জেলে ঢুকে সত্যেনকে আশীর্বাদ করে গেলেন | কানাইয়ের এক পরিচিত শিবনাথ শাস্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি কানাইকে দেখেছেন কিনা | শিবনাথ শাস্ত্রী বলেছিলেন - " কানাইকে দেখলাম ,সে পায়চারি করছে - যেন পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহ ! বহু যুগ তপস্যা করলে তবে যদি কেউ তাকে আশীর্বাদ করার যোগ্যতা লাভ করতে পারে | "
মুখে সর্বদা হাসি লেগেই থাকত | ফাঁসির আগের দিন ওয়ার্ডার তাঁকে বিদ্রুপের সুরে একবার বলেছিলেন, "You are smiling now, but tomorrow morning all the smiles will disappear from your lips."
সেদিন কানাই শুধুই হেসেছিলেন |
১৯০৮ সালের ১০ই নভেম্বর | ভোর পাঁচটা | আলিপুর জেলে সেদিন প্রায় উপস্থিত পুলিশ কমিশনার মিস্টার হ্যালিডে, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার, আলিপুরের ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার বোমপাস | উপস্থিত ৩০০ সশস্ত্র উর্দিধারী | জেলের ঘড়িতে তখন সকাল ছয়টা | কিছু কারারক্ষী কানাইয়ের জেলের দরজা খুলে তাঁকে নিয়ে আসলেন | মুখে সেদিনও হাসি লেগেই আছে | চোখে উজ্জ্বল দ্যুতি | হাত পিছনে বাঁধা | কানাইকে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগোলেন পুলিশ কমিশনার মিস্টার হ্যালিডে, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার, আলিপুরের ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার বোমপাস |
ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগোতেই কানাইয়ের চোখে পড়ল সেই ওয়ার্ডার | কানাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন ওয়ার্ডারকে লক্ষ্য করে - "How do you find me now?"
সেদিন আর ওয়ার্ডার কোন জবাব দিতে পারেননি |
জেলকর্মীদের বয়ান অনুযায়ী, বুলেটবিদ্ধ হওয়ার পর নরেন গোঁসাই নাকি বলে উঠেছিলেন, ‘তিন বাপ, তিন বাপ, তিন বাপ।’ সম্ভবত, শরীর ফুঁড়ে তিনটি বুলেট ঢুকে যাওয়ার কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি। কানাইলালের রিভলভারে তখনও দুটি গুলি অবশিষ্ট ছিল। সেই দুটিও নরেনের শরীর লক্ষ্য করে চালিয়ে দেন কানাইলাল। তারপরই পুলিশকে বলেন, ‘অ্যারেস্ট মি।’ পরে তাঁকে বলা হয়েছিল, ক্ষুদিরামের সঙ্গী প্রফুল্ল চাকি তো নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছিলেন, তিনি কেন সেই পথে হাঁটলেন না? কানাইলাল জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি পলিটিক্যাল মার্ডার সফল করতে চেয়েছিলাম। এত ব্যর্থ হচ্ছিলাম। একটা সফলতা রাখতে হবে। আমি জানি আমার ফাঁসি হবে। কিন্তু সেটাই আমি চাই।“
মৃত্যুর সময়ও কানাইলালের তেজ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ আধিকারিকেরা। পুর্ণচন্দ্র দে, সাগরকালী ঘোষ, মতিলাল রায়, আশুতোষ দত্তরা তাঁর মৃতদেহ নিতে যাওয়ার পর তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিল, তোমাদের দেশে এরকম ছেলে ক’টা আছে!
কানাইলাল বলে গিয়েছিলেন, আমার মৃত্যুর পর দেহ নিয়ে শোক নয়, শোভাযাত্রা কোরো। যাতে সকলে অনুপ্রাণিত হয়। হয়েওছিল তাই। ১০ নভেম্বর, ১৯০৮। সে এক অবিস্মরণীয় দিন। আলিপুর জেল থেকে কানাইলালের মরদেহ বেরতেই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে রাজপথ কার্যত অবরুদ্ধ। জনতার বাঁধভাঙা আবেগ। ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশান পর্যন্ত শেষযাত্রায় সামিল অসংখ্য মানুষ। তারা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে এক বারের জন্য হলেও শববাহী খাটটি ছুঁতে চায়। সর্বত্র ‘জয় কানাই’ ধ্বনিতে আন্দোলিত। কেওড়াতলা শ্মশানে দাহকার্যের পর কানাইলালের ‘চিতাভস্ম’ কেনার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়। আধ ছটাক চিতাভস্মের জন্য কোনও কোনও অত্যুৎসাহী পাঁচ টাকা পর্যন্ত দিয়েছিলেন।
সেই ভিড় ব্রিটিশ শাসকদের এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, কানাইলালের মৃত্যুর পর নিয়ম করে দেওয়া হয়, কোনও বিপ্লবীর মরদেহ তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে না। শেষকৃত্য হবে পুলিশের প্রহরায়।
আজকের বাঙালি কানাইলাল দত্তকে ভুলে গেছে......
©️ তথ্যসূত্র:
তথ্য - মৃত্যুজয়ী কানাইলাল - পূর্ণচন্দ্র দে
কানাইলাল - মতিলাল রায়
ইতিহাসবিদ বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
আইপিএস সুপ্রতিম সরকার বাংলার বিপ্লবীদের নিয়ে এই তথ্যসমৃদ্ধ সিরিজটি লিখেছেন কলকাতা পুলিশের সংগ্রহশালায় মজুত নথি থেকে, যত্নবান গবেষণা করে।কাহিনীগুলি থেকে বোঝা যায়, ভারতবাসী যাতে নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হতে পারে তার জন্য কী অপরিসীম ত্যাগস্বীকার করেছিলেন তরুণ বিপ্লবীরা।
আমাদের মনে হয়েছিল, এই মহাপ্রাণ বিপ্লবীদের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানানোর একটি উপায় হল বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁদের ত্যাগের কাহিনী পৌঁছে দেওয়া।
পড়তেই হবে আইপিএস সুপ্রতিম সরকার মহাশয়ের "স্বাধীনতা যুদ্ধে অচেনা লালবাজার" | এই বই সংগ্রহে রাখার মত বই |