09/12/2025
একটা সময় সোনাগাছিতে গেলেই নাকি প্রশ্ন করা হতো ‘খাটে না চটে?’ খদ্দের ‘খাট’ চান নাকি ‘চট’ সেই বুঝে তারপর শুরু হতো দরদাম - ১০০ থেকে ১০০০০, ফুর্তি যত বাড়ে, রেটও বাড়তে থাকে ধাপে ধাপে।
সোনাগাছি - বাংলা ভাষায় প্রায় নিষিদ্ধ একটি শব্দের মত উচ্চারিত হয় এই নাম। এটি এখন আর কোনো স্থানের নাম নয়, সোনাগাছি এখন যৌনতার এক পরিবর্তিত শব্দ। বড়রা ছোটদের সামনে এই শব্দ উচ্চারণ করে না। রবীন্দ্র সরণী বা চিত্তরঞ্জন এভিনিউ রোড দিয়ে ছুটে যাওয়া বাসের জানলায় বসে থাকা প্রত্যেকটি মানুষ যতটা পারে চোখ দিয়ে ভিজিয়ে নেয় এই স্থানের স্বাদ। এখানে যৌনতা বিক্রি হয়। সুলভে। খুবই কম টাকায়। কম সময়ে।
ছোট্ট একটা খুপড়ির মত ঘরে যৌনতা বিক্রি করে এখানকার মহিলারা। একটা বিছানা, একটা টুল আর জলের বোতল ছাড়া সে ঘরে আর কিছুই নেই বললে চলে। কপাল করে কেউ কেউ টিভি নিতে পারে ঘরে, অথবা সস্তার মিউজিক সিস্টেম। বেশীর ভাগ ঘরেই জানলা নেই। যেকটা ঘরে আছে সেই সব ঘরের জানলা বলতে গেলেই বন্ধ। গুমোট, বীর্যের নোংরা গন্ধে ভরা বাসি চাদরেই সেরে নিতে হয় চাহিদার ক্ষিদে।
সোনাগাছি নিয়ে নানান মিথ ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। আজ এইখানে আলোচনা করব সোনাগাছির কিছু অজানা তথ্য নিয়ে যা হয়ত আপনি আগে কখনও শোনেন নি। আপনার যদি পুরোনো ইতিহাস, অজানা গল্প শুনতে ভালো লাগে। তাহলে আপনার অবশ্যই জানা উচিত কলকাতার এই নিষিদ্ধ পল্লী সোনাগাছির অজানা তথ্য।
সোনাগাছির পথ চলা প্রথম শুরু হয়েছিল বোধহয় উনিশ শতকেই। গোটা ভারতকেই তখন আস্তে আস্তে দখল করার পথে এগোচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কলকাতা তখন ব্রিটিশরাজের নয়া রাজধানী। নতুন রাজ্য শাসন করার জন্য ইংল্যান্ড থেকে এসেছেন একদল তরুণ যুবা। তাদের বয়স কম, শরীরে তরুণ রক্ত। নতুন দেশে এসে তার জৌলুস দেখে তাঁদের তো চক্ষু চড়কগাছ। দেদার ধনদৌলতে শিগগিরই তাদের পকেট ভরে উঠতে লাগল। ফুর্তিতে মন দিলেন তাঁরা। বিবি-বাচ্ছা সবই তো এদিকে ইংল্যান্ডে। কী করবেন? অগত্যা এদেশী কালা নেটিভদের বিধবা মেয়েগুলোকে ধরে ধরে আনতে লাগলেন সোনাগাছিতে (তখনও অবশ্য সোনাগাছি ‘সোনাগাছি’ হয়নি)। কলকাতা শহরে বেশ্যাবৃত্তির বোধহয় সেই শুরু। কেউ কেউ বলেন অবশ্য ওই যে পূবে কর্ণওইয়ালিস স্ট্রিট ও পশ্চিমে চিতপুর, তার মধ্যিখানের গোটা জায়গাটা নিয়ে যে বেশ্যাদের উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, সেই জায়গাটা কিন্তু আদতে নাকি ছিল প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের।
কলকাতা শহরের বিখ্যাত বড়োলোক ‘বাবু’দের মধ্যে তিনি একজন। তাঁর ও স্থানীয় কয়েকজন ধনী জমিদার ‘বাবু’র উদ্যোগেই নাকি শুরু হয়েছিল সোনাগাছির ব্যবসা। সানাউল্লাহ নামে এক মুসলমান সাধুবাবার নামে তারপর একসময় জায়গাটার নাম হয় ‘সোনাগাছি’ ও সেই নামেই আস্তে আস্তে সোনাগাছি ‘সোনাগাছি’ হয়ে ওঠে। সেকালের বাবুদের বারবনিতা-বিলাস নাকি ছিল রীতিমতো একটা ব্যাপার। তারপরে সোনাগাছির এলাকা ক্রমাগত বেড়েছে। ভারতে যৌনব্যবসা আইনমতে নিষিদ্ধ হলেও কিছুদিন আগের এক হিসেব অনুযায়ী প্রায় ১৪০০০ যৌনকর্মী সোনাগাছিতে কাজ করেন। প্রতিবছর প্রায় ১০০০ জন মেয়ে এই ব্যবসায় নতুন যোগ দেন। সম্প্রতি আপনারা দেখেছেন সোনাগাছির যৌনকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে তাঁদের এলাকায় দুর্গাপুজোও করছেন।
সোনাগাছির বিভিন্ন তথ্য-
১) মোট ১০ হাজার মহিলা (লিখিত হিসেব) এখানে যৌনকর্মী হিসেবে নিযুক্ত। এদের মধ্যে ৬ হাজার মহিলা এখানে বসবাসরত, এবং ৪ হাজার মহিলা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে রোজা আসা যাওয়া করে কাজ করেন।
২) সোনা গাছি নামটি এসেছে সোনা গাজি নামের এক ব্যক্তির থেকে, এক সময় তিনিই এখানকার মালিক ছিলেন। তার আসল নাম ছিল সানাউল্লাহ।
৩) সোনাগাছিতে বাঙালি মহিলার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে, মূলত নেপাল, বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মেয়ে এখানে রোজগার করতে এসে থাকেন।
৪) এখানে যৌন চাহিদা মেটাতে আসে নানা শ্রেণির মানুষ। রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে ধনী ব্যবসায়ী অবধি। আপনার চাহিদা অনুসারে এখানে প্রতি রাতে ১০০ থেকে ৩০ হাজার টাকা অবধি নানা পারিশ্রমিকের যৌনকর্মী পাওয়া যায়।
৫) এখানকার প্রায় সমস্ত মহিলারাই কেউ নিজেদের আসল নাম ব্যবহার করেন না। সকলেই লাইনে নামার আগে নিজের নিজের নকল নাম ঠিক করে নেন, এবং সেগুলো বেশীর ভাগই হয় দু-তিন অক্ষরের।
৬) ১৯৯২ সালে সোনাগাছি প্রজেক্ট বলে একটি প্রকল্প শুরু হয় যার উদ্দ্যেশ্য হল যাতে এখানে যৌনতা কিনতে আসা সকল পুরুষ অবশ্যই কন্ডোম ব্যবহার করে সেটা দেখা।
৭) সোনাগাছিকে প্রেক্ষাপট করে ১৮৮০ সালে প্রথম যাত্রাপালা রচিত হয় বেশ্যালীলা। নাট্যকারের নাম অজ্ঞাত থেকে গেছে। তারপর থেকে আজ অবধি বহু বহু যাত্রা, সিনেমা, নাটকে সোনাগাছিকে প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোয় কিভাবে কাটে তাঁদের জীবন? যৌনকর্মীর এই ভয়ঙ্কর জীবন কি তাঁরা নিজেরা স্বেচ্ছায় বেছে নেন, নাকি বাধ্য হন? টাকাপয়সার লোভ দেখিয়ে কাউকে কাউকে বাধ্য করা হলেও বেশীরভাগই কিন্তু এখানে স্বেচ্ছায় আসেন। নিজের ইচ্ছেতেই সাহস করে তাই যারা বেছে নেন যৌনকর্মীর মতো কষ্টের, লাঞ্ছনার জীবনকে, তাঁদের তাই আমাদের কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় থাকে না! হোক না কষ্টের জীবন, কিন্তু এখানে এসেই সমাজের অর্থনৈতিক স্তরে নীচের দিকে থাকা অনেক মেয়েই ‘স্বাধীনতা’র স্বাদ পায়। স্বাদ পায় টাকার, এবং সেই টাকায় জীবনকে তারা একভাবে নিজের ইচ্ছেয় চালাতে পারে। কেউ বা হয়তো পারিবারিক পরম্পরাতেই ছোট থেকেই স্থির করে নেন এই পেশাতে আসার কথা।
সোনাগাছি প্রকল্প যৌনকর্মীদের সমবায়। এটি এই অঞ্চলের যৌনকর্মীদের মধ্যে কাজ করে তাদের মধ্যে কন্ডোম ব্যবহার ও মানুষ পাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বিষয়ে সচেতনতার কথা প্রচার করে। ১৯৯২ সালে জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী স্মরজিৎ জানা এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে মুখ্যত যৌনকর্মীরাই এটিকে চালিয়ে থাকেন। এই সংস্থার কৃতিত্ব যৌনকর্মীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ৫ শতাংশে কমিয়ে আনা, যা ভারতের অন্যান্য নিষিদ্ধ পল্লির তুলনায় অনেক কম। সেই জন্য রাষ্ট্রসংঘের এইডস কর্মসূচিতে এটি শ্রেষ্ট অনুশীলন মডেল বা বেস্ট প্র্যাকটিশ মডেল আখ্যাত হয়েছে।
দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি (ডিএমএসসি) সোনাগাছি প্রকল্প সহ পশ্চিমবঙ্গের ৬৫,০০০ যৌনকর্মী ও তাদের সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। এই সংস্থা যৌনকর্মীদের অধিকার স্বীকৃতি ও যৌনব্যবসার বৈধীকরণের দাবি জানিয়ে থাকে। এছাড়াও তারা বিভিন্ন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানগত কর্মসূচি পালন করে এবং ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে থাকে।বাংলা ভাষায় "দুর্বার" শব্দটির অর্থ অপ্রতিরোধ্য। ডিএমএসসি ভারতের প্রথম জাতীয় যৌনকর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে। ১৯৯৭ সালের ১৪ নভেম্বর কলকাতায় আয়োজিত এই সম্মেলনের শিরোনাম ছিল 'সেক্স ওয়ার্ক ইজ রিয়েল ওয়ার্কঃ উই ডিম্যান্ড ওয়ার্কার্স রাইট' ('S*x Work is Real Work: We Demand Workers Rights')।
তথ্যচিত্র বর্ন ইনটু ব্রথেলস ২০০৫ সালে শ্রেষ্ঠ তথ্যচিত্র বিভাগে অস্কার জয় করে। এই তথ্যচিত্রে সোনাগাছির যৌনকর্মী-সন্তানদের জীবনযাত্রা চিত্রিত হয়েছে।