29/08/2026
হজরত ইদ্রিস (আ.) হলেন ইসলাম ধর্মে বর্ণিত একজন সম্মানিত নবী ও রাসূল। কুরআন মাজিদে তাঁর নাম সরাসরি দুটি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী বলা হয়েছে। ইসলামি ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থের আলোকে তাঁর বিস্তারিত জীবনী নিচে তুলে ধরা হলো:
হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর প্রকৃত নাম সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেন, তাঁর নাম ছিল আখনূখ (ইখনূখ) বা হানূখ। তিনি ছিলেন পৃথিবীতে আগমনকারী প্রথমদিকের একজন নবী। ‘ইদ্রিস’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘দারস’ থেকে, যার অর্থ পাঠ করা, অধ্যয়ন করা বা শিক্ষা গ্রহণ করা। যেহেতু তিনি আল্লাহর কিতাব এবং পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা অধ্যয়নে ও শিক্ষাদানে গভীর মনোযোগী ছিলেন, তাই তাঁকে ‘ইদ্রিস’ নামে ডাকা হতো। তাঁকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কলম বা লেখনীর ব্যবহার শেখানো হয়েছিল বলেও অনেকে বিশ্বাস করেন।
কুরআনে ইদ্রিস (আ.)-এর উল্লেখ
পবিত্র কুরআনে দুটি জায়গায় তাঁর কথা বলা হয়েছে:
১. সূরা মারইয়াম (১৯:৫৬-৫৭):
"স্মরণ করো এই কিতাবে ইদ্রিসের কথা। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন একজন সত্যবাদী নবী। আর আমি তাঁকে উন্নীত করেছিলাম এক উচ্চ মর্যাদায়।"
২. সূরা আম্বিয়া (২১:৮৫-৮৬):
"এবং স্মরণ করো ইসমাঈল, ইদ্রিস ও যুল-কিফলের কথা। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ধৈর্যশীল। আর আমি তাঁদেরকে আমার রহমতে দাখিল করেছিলাম। নিশ্চয়ই তাঁরা ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ।"
এই আয়াত দুটি থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও সবরের অধিকারী। ‘উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত’ বলতে অনেকেই আকাশে উত্তোলন বা চতুর্থ আসমানে জীবিতাবস্থায় উঠিয়ে নেওয়ার কথা বুঝিয়ে থাকেন।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
ইসলামি ইতিহাস ও ইসরাইলি বর্ণনা অনুযায়ী, ইদ্রিস (আ.) হলেন হজরত আদম (আ.)-এর পরবর্তী বংশধরদের একজন।
· পিতার নাম: ইয়ারিদ (ইয়ারদ)
· পিতামহের নাম: মাহলাইল
· দাদার নাম: কায়নান
· প্রপিতামহ: আনূশ
· পূর্বপুরুষ: শীস (আ.)
তিনি হজরত আদম (আ.) ও হজরত শীস (আ.)-এর পর তৃতীয় প্রজন্মের মধ্যে পড়েন বলে ধারণা করা হয়। জন্মস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া গেলেও ঐতিহাসিকগণ মনে করেন তিনি ব্যাবিলন (বর্তমান ইরাক) বা মিশর অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় মিশরে কাটিয়েছিলেন।
আল্লাহ তায়ালা ইদ্রিস (আ.)-কে তাঁর সম্প্রদায়ের হেদায়েতের জন্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর সময়ে মানুষ এক আল্লাহর ইবাদত থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন মূর্তি ও পাথরের পূজা শুরু করেছিল। তিনি মানুষকে তাওহিদের (একত্ববাদ) দিকে ডাকতেন, পাপাচার ত্যাগের নির্দেশ দিতেন এবং পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থসমূহের শিক্ষা অনুসরণ করতে বলতেন।
· একত্ববাদ: তিনি মানুষকে একমাত্র আল্লাহর উপাসনার আহ্বান জানান।
· নৈতিকতা: তিনি সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও সদাচরণের শিক্ষা দেন।
· জ্ঞানচর্চা: তিনি ছিলেন প্রথম যুগের নবীদের মধ্যে অন্যতম, যিনি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং লেখার প্রসারে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বলা হয়, তিনিই প্রথম লেখনী (কলম) দিয়ে লিখতে শেখান।
১. প্রথম সেলাইকার: একটি বিখ্যাত বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনিই সর্বপ্রথম কাপড় সেলাই করেছিলেন। তাঁর আগে মানুষ পশুর চামড়া দিয়ে শরীর ঢাকত। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সূঁচ ও সুতো ব্যবহারের জ্ঞান দান করেছিলেন, ফলে তিনি পোশাক নির্মাণের সূচনা করেন।
২. লেখনী ও জ্ঞানের প্রসার: তাঁকে ‘প্রথম কলম ব্যবহারকারী’ বলা হয়। তিনি বহু আসমানি পুস্তক ও জ্ঞান লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
৩. আসমানি কিতাব: কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা তাঁর উপর ত্রিশটি সহিফা (ছোট পুস্তক/পৃষ্ঠা) নাজিল করেছিলেন। তিনি সেগুলো মানুষের মাঝে প্রচার করতেন।
৪. মৃত্যুর ফেরেশতার সাক্ষাৎ: প্রসিদ্ধ একটি কাহিনী থেকে জানা যায়, হজরত ইদ্রিস (আ.) একবার আল্লাহর কাছে জান্নাত দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে আজরাইল (আ.)-এর সাথে জান্নাত দেখাতে পাঠান এবং পরে তাঁকে আর ফেরত আনা হয়নি; তিনি জান্নাতেই অবস্থান করেন। এ কারণেই অনেকে বলেন তিনি জীবিতাবস্থায় জান্নাতে গিয়েছেন এবং সেখানেই আছেন।
ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে ইদ্রিস (আ.)-এর জীবনের সমাপ্তি নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায়:
1. মত ১: আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন (যেমনটা ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে বলা হয়)। কুরআনের ‘উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত’ আয়াতটিকে এই মতের সমর্থনে ব্যাখ্যা করা হয়।
2. মত ২: তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন এবং জান্নাতি ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, মৃত্যুর পরে তাঁর রূহ চতুর্থ আসমানে অবস্থান করছে। মহানবী (সা.) মিরাজের রাতে চতুর্থ আসমানে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং ইদ্রিস (আ.) তাঁকে সালাম দিয়েছিলেন।
সহিহ হাদিসে মিরাজের ঘটনায় উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন আসমানে আরোহণ করছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন নবীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। চতুর্থ আসমানে তিনি ইদ্রিস (আ.)-এর সাথে দেখা করেন। ইদ্রিস (আ.) তাঁকে বলেন, “স্বাগতম, হে সৎ ভাই ও সৎ নবী!” (বুখারি ও মুসলিম)।
হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর জীবন থেকে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে:
· ধৈর্য ও অধ্যবসায়: দাওয়াতের কাজে তাঁর ধৈর্য ছিল অতুলনীয়।
· জ্ঞানার্জন: লেখা, পড়া, সেলাই বা বিজ্ঞান— প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি দেখিয়েছেন, দ্বীনের পাশাপাশি পার্থিব জ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ।
· তাকওয়া: আল্লাহর নৈকট্য অর্জনই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। আল্লাহ তাঁকে অত্যন্ত সম্মানিত করেছেন।
হজরত ইদ্রিস (আ.) হলেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি আদিকালের মানব সভ্যতাকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও ইবাদতের পথে পরিচালিত করেছেন। তাঁর স্মরণে আমরা শিখি যে, সৎকাজ, জ্ঞানচর্চা, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসাই মানুষকে প্রকৃত সম্মানের উচ্চাসনে পৌঁছে দিতে পারে।