15/04/2026
পোস্ট-রেভুলেশন পলিটিকাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ
অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে প্রথম সংঘাতের প্রধান কারণ ছিল সাদিক কায়েমের পরিচয় প্রকাশ পাওয়া। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণের মাধ্যমে যখন প্রকাশ পায় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্রশিবিরের নেতারা ঢাকায় আন্দোলনের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল এবং ৯ দফা প্রণয়নসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনাও শিবিরের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন ছাত্রদল বিষয়টি নতুনভাবে উপলব্ধি করে। আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে শিবিরের সাদিক কায়েম, এস. এম. ফরহাদ, সিবগাতুল্লাহ এবং আব্দুল কাদের মূল ভূমিকায় ছিলেন। তবে দৃশ্যমানভাবে “পোস্টার বয়” হিসেবে নাহিদ, সারজিস এবং আখতারদের সামনে আনা হয়। উল্লেখ করা হয় যে নাহিদ পূর্ব থেকেই গোপনে শিবির-সম্পৃক্ত ছিল এবং আন্দোলনের শুরুতেই ড. তাহের বিএনপি নেতাদের বিষয়টি অবহিত করেছিলেন; যদিও সে সময় তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়নি। পরবর্তীতে যখন শিবিরের নেতৃত্বের বিষয়টি জনপরিসরে আলোচিত হতে থাকে, তখন ছাত্রদল তা মেনে নিতে ব্যর্থ হয় এবং সংঘাতের সূচনা ঘটে।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের বিপুলসংখ্যক কর্মী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, যা অস্বীকার করা হয় না। তবে মূল প্রশ্নটি ছিল আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ বা “ড্রাইভিং সিট” এ কারা ছিল। এই প্রেক্ষাপটে বলা হয় যে শিবির নেতারা নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় গোপন রেখে আন্দোলনের কার্যকর নেতৃত্ব প্রদান করেছে। অন্যদিকে, ছাত্রদলের নেতাদের নাম অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি, কারণ তারা নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল না। এমনকি আবু সাইদের শিবির-সম্পৃক্ততার বিষয়টিও গোপন রাখা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়, এই আশঙ্কায় যে তা প্রকাশ পেলে আন্দোলনের সাফল্য ব্যাহত হতে পারত। ফলে ন্যারেটিভ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় ছাত্রদল পিছিয়ে পড়ে এবং প্রথম ন্যারেটিভ সংঘাতের সূচনা হয়।
পরবর্তী পর্যায়ে আন্দোলনের শহীদদের কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিএনপি চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিমকে বিশেষভাবে প্রচার করার চেষ্টা করে এবং অভ্যুত্থানের বয়ানে তাকে অধিক গুরুত্ব দেয়। উল্লেখযোগ্য যে, ওয়াসিমের মৃত্যুর দিন একই স্থানে আরও দুইজন নিহত হয়; অর্থাৎ সেদিন মোট তিনজনের মৃত্যু ঘটে। তবুও ওয়াসিমকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়, কারণ তিনি ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
দ্বিতীয় প্রধান সংঘাতের কারণ ছিল আসন্ন ডাকসু নির্বাচন। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিবিরের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগতভাবে শিবির-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের চিনলেও তাদের সাংগঠনিক পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিল না, ফলে তাদের প্রতি একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়। একাডেমিক দক্ষতা, সহপাঠ্য কার্যক্রম, সৃজনশীল উদ্যোগ, উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং তুলনামূলকভাবে তরুণ নেতৃত্বের কারণে শিবিরের প্রতি এই আস্থা আরও দৃঢ় হয়। অন্যদিকে, ছাত্রদলের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সভাপতি গনেশকে বাদ দিয়ে আবিদকে ভিপি প্রার্থী করা হয়, যার পেছনে যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে জুলাই আন্দোলনের সময় আবিদের একটি আবেগপূর্ণ ভিডিও জনমনে প্রভাব ফেলেছিল। যদিও গনেশসহ অন্যান্য নেতারা আন্দোলনে উপস্থিত ছিলেন, তবে নেতৃত্বের কেন্দ্রে না থাকায় তাদের প্রতি আস্থা কম ছিল। ফলে আবিদকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবের কারণে আবিদ পর্যাপ্ত সমর্থন পায়নি এবং দলটি নির্বাচনে পরাজিত হয়। বিপরীতে, শিবির একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল, মেধাবী ও সক্রিয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং ব্যাপক বিজয় অর্জন করে। এই ফলাফল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদলের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এই দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদল শিবিরকে “গুপ্ত” আখ্যা দিয়ে সমালোচনা শুরু করে।
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি সংঘাত খুব বেশি ছিল না। উভয় দলের বহু নেতা অতীতে একসঙ্গে কারাবাস করেছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্কের অবনতি লক্ষ্য করা যায়। শেখ হাসিনার শাসনের অবসানের পর বিএনপিকে সম্ভাব্য প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা জনমনে নতুন সংশয় সৃষ্টি করেছে। একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে জামায়াতের পক্ষে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা কাঠামোগতভাবে কঠিন, তবে বিএনপির অতীত রাজনৈতিক আচরণ তাদের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে। ১৯৯৬ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর ইস্যু এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আচরণের মিল যেমন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ এই সংশয়কে আরও জোরদার করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, যদি বিএনপি সম্পর্কে এমন ধারণা থাকে, তবে তারা কীভাবে ক্ষমতায় আসে। একটি হাইপোথেটিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী বলা হয় যে বিএনপি সরাসরি ভোটে নয়, বরং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, ভোটের দিন বিকেল থেকেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। জামায়াত প্রথমে নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চাইলেও দেশের সুশীল সমাজ, তথাকথিত ডিপ স্টেট এবং আন্তর্জাতিক শক্তির একটি অংশ তা সমর্থন করেনি। অন্যদিকে, তুরস্কসহ কিছু ইসলামী দেশ জামায়াতকে সমর্থন করছিল, বিপরীতে ভারত, রাশিয়া এবং অন্যান্য কিছু দেশ বিএনপির পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে জামায়াতকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জটিলতা সম্পর্কে বিভিন্ন হাইপোথেটিক উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, যেমন বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, অভিজ্ঞতার প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়।
অন্যদিকে, জামায়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয় যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অনিবার্য, যেমনটি ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের পরবর্তী সময়গুলোতে দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ধারণা করা হয় যে যে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে ব্যর্থ হতে পারে এবং এতে শাসক দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বিরোধী দলে অবস্থান করাকে কৌশলগতভাবে অধিক লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তীতে দুই দলের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়, যার মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গুম কমিশন গঠন, সংবিধান সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিএনপি এসব শর্ত মেনে নেয় এবং নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে; জামায়াতও ফলাফল মেনে নেয় এবং কোনো সংঘাত ছাড়াই বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে দেয়।
তবে মন্ত্রিসভা গঠনকে কেন্দ্র করে নতুন করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে আপত্তি ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে সালাউদ্দিনকে একটি প্রভাবশালী অবস্থানে দেখা হয় এবং তাকে ডি-ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে তারেক জিয়াকে তুলনামূলকভাবে প্রতীকী ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত নীতিসমূহ যেমন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, কাঠামোগত সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকর করা বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে বিএনপি আন্তর্জাতিক প্রভাব, বিশেষত ভারতের নীতিগত প্রভাবের দিকে ঝুঁকেছে বলে সমালোচনা করা হয়। এর ফলে জামায়াত পুনরায় মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ন্যারেটিভ সংঘাত আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দ্বন্দ্ব কমার সম্ভাবনার তুলনায় বৃদ্ধির সম্ভাবনাই অধিক বলে প্রতীয়মান হয়।
(বিঃদ্রঃ উপরের আলোচনাটি সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত মতামত ও হাইপোথেটিক বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত; আলোচিত ঘটনাবলি সত্য অথবা ভুল বা অভিন্ন হতে পারে।)