10/10/2026
কিছুদিন আগের কথা।
অফিসে তখন ২০ মিনিটের ব্রেক। আমি আর আমার সহকর্মী Peter কফি হাতে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম। সাধারণ দিনের মতোই হালকা কথাবার্তা কাজ, জীবন, এই দেশ, সেই দেশ। হঠাৎ কথার মাঝখানে Peter আমাকে জিজ্ঞেস করল,
“Sufi, how did you enjoy your life in Bangladesh before coming to the Netherlands?”
প্রশ্নটা শুনে আমি একটু হেসেছিলাম। তারপর বললাম,
“Yeah, it was quite good. I really enjoyed my life there. I had lots of friends, my family, so many people around me… I left all of them back in Bangladesh.”
সে আবার জিজ্ঞেস করল,
“Which city did you live in?”
আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই বললাম, “Dhaka.”
কিন্তু এরপর Peter যে কথাটা বলল, সেটার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না।
সে বলল,
“I’ve seen many videos of Dhaka. It’s one of the dirtiest and most chaotic cities in the world. Even if someone offered me a free trip, I wouldn’t go there. I don’t understand how people can live in a place like that.”
কথাগুলো শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম।
Peter তখন হয়তো বুঝতেও পারেনি, খুব সাধারণভাবে বলা কয়েকটা কথা আমার ভেতরে কতটা গভীরে গিয়ে লেগেছিল।
চোখের সামনে হঠাৎ করেই ঢাকার ছবিগুলো ভেসে উঠতে শুরু করল।
ফার্মগেটের সেই অসহ্য ভিড়।
গুলিস্তানের ব্যস্ত রাস্তা।
কাওরান বাজারের কোলাহল।
মিরপুরের ধুলা, গাড়ির হর্ন, জ্যাম…
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি তার কথাগুলো পুরোপুরি অস্বীকারও করতে পারছিলাম না।
আমাদের শহরে ময়লা আছে।
অগোছালো রাস্তা আছে।
অসহ্য ট্রাফিক আছে।
এমন অনেক কিছু আছে, যেগুলো দেখে হয়তো একজন বাইরের মানুষ সত্যিই বিরক্ত হবে।
ওই শহরের কোনো এক রাস্তায় আমি বন্ধুদের সাথে রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়েছি। কোনো এক দোকানে বসে চা খেয়েছি। কোনো এক রাস্তায় হয়তো মন খারাপ নিয়ে হেঁটেছি, আবার কোনো এক রাস্তায় জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনও কাটিয়েছি।
কিন্তু সেই মুহূর্তে কেন জানি এগুলোর কোনোটাই মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না।
আমি শুধু একটু হেসে বলেছিলাম,
“Haha Peter… maybe you only saw the bad side. They probably didn’t show you the good side.”
তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম,
“Anyway, I have to go. I need to finish my task. See you.”
আমি চলে এলাম।
অফিসে ফিরে নিজের চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর রাখা sensor-গুলো নিয়ে কাজ শুরু করার চেষ্টা করলাম। একটা sensor হাতে নিচ্ছি, আবার রেখে দিচ্ছি। কম্পিউটারের দিকে তাকাচ্ছি, আবার কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারছি—
আমি আসলে কিছুই দেখছি না।
মাথার ভেতর শুধু Peter-এর কথাগুলো ঘুরছে।
“How can people live in that kind of city?”
নিজের কাছেই বারবার একটা প্রশ্ন আসছিল আমি কেন কিছু বলতে পারলাম না?
আমি কি আমার দেশকে defend করতে পারিনি?
নাকি সত্যিটা হলো, কিছু জায়গায় defend করার মতো উত্তরই আমার কাছে ছিল না?
আর তখনই মনে হচ্ছিল, আমাদের দেশের প্রতিটা তরুণ যদি কোনো একদিন শুধু নিজের বাড়ির কথা না ভেবে নিজের রাস্তা, নিজের এলাকা, নিজের শহরটাকেও নিজের বলে ভাবত… তাহলে হয়তো ছবিটা অন্যরকম হতে পারত।
যদি আমরা সবাই ভাবতাম
“এই ময়লাটা অন্য কারও না, এটা আমার দেশের ময়লা।”
“এই রাস্তাটা সরকারের একার না, এটা আমারও রাস্তা।”
“দেশকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব শুধু কারও অফিসের না, আমারও।”
তাহলে হয়তো একদিন বিদেশের কোনো অফিসে দাঁড়িয়ে একজন বাংলাদেশিকে নিজের শহর নিয়ে এভাবে চুপ হয়ে যেতে হতো না।
সেদিন কাজ শেষ হতে হতে সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৩০।
অফিস থেকে বের হয়ে হাতে একটা কফি নিয়ে কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে ছিলাম।
চারপাশ শান্ত। পরিচ্ছন্ন রাস্তা। মানুষ নিজের মতো হাঁটছে। কোথাও অযথা হর্ন নেই, কোথাও ময়লার স্তূপ নেই।
হাতে গরম কফির কাপ
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে শুধু ভাবছিলাম
সমস্যাটা আসলে কোথায়?
আমার দেশের মধ্যে?
দেশের মানুষের মধ্যে?
নাকি আমাদের চিন্তার মধ্যে?
নাকি সমস্যাটা আমার মধ্যেই যে আমি অন্য একটা দেশে এসে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজের দেশটাকে অন্য একজন মানুষের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করেছি?
উত্তরটা সেদিনও পাইনি।
কিন্তু একটা কথা খুব ভালোভাবে বুঝেছিলাম বিদেশে আসার পর নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাটা অদ্ভুতভাবে বদলে যায়।
দেশে থাকতে হয়তো রাস্তায় জ্যাম দেখে গালি দিতাম, ময়লা দেখে বিরক্ত হতাম, শহরটাকে হাজারবার খারাপ বলতাম।
কিন্তু সেই একই শহরকে যখন অন্য কেউ ছোট করে কথা বলে, তখন বুকের ভেতর কোথাও যেন খুব নীরবে ব্যথা করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত শহরটা যতই অগোছালো হোক, যতই ধুলো আর জ্যামে ভরা হোক….
ওটাই তো আমার শহর।
ওটাই আমার বাড়ি।
ওখানেই আমার মানুষগুলো আছে।
আর হয়তো নিজের দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন অংশটাই হলো তার ভুলগুলো লুকিয়ে রাখা নয়, বরং সেই ভুলগুলো দেখে একদিন সেগুলো বদলানোর দায়িত্বটাও নিজের বলে মনে করা।
ছবিটার কথাগুলোর মতোই, সেদিন একটা জিনিস আমার মাথায় থেকে গিয়েছিল
“Dress well, even when you are alone. Treat yourself with the respect you deserve.”