Ruchita Ruti

Ruchita Ruti Love is life

♦️বাবার শেষকৃত্যের পরের দিন সকাল ৯টার জন্য আমি তাঁর কুকুরটিকে মেরে ফেলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেছিলাম। নিজেকে বলেছিলাম,...
04/02/2026

♦️বাবার শেষকৃত্যের পরের দিন সকাল ৯টার জন্য আমি তাঁর কুকুরটিকে মেরে ফেলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেছিলাম। নিজেকে বলেছিলাম, আমি ওর প্রতি একটা দয়া করছি।
বাবা চলে গেছেন।
আর ব্রুটাস—একটি বলিষ্ঠ, ধূসর-সাদা হাস্কি, যার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও চিন্তাশীল এবং যার মধ্যে ছিল এক শান্ত দৃঢ়তা—তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন শোক একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল দেহের ভেতরে বাসা বেঁধেছে। সে সাবধানে চলাফেরা করছিল, সবসময় চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকত। তার চোখ বারবার সামনের দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল।
অপেক্ষা করছে।
সবসময় অপেক্ষা করছে।
🌿সান দিয়েগোতে আমার পরিপাটি, হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন-শাসিত কনডোতে আমি ওরকম একটা কুকুরকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম না। কঠোর নিয়মকানুন। কোনো বড় জাতের কুকুর রাখা যাবে না। আমার ফ্লাইট ধরার ছিল, কাজের ডেডলাইন ছিল, এবং আমার জীবনে এমন কোনো জায়গা ছিল না একজন সক্রিয়, বুদ্ধিমান সঙ্গীর জন্য, যার আরামের চেয়ে সংযোগের প্রয়োজন ছিল বেশি।
🌿আমার বাবা, রেমন্ড কোল, একজন স্নেহপ্রবণ মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ডকশ্রমিক, যার হাতে ছিল কড়া পড়া এবং যার নীরবতা এতটাই ভারী ছিল যে তা পুরো ঘর ভরে ফেলত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অনুভূতি ব্যক্তিগত—এমন কিছু যা গিলে ফেলতে হয় এবং ভেতরে লুকিয়ে রাখতে হয়। তিনি কাউকে জড়িয়ে ধরতেন না। তিনি আড্ডা দিতেন না। লোকেরা তাকে কঠোর মনে করত। আমি উনিশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলাম এবং তাকে ছাড়া কীভাবে বাঁচতে হয় তা শিখেছিলাম।
তার ছোট উপকূলীয় বাড়িতে ফিরে আসাটা আমার কাছে একজন অপরিচিতের জীবনে অনুপ্রবেশ করার মতো মনে হচ্ছিল। ব্রুটাস প্রবেশপথে শুয়ে ছিল, খালি জায়গাটা পাহারা দিচ্ছিল। যখন সে আমাকে দেখল, তার লেজটা একবার নড়ল—ধীরে এবং সযত্নে।
তার কলার থেকে একটি পুরোনো চামড়ার থলি ঝুলছিল। আঁচড় কাটা, রোদে বিবর্ণ, হাতে সেলাই করা।
আমি সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দিইনি।
🌿"চলো, ব্রুটাস," পরের দিন সকালে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, গলায় দড়িটা লাগাতে লাগাতে।
"চলো যাই। শেষবারের মতো একটু হেঁটে আসি।"
আমি ভেবেছিলাম বাড়ির চারপাশটা ঘুরব। একটা সমাপ্তি। একটা চূড়ান্ত বিদায়।
কিন্তু ব্রুটাসের অন্য পরিকল্পনা ছিল।
বাইরে পা রাখার মুহূর্তেই সে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে গেল। টানছিল না—বরং পথ দেখাচ্ছিল। সে আমাকে সোজা হারবার স্ট্রিট ধরে নিয়ে গেল, কফি শপের পাশ দিয়ে, পার্কের পাশ দিয়ে, এবং একটি ছোট অটো গ্যারেজের সামনে এসে থামল।
সে বসল।
অপেক্ষা করল।
তেলের দাগ লাগা জাম্পস্যুট পরা একজন মহিলা বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং তাকে দেখে থমকে গেলেন।
"ওহ... আরে, বন্ধু," তিনি নরম সুরে বললেন, হাঁটু গেড়ে বসে। তিনি তার পকেট থেকে ভাঁজ করা টাকা বের করে থলিটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর তিনি ব্রুটাসের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে রাখলেন। আমি আমার ঘড়ির দিকে তাকালাম। “আমি দুঃখিত—এটা কী?”
সে চোখ তুলে তাকাল, চোখ ভেজা।
“তোমার বাবা ওকে দিয়ে পাঠাতেন। প্রতি শুক্রবার। বলতেন, ব্রুটাস তার চেয়েও ভালো কথা শোনে।”
সে কান্নার মধ্যেই হেসে ফেলল।
“ওই টাকাটা দিয়ে একা মায়েদের গাড়ি ঠিক করতে সাহায্য করা হতো। তোমার বাবা চাননি তার নাম এর সাথে জড়াক।”
আমার বুকটা ভার হয়ে গেল।
ব্রুটাস আবার নড়ে উঠল।
পরের গন্তব্য—প্রাথমিক স্কুলের কাছের বাসস্টপ।
এক কিশোরী একা দাঁড়িয়ে ছিল, হুডিটা শক্ত করে পরা, কাঁধ দুটো টানটান। ব্রুটাসকে দেখামাত্রই সে ভেঙে পড়ল। হাঁটু গেড়ে বসে তার গলা জড়িয়ে ধরল। ব্রুটাস তার পাশে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—যেন সে জানত যে কখনও কখনও নীরবতাই সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
বাস ড্রাইভার ফিসফিস করে আমাকে বলল,
“সে ওর জন্য অপেক্ষা করে। গত বছর মেয়েটিকে খুব বাজেভাবে উত্ত্যক্ত করা হয়েছিল। তোমার বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ব্রুটাস ওকে সাহস জোগাতে ওর সাথে হেঁটে যেতে পারবে কিনা।”
সে থলির দিকে মাথা নাড়ল।
“কখনও কখনও এর ভেতরে দুপুরের খাবারের টাকা থাকত। কখনও কখনও একটা চিরকুট থাকত, যাতে লেখা থাকত, ‘তুমি আজকের দিনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী’।”
ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম।
ওই থলিটা শুধু জিনিস রাখার জায়গা ছিল না।
ওটা ছিল একটা ভাষা।
আমার বাবা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলতে জানতেন না।
তাই তিনি একজন হাস্কিকে শিখিয়েছিলেন তার হয়ে কথাটা বলতে।
আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটলাম।
একজন ডিনারের রাঁধুনি, যিনি বাড়িভাড়া দিতে সাহায্য পেতেন।
একজন প্রাক্তন সৈনিক, যার মুদি দোকানের জিনিস দরকার ছিল কিন্তু চাইতে পারতেন না।
একজন লাইব্রেরিয়ান, যিনি নিজেকে শান্ত করার জন্য জোরে জোরে পড়ার সময় ব্রুটাসকে তার পাশে বসতে দিতেন।
একটি শহর, যা নীরবে জুড়ে ছিল এমন একটি কুকুরের মাধ্যমে যাকে মানুষ প্রায়ই ভুল বুঝত
এবং একজন মানুষের মাধ্যমে, যিনি তাকে কখনও বিচার করেননি।
🟠সূর্যাস্তের সময়, আমরা বাড়িতে ফিরে এলাম।আমি পশুচিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করে দিলাম।
থলিটা খোলার সময় আমার হাত কাঁপছিল।
ভেতরে একটা ভাঁজ করা নোটবুকের কাগজ ছিল। হাতের লেখাটা অমসৃণ। এবড়ো খেবড়ো। আমার বাবার হাতের লেখা।
—যদি তুমি এটা পড়ছ, তাহলে আমি চলে গেছি।
ব্রুটাসকে আটকে রেখো না। সে বিপজ্জনক নয়।
সে আমার সেই অংশটা, যে ভালোবাসতে জানতো।
আমি কথায় ভালো ছিলাম না। সে ছিল।
যদি এটা তুমি হও, বাবা, আমি আশা করি সে তোমাকে তা দেখিয়েছে যা আমি পারিনি।
ওর যত্ন নিও। সে সবার যত্ন নিতো।
— বাবা
😢আমি ব্রুটাসের গলার কাছে মুখ গুঁজে দিলাম এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঁদলাম। আমি বাড়িটা বিক্রি করিনি।
আমি দূরে চলে গেছি।
আমার কনডোটা আর নেই।
প্রতিদিন সকাল ৮টায়, আমি আর ব্রুটাস হারবার স্ট্রিটে হাঁটি।
আমি শুধু একটা হাস্কি কুকুরকে হাঁটাচ্ছি না।
আমি একটা ঐতিহ্য বহন করছি।
আমরা একটা কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে বাস করি—সবাই চায় তাকে দেখা হোক, অনুসরণ করা হোক, প্রশংসা করা হোক।
কিন্তু আসল প্রভাব হয় নীরব।
এটা একটা শক্তিশালী, সংবেদনশীল হৃদয়ের কুকুর।
একটি চামড়ার থলিতে ভাঁজ করা একটি নোট।
একজন মানুষ যিনি কখনো ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলেননি, কিন্তু প্রতিদিন এই কথাটাই বোঝাতেন।
মানুষকে বোঝানোর জন্য আপনার চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না যে তারা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আর যদি আপনি এটা বলতে না জানেন—
তবে আপনার নিজের মতো করে লেজ নাড়ার উপায় খুঁজে নিন। 🐾


ঘন্টা পাঁচেক আগেই বাড়ির কর্তা মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৮ বছর। ম্যাসিভ হার্ট এটাক। ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু। শান্তির মৃত্...
25/12/2025

ঘন্টা পাঁচেক আগেই বাড়ির কর্তা মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৮ বছর। ম্যাসিভ হার্ট এটাক। ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু। শান্তির মৃত্য যাকে বলে। একটা বড় ব্যবসা ছিল কর্তার। কাড়ি কাড়ি স্বয়সম্পত্তি করে গেছেন।

কিছুক্ষণ আগেই মৃত বাড়িটাতে খুব জমিয়ে কান্নার উৎসব হচ্ছিল। ভাল করে খেয়াল করলে দেখা যেত খুব কঠিন হৃদয়ের হিংসুক প্রতিবেশীটাও ভদ্রলোকের হঠাৎ মৃত্যুতে হুঁ হুঁ করে কেঁদেছেন।

একজন মানুষকে মরা মানুষের নিথর দেহের সামনে কাঁদতে হয়, এটা নিয়ম। অন্তত বিশ সেকেন্ডের জন্যে হলেও চোখের পানি দেখাতে হয়। তা না হলে মানুষ পরে এ নিয়ে খুব সমালোচনা করে।

মৃত ভদ্রলোকের চার ছেলে এবং তিন মেয়ে। বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে এতক্ষণ বিলাপ আর মূর্ছা খেয়ে কাঁদছিল ওরা। মেয়েগুলো বারবার মূর্ছা যাচ্ছিল আর কাঁদছিল। খুব বিলাপ ধরে ধরে কাদছিল। বিলাপগুলো অনেকটা এমন--

বড় মেয়ে-
"ও বাবা,বাবাগো তুমি কেমনে আমায় একা করে চলে গেলাগো?আমার তো আর কেউ রইল না গো!ও খোদা তুমি আমারেও টাইনা নাওগো"

ছোট মেয়ে-
"আমায় এখন কে আদর করবে গো, আমার কথায় কথায় শখ কে পূরণ করবে গো!ও বাবা গো....ও বাবা..

মেঝ মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল ঘন্টা দেড়েক।

বাবা মারা গেলে ছেলেদের শব্দ করে কাঁদার নিয়ম নেই।এই সময়টাই তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল কত দ্রুত সম্ভব বাবাকে কবরবাসী করে দেয়া যায়। কোন পাওনাদার কিংবা দেনাদার থাকলে জানাযায় উপস্থিত মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করা যে আপনারা কেউ টাকা পাবেন কিনা।তাছাড়া ছেলেদের শব্দ করে কান্না করাটা বড্ড বেমানান।কিছুদিন পরে প্রতিবেশীরা এটা নিয়ে খুব হাসিঠাট্টা করে।কিন্তু তবুও চার ছেলে প্রথমে খুব কান্নাকাটি করেছিল।

লোকটাকে কবরে শুইয়ে আসা হয়েছে বেশ খানিকটা সময় হয়ে গেছে।

এখন আর বাড়ি জুড়ে কোন কান্নার উৎসব নেই আর। নিস্তব্ধ নীরবতা। সবাই মেনে নিয়েছে "বাবা মরণশীল"।সবার মধ্যে আস্তে আস্তে বাস্তবতার নিয়মগুলো ফুটে উঠছে। মূলতঃ বাস্তবতা যখন ক্লান্ত হয় তখন কিছুক্ষণের জন্যে আবেগ মানুষের অনুভূতির কাজটা করে দেয়। বাস্তবতার সাথে আবেগের কোন সম্পর্ক নেই।

মৃত ভদ্রলোকের দুই ছেলে ঢাকা থেকে এসেছে। দুজনেই অনেক বড় অফিসে চাকরী করে। আর বাকী দুই ছেলের একজন পড়াশোনা করে আর একজন ক্ষেত-খামার দেখাশোনা করে। তিন মেয়ের দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে আর একজন এখনো পড়াশোনা করছে।

সেদিনের সন্ধ্যার ঘটনা। বাড়ির উঠোনে চারদিন্না/ কুলখানির আয়োজনের মিটিং বসেছে। মৃত ভদ্রলোকের সব ছেলেমেয়ে গোল হয়ে বসেছে। সবার মনোযোগী দৃষ্টি। এখন আর কেউ কাঁদছে না। এমনকি মেজো মেয়েটাও না।সবাই স্বাভাবিক। মিটিং এ দুজন মুরুব্বি আছেন। একজন তাদের মা। বেচারি এখনো স্বামীর শোকে একেবারে পাথরের মত হয়ে আছেন। অপলক তাকিয়ে থাকেন একদিকে। বাকী আরেকজন তাদের বড় চাচা। মিটিং শুরু হল। কথাও শুরু হল। বাবার কুলখানির জন্যে কোন ছেলে কে কত টাকা করে দিবে তা আলোচনা চলছে। মোট কতজন গ্রামবাসীকে দাওয়াত দেয়া হবে তা নিয়ে কথা হচ্ছে। এখন সবাই ভীষণ বাস্তববাদী৷ এ সময়টাতে কাঁদা যায়না। কাঁদলে আবেগ থাকে। আর আবেগ হুশ কেড়ে নেয়। হুশ গেলে স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। তাই সবাই যথেষ্ট সচেতন।কে কত টাকা দেবে এমন টা নির্ধারণ করা হচ্ছে। মৃত ভদ্রলোকের সব ছেলেমেয়ের চোখে মুখে কাঁচুমাচু ভাব।

ঠিক সে সময় মেঝ ছেলেটা একটা বড় মাপের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। দীর্ঘশ্বাস টেনে মুরুব্বি জেঠার দিকে তাকিয়ে বলে বসল --"জেঠা, আল্লাহ আমার আব্বারে বেহেশত নসীব করুন। আমি আব্বার খাওয়ার জন্যে ত্রিশ হাজার টাকা দিব।
কিন্তু আমার একখান কথা আছে।

সকলের দৃষ্টি এসে আছড়ে পড়ল তার দিকে। জেঠা জানতে চাইলো কি কথা বাপজান?

কিছুটা ইতস্তত ভাব আনার ভঙ্গি করে বলল " আব্বার চারদিনের অনুষ্ঠানটা শেষ হতেই ঢাকা ফিরতে হবে।আমার ছুটি নেই। তাই বলছিলাম কি যদি....

জেঠা পালটা প্রশ্ন করল - " যদি কি বাপজান?"

মেজো ছেলেটা কাচুমাচু করে জবাব দিল " জেঠা আমি বলছিলাম কি যদি আমাদের সম্পত্তি গুলান যদি ভাগ বাটোয়ারা আজকেই কইরা ফেলা যায় তাইলে ভালা হয় খুব। আব্বারতো ইচ্ছাই ছিল সব ছেলেমেয়েদের সামনে রেখেই.....কিন্তু.....

কথাটা শেষ না করেই চোখ কচলাতে থাকে মেজো ছেলেটা। এমন ভাব যেন এখনই কান্নার স্রোতে ভেসে যাবে সে।

সুনসান নীরবতা। তবে খুব বেশিক্ষণ না। নীরবতা খুব দ্রুতই ভেঙে সেজো ছেলেটা গলা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলে উঠল - " জেঠা আমি মেজোর সাথে একদম একমত।ও ঠিক বলেছে। আমাকেও তো ঢাকা ফিরতে হবে এত সময় কোথায় বলুন। বাবাকে তো আর...... ফিরে পাব না।তাই কাজে কর্মেতো যোগ দিতে হবে। তাই আমিও বলছিলাম আজই সব সম্পত্তি ভাগ করে ফেলুন।

আবার সুনসান নীরবতা। বড় ছেলের বউটা তার স্বামীকে কানে কানে ফিসফিস করে বলে উঠল- "কি গো তুমি চুপ কইরা আছ কেন হাদারামের মতন, কথা কও। তুমিও তোমার জেঠারে কও যে তোমার ভাইগো লগে তুমি একমত আছো। একমাত্র বউ এর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে বড় ছেলেও গলা বাড়িয়ে বলল- হ জেঠাসাব মেজো সেজো খাঁটি কথাই কইসে ।আমিও হেগো লগে একমত।

আবার সুনসান নীরবতা। মৃত ভদ্রলোকের স্ত্রী অপলকহীন তাকিয়ে আছে এখনো বাড়ির শেওলা জমে থাকা উঠোনের দিকে। তিনি নির্বাক। একদম নির্বাক।

ছেলেমেয়েদের জেঠা নীরবতা ভাঙলেন। তিনি গলাটা বেশ খানিকটা শান্ত গলা করে বললে " বাপজানেরা, আগে তোমাগো বাপের চারদিন্নাখান সুন্দরমতন শেষ হইয়া যাউক। তোমাগো বাপ তো খুব সম্মানী মানুষ আছলো। হের আত্মার বেহেশতবাসী হওনের লাইগা এখন তোমাগো মেলা কাজকাম। "

কথাটা শেষ হতেই আবার নীরবতা। সবার চেহারা এমন যে কেউ জেঠার কথাটা বুঝতেই পারেনি।

মেজো ছেলেটা আবার নীরবতা ভাঙল। সে তার নির্বাক মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল - "মা যাও তো,জলদি যাইয়া দলিলপত্রগুলান লইয় আসো। আমি উকিল কাকারে কল দিয়া দিসি। উনি এক্ষুণি আইয়া পড়বো। "

তাদের মা এখনো নির্বাক। সেজো ছেলেটা মায়ের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে জোরে ডেকে উঠল " যাওনা মা, মেজো কি বলেছে শুনোনি। "

অমন ডাকে আচমকা সম্ভিত ফিরে ফেলেন যেন নির্বাক মানুষটা। শাড়ির আচল গুঁজে এই প্রথম তাদের মা শব্দ হু হু করে কেঁদে ফেলল। মহিলা ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। হয়ত এমন মুহূর্তটার জন্যে একদম তৈরি ছিল না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে মুখে আঁচল গুজে উঠে গেলেন চেয়ার ছেড়ে।
মেঝো মেয়ের স্বামী মেঝো মেয়েকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল- "শোন অধিকার কিন্তু ছাড়বে না।মুখ চালাবে। তা না হলে ঠকবে কিন্তু।"

এই একটু আগেই তো ছেলেমেয়েগুলো কেঁদে পুরো দুনিয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো। আর তারাই এখন নিজেদের স্বার্থের কাছে এত মাতোয়ারা হয়ে উঠল। এইটাই কি নিয়ম!

দলিল পত্র এসে পৌছে গেছে টেবিলে।
সুনসান নীরবতা। ছেলেমেয়েরা সবার চৌকস দৃষ্টি। তাদের শরীরের কোথাও এখন কান্নারা নেই। শরীরের প্রতি পরতে পরতে এখন শুদ্ধ অংকে ঘুরঘুর করছে। নটিক্যাল,বিঘা,কানি,আইল,বাংলো,
কড়ই গাছ,নারকেল গাছ,সোনালী ব্যাংক,রুপালী ব্যাংক ইত্যাদি বিষয় মুহুর্তের মধ্যে কষে ফেলছে। বাবার কোথায় কি আছে না আছে সব নিয়ে ভীষণ ভাবনা চিন্তা হচ্ছে।সবার একটাই চিন্তা একটু ভুল হলেও চলবে না।

মেজো ছেলেটা আগ বাড়িয়ে দলিলপত্রগুলো ধরতে যাবে। ঠিক একই মুহূর্তে হুমড়ি খেয়ে বাকী ছেলেমেয়েগুলোও হামলে পড়ল কাগজগুলোর উপর।

ফাইলটা হাতে নিয়ে খুলতে গিয়েই দেখতে পেল একটা লাল রঙের বড় খাম। খামটা হাতে নিয়ে তাড়াহুড়া করে খুলে দেখল একটা চিঠি।

চিঠিটা ছেলের হাত থেকে এক ঝাপটায় নিয়ে নিল মৃত ভদ্রলোকের স্ত্রী। চিঠিটা নিয়ে সেটা বাড়িয়ে দিল সন্তানদের জেঠার দিকে।

মৃত ভদ্রলোকের ভাই চিঠিঠা হাতে পেয়ে তাতে একবার হাত বুলিয়ে পুরো চিঠিখানা মেলে ধরলেন। এরপর জোরে জোরে পড়া আরম্ভ করলেন।

প্রিয় সন্তানেরা,
আমি মারা গেছি। এতক্ষণে নিশ্চয় আমাকে কবরে শুইয়ে এসেছ। এতক্ষণে তোমরা সবাই নিশ্চয় আমার সব সম্পত্তি নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েছ। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটাই তো নিয়ম। আমার বাবার মৃত্যুর ঠিক এক দিনের মাথায় আমার ভাইরা মিলে সব সম্পত্তি ভাগ করে ফেলেছিলো। তাই আমি তো জানি এ পৃথিবীর নিয়ম গুলো বড়ই বেদনাদায়ক। তোমাদেরকে একটা কথা বলি শোন, আমি খুব কষ্ট করে এতসব টাকা সম্পত্তি এসব কামিয়েছি। তোমাদের আরো একটা কথা জানিয়ে রাখি, এই এতসব সম্পত্তি করার পেছনে যে মানুষটা সবসময় আমাকে সাহস আর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে সেই মহিয়সী ব্যাক্তিটি হল তোমাদের মা মানে আমার সহধর্মিনী। আমি তাকে খুব ভালবাসি। যেহেতু তোমরা তার গর্ভের ফুল। তাই তোমাদের ও ভালোবাসি। তবে কোনভাবেই তাকে ভালোবাসার চাইতে বেশি নয়। তাই অবশ্যই আগে আমার কাছে তার নিরাপত্তা তারপর তোমাদেরটা। জানো সন্তানেরা, পৃথিবীটা খুব কঠিন জায়গা। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার বাবার মৃত্যুর পরে আমার মাকে কোন ছেলে ভাগে নেবে এটা ঠিক করতে আমার বড় ভাইদের ঘাম ছুটে গেছিল।
শেষমেশ আমি ক্লাস সিক্সে থাকা বয়সেই আমার বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সব সন্তানকে তো আল্লাহ আর কুলাংগার করে পাঠান না। তাইনা? তাই তোমাদের কিভাবে বিশ্বাস করি বল। নিজের ভালোবাসার প্রিয় মানুষটাকে তো আর পরম অনিশ্চয়তায় ছেড়ে যেতে পারি না। তাই আমি খুব ভেবেচিন্তেই একটা দারুণ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি অনেক আগেই। আর তা হল আমার যাবতীয় সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আমার বউ মানে তোমাদের মাকে উইল করে দিয়ে রেখেছি। পদ্ধতিটা একটু কঠিন। কিন্তু টাকার কাছে এই পৃথিবীতে সবই সম্ভব। তাই অবাক হওয়ার কিছুই নেই। তোমাদের মা আমাকে প্রতীজ্ঞা করেছে - "তিনি মরার আগে কোনভাবেই সম্পত্তি তোমাদের ভাগ করে দেবে না"। তবে তোমরা কোন বিপদে পড়লে তোমাদের মাকে বললেই তিনি তোমাদের আর্থিকভাবে সাহায্য করবেন। তোমরা মায়ের যত্ন নিও।আর দলিলগুলো মাকে আবার দিয়ে দিও। সেগুলো আঁকড়েই তো তিনি বাকী জীবন গুলো বাঁচবে। খুব মনে পড়বে তোমাদের কথা।

ইতি
তোমাদের বাবা

চিঠিটা পড়া শেষ হওয়ামাত্রই মৃত ভদ্রলোকের স্ত্রী ঝটপট দলিলগুলো এক ঝটকায় দুহাতে তুলে নিয়ে বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতন কেঁদে উঠল।

সে কান্নার কি যে ভূবন ভোলানো আর্তনাদী আওয়াজ। উফ! যে শুনেছে শুধু সে ই বলতে পারবে।

#𝑪𝒐𝒍𝒍𝒆𝒄𝒕𝒆𝒅

ভদ্রমহিলার স্বামী দীর্ঘদিন ঘর সংসার করেও জানতেন না তার স্ত্রী দেশের অত্যন্ত সম্মানিত খেতাবধারী মানুষদের একজন।একটা দেশের ...
05/12/2025

ভদ্রমহিলার স্বামী দীর্ঘদিন ঘর সংসার করেও জানতেন না তার স্ত্রী দেশের অত্যন্ত সম্মানিত খেতাবধারী মানুষদের একজন।

একটা দেশের জন্মের জন্যে নিজের প্রাণের পরোয়া করেননি তিনি। অথচ তখন তার বয়স মাত্র তের। সেই সময়েই দেশের টানে অস্ত্র চালানো শিখেছিলেন।

তবে অস্ত্র চালানোর চেয়েও রোমাঞ্চকর, ভয়াবহ যে বিপদ তিনি ঘাড়ের উপরে স্বেচ্ছায় টেনে নিয়েছিলেন সেসব শুধু সিনেমার পর্দায় বা বইয়ের পাতায় দেখা যায়। বাস্তবে সেগুলো ঘটানো তো দূরে থাক, কল্পনা করাও কঠিন।

তের বছরের এই কিশোরী দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্য, হিংস্র আর্মিদের ক্যাম্পে ঢুকে নানা তথ্য যোগাড় করে আনতেন। অতটুকু একটা মেয়ে, অথচ সেই সময়েই সে কখনো সেজেছে পাগল, কখনও পঙ্গুর বেশে অবলীলায় ঢুকে পড়েছে আর্মিদের ক্যাম্পে। সংগ্রহ করে এনেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপারেশন সফল হয়েছে। তিনি জানতেন ধরা যদি পড়েন, মৃত্যুর আগে
যে অত্যাচার তাকে সহ্য করতে হবে তারচেয়ে শতবার মৃত্যু ভাল। তবু পিছপা হননি।

ডেইলি স্টারে তার সাহসীকতার একটা ঘটনা উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ওটা তুলে দিলাম বোঝার সুবিধার্থে।

' ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের অক্টোবর মাসের। একপাশে খালিয়াভাঙ্গা অন্যপাশে ভেড়ামারি খাল। এক পাশের গ্রামে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প, অন্য গ্রামে পাকিস্তানিদের। মধ্যে একটা খাল পড়েছে। সারা শরীরে কাদা আর পাগলের বেশ ধরে সেবার পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে গিয়েছিলেন তারামন।

সামনে তখন হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। তারামনের সারা গায়ে কাদা, মাথায় চুলের জট, কাপড় ছেঁড়া, হাত পা যেন অনেকখানি বিকলাঙ্গ। তারামনকে দেখে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা অশ্লীল ভাবে গালি দিচ্ছিলো, জবাবে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছিলেন তারামন।

এদিকে আর্মির সদস্যরা ভাবলো পাগলের কতো রকমফের। নিজেদের মধ্যে হাসি ঠাট্টায় লিপ্ত হলো তারা। এই ফাঁকে তারামন পাগলের বেশে মোটামুটি অনুমান করে নিলো ক্যাম্পের সমস্ত জায়গার। কোন পাশে হামলা করলে সবচেয়ে ভয়ংকর হবে পাকিস্তানিদের জন্য, কোন পয়েন্ট দিয়ে পাকিস্তানিদের উপর হামলা করতে হবে এসব মনে রেখে বেরোতে গিয়ে কোন বাধার সম্মুখীন হলেন না তারামন। পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে সাঁতরে খাল পেরিয়ে ওপর পাড়ে উঠে তারামন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে এলেন।


গোপন খবরের অপেক্ষায় তখন মুক্তিযোদ্ধারা। তারামন পাকিস্তানিদের ক্যাম্পের অবস্থা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প কমান্ডারকে সব বললেন খোলাখুলিভাবে। তার নির্ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে নদীর অপর পাড়ে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে আক্রমণ হলো পরদিনই।'

নিজে বেশ কয়েকবার সম্মুখ সমরেও অংশগ্রহণ করেছে। কী দুর্দমনীয় একজন মানুষ ছিলেন তিনি।

অথচ ১৯৭৩ সালে যখন তাকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়, তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেশকে স্বাধীন করে তার দায়িত্ব শেষ। কোথাও মুক্তিযোদ্ধা সুবিধা নিতে যাননি, গলা ফাটাননি, ব্যবসা করেননি। হারিয়ে গিয়েছেন জনারণ্যে।

বহুদিন, বহু বছর তাকে ১৯৯৫ সালে খুঁজে পাওয়া যায়। সেই সময়ে তাকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।

তার স্বামী পর্যন্ত জানতেন না তিনি এত দুঃসাহসী একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি জানতেন তার স্ত্রীর নাম তারা বানু।

কিন্তু তারা বানু তার আসল নাম ছিল না। তার আসল নাম ছিল তারামন বিবি।

২০১৮ সালের ১লা ডিসেম্বর এই কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন। তারামন বিবির মতো মানুষ যুগে যুগে কালে কালে এক আধটা জন্মগ্রহণ করে।

তারচেয়েও কম অবদান রাখা কত মানুষ দুনিয়ায় বিখ্যাতদের তালিকায় নাম তুলে ফেলেছে। অথচ এই মহান নারীকে নিয়ে দেশেও তেমন আলোচনা হয় না। হওয়া উচিৎ।

১লা ডিসেম্বর ছিলো তার মৃত্যুবার্ষিকী। বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবির প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা রইল। ❤️

Adres

Elblag
82-300

Godziny Otwarcia

Poniedziałek 09:00 - 17:00
Wtorek 09:00 - 17:00
Środa 09:00 - 17:00
Czwartek 09:00 - 17:00
Piątek 09:00 - 17:00
Sobota 09:00 - 17:00
Niedziela 09:00 - 17:00

Strona Internetowa

Ostrzeżenia

Bądź na bieżąco i daj nam wysłać e-mail, gdy Ruchita Ruti umieści wiadomości i promocje. Twój adres e-mail nie zostanie wykorzystany do żadnego innego celu i możesz zrezygnować z subskrypcji w dowolnym momencie.

Udostępnij

Kategoria