09/11/2025
নমস্কার, Vedic planet এর দর্শকবৃন্দ! হিন্দু পুরাণের গভীরে লুকিয়ে আছে এমনই এক অলৌকিক উপাখ্যান, যেখানে এক ঋষির ক্রোধে স্বয়ং অগ্নিদেবকে 'সর্বগ্রাসী' হতে হয়েছিল। কে ছিলেন এই ঋষি? তাঁর স্ত্রীর সাথে কী ঘটেছিল? এবং কীভাবে জন্ম নিলেন তেজোদীপ্ত মহর্ষি চ্যবন? আজ আমরা জানব সেই রহস্যময় কাহিনী—মহর্ষি ভৃগু ও তাঁর পত্নী পুলোমার জীবন বৃত্তান্ত।
মহর্ষি ভৃগুর পরিচয়
ভৃগু ছিলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র, সপ্তর্ষিদের অন্যতম এবং এক মহাতেজা ঋষি। তিনি মানবজাতিকে ধনুর্বেদ সহ বহু জ্ঞান দান করেন। তাঁর রচিত ভৃগু সংহিতা জ্যোতিষশাস্ত্রের ভিত্তি। সৃষ্টির কাজে তিনি ছিলেন ব্রহ্মার অন্যতম প্রধান সহায়ক। | চরিত্র পরিচিতি ও মহত্ত্ব স্থাপন। | পুলোমার পরিচয় ও বিবাহ
মহর্ষি ভৃগু বিবাহ করেন পরমা রূপবতী পুলোমা-কে। পুলোমার জন্ম ও বিবাহের কাহিনীতে লুকিয়ে আছে এক জটিলতা। একই নামে এক রাক্ষস ছিল, যে মনে মনে পুলোমাকে স্ত্রী রূপে বরণ করেছিল। পুলোমার পিতা প্রথমে এই রাক্ষসের সাথেই তাঁর মেয়ের বিবাহ স্থির করেন। কিন্তু ভাগ্যক্রমে, বা অন্য কোনো কারণে, তিনি পরে শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান সহকারে কন্যাকে মহাতেজা ঋষি ভৃগুর হাতে সমর্পণ করেন। এই বিধিসম্মত বিবাহে রাক্ষসের বুকে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আগুন।
সময় যায়, মহর্ষি-পত্নী পুলোমা তখন গর্ভবতী। একদিন ভৃগু আশ্রমের রক্ষক অগ্নি দেবের কাছে স্ত্রীকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব দিয়ে স্নানে যান। সেই সুযোগে, প্রতিহিংসাপরায়ণ রাক্ষস পুলোমা আশ্রমে প্রবেশ করে। সে অগ্নিদেবের সামনে গিয়ে এক মারাত্মক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: "হে অগ্নি! তুমি সবকিছুর সাক্ষী। এই নারী আমাকে মনে মনে দেওয়া হয়েছিল। তুমিই বলো, ধর্মমতে ইনি কার স্ত্রী?" অগ্নি দেব পড়লেন মহা উভয়-সংকটে। মিথ্যা বললে পাপ, আর সত্য বললে ভৃগুর ক্রোধ। কিন্তু ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি ধীর কন্ঠে উত্তর দেন: "যদিও রাক্ষস, তুমি প্রথমে এঁকে চেয়েছিলে। কিন্তু মন্ত্র, আচার আর পিতা কর্তৃক সমর্পণ – এই সমস্ত বিধি মেনে ইনি কেবলই মহর্ষি ভৃগুর ধর্মপত্নী।" | অগ্নিদেবের কথায় রাক্ষসটির ক্রোধ শতগুণ বেড়ে গেল। সে নিজের ভয়ঙ্কর রূপ ধরে গর্ভবতী পুলোমাকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে পালাতে শুরু করল। এই হঠাৎ টানে এবং আতঙ্কে পুলোমার গর্ভস্থ শিশুটি তৎক্ষণাৎ ভূমিষ্ঠ হয়ে গেল। সে তো সামান্য শিশু নয়, সে ছিল মহর্ষি ভৃগুর তেজস্বী সন্তান! গর্ভ থেকে 'চ্যূত' (পড়ে যাওয়া) হওয়ার কারণে শিশুটির নাম হলো চ্যবন। সেই সদ্যোজাত চ্যবনের তেজ ছিল হাজার সূর্যের সমান। রাক্ষস পুলোমা সেই তেজ সহ্য করতে পারল না। চোখের পলকে সে পুড়ে ছাই হয়ে গেল! পুলোমা তখন নবজাতক পুত্রকে কোলে নিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আশ্রমে ফিরলেন।
মহর্ষি ভৃগু ফিরে এসে সব শুনে ক্রোধে অগ্নিশর্মা। তিনি ভাবলেন, অগ্নি দেব রাক্ষসকে সত্য বলে সাহায্য না করলে এই ঘটনা ঘটত না। রাক্ষসের চেয়েও অগ্নিদেবই তাঁর স্ত্রীর কষ্টের কারণ! ক্রোধে অন্ধ হয়ে ভৃগু হাতে জল নিয়ে অগ্নি দেবকে দিলেন এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ: "হে অগ্নি! যেহেতু তুমি আমার স্ত্রীর পরিচয় প্রকাশ করেছ, তাই আজ থেকে তুমি পবিত্র-অপবিত্র সকল বস্তুকে ভক্ষণ করবে। তুমি সর্বগ্রাসী (সর্বভুক্) হও এবং তোমার পবিত্রতা নষ্ট হোক!"
অভিশাপে অপমানিত এবং পবিত্রতা হারানোর আশঙ্কায় অগ্নিদেব প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি যজ্ঞের কাজ ছেড়ে অজ্ঞাতবাসে চলে গেলেন। পৃথিবীতে সব যজ্ঞের আগুন নিভে গেল, দেবতারা আহুতি থেকে বঞ্চিত হলেন। সমস্ত সৃষ্টির কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। দেবতারা তখন গেলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা অগ্নিদেবকে শান্ত করে বললেন: "তুমি পবিত্র! ভৃগুর অভিশাপের ফল প্রশমিত হবে। তোমার গুহ্য শিখা (শরীরের নিম্ন অংশ) সর্বভুক হবে, কিন্তু মুখে যে আহুতি দেওয়া হবে, তা সর্বদা পবিত্র থাকবে এবং দেবতারা তা গ্রহণ করবেন। তোমার পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রইল।" এইভাবেই মহর্ষি ভৃগুর অভিশাপের মধ্যেও অগ্নিদেবকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ স্থান ফিরে পেতে হলো। | অভিশাপের ভয়াবহ ফল এবং ব্রহ্মার প্রজ্ঞাপূর্ণ সমাধান। |
এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে, সত্য সবসময় জয়ী হয় (যেমন চ্যবনের তেজে রাক্ষস ধ্বংস হলো), কিন্তু ক্রোধ বা রাগের বশে দেওয়া অভিশাপ (যেমন ভৃগুর অভিশাপ) অনেক সময় সমাজে বিপর্যয় ডেকে আনে। চ্যবন মুনি পরে মহাঋষি হয়েছিলেন এবং তাঁর বংশধরগণও যুগে যুগে বিখ্যাত হয়েছেন। আর মহর্ষি ভৃগু? তিনি কেবল এই ঘটনার জন্যই নন, বিষ্ণুর বক্ষে পদাঘাত-এর মতো আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। আজকের পর্ব কেমন লাগলো, অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। ভিডিওটি ভালো লাগলে একটি লাইক দিন এবং এমন পৌরাণিক কাহিনী শুনতে Vedic planet চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন। আগামী পর্বে আমরা মহর্ষি ভৃগুর 'বিষ্ণুর বক্ষে পদাঘাত'-এর সেই বিখ্যাত কাহিনী নিয়ে আসছি। ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন এবং জয় শ্রী কৃষ্ণ! |