14/06/2026
বিশ্বকাপের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই শুরু হতে যাচ্ছে এই গ্রহের সবচেয়ে বড় ‘কলেক্টিভ ব্রেনওয়াশ’ প্রজেক্ট। এটি কেবল একটা টুর্নামেন্ট নয়, এটি মূলত কোটি কোটি মানুষকে একসাথে বুদ্ধিহীন জম্বিতে পরিণত করার একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সফল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদল মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভিনদেশী কিছু ক্লাবের জন্য নিজের খাওয়া-দাওয়া, রাতের ঘুম, দৈনিক ইবাদত, স্বাভাবিক কর্মজীবন আর ন্যূনতম কমনসেন্স বিসর্জন দিয়ে দেবে। যে সময়টা নিজের ক্যারিয়ার, পরিবার বা উম্মাহর সংকটে কাজে লাগতে পারত, সেটা উৎসর্গ করা হবে টিভির বোকা বাক্সের সামনে।
স্রেফ একটা চামড়ার বলের পিছে ২২টা কোটিপতির দৌড়ানি দেখার জন্য এদেশের মানুষ নিজের ভাই, নিজের বন্ধু আর প্রতিবেশীর সাথে পাগলা কুকুরের মতো কামড়াকামড়িতে লিপ্ত হবে। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের মতো সুদূর দূরত্বের দুটি "কুফফার" (অবিশ্বাসী) দেশের পতাকা নিয়ে মুসলিম প্রধান এই দেশে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, তা জাহেলিয়াতের আধুনিক সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। কেউ বাপের জমি বেঁচে কিলোমিটার লম্বা ভিনদেশী পতাকা টাঙাবে, আবার কেউ ওই সস্তা প্লাস্টিকের কাপড় বাঁশের মাথায় বাঁধতে গিয়ে ছাদ কিংবা গাছ থেকে পড়ে লাশ হয়ে ফিরবে। যে দেশের মানুষ নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব বা অধিকার নিয়ে কখনো রাস্তায় নামে না, তারা লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের জন্য রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে দ্বিধা করে না। আহারে আফসোস এই জাতির জন্য!
রোমান সাম্রাজ্যের সেই কুখ্যাত ‘ব্রেড অ্যান্ড সার্কাস’ (জনগণকে সস্তা রুটি আর সার্কাসের বিনোদন দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার থেকে দূরে রাখা) টেকনিক আজ আরও নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই উন্মাদনায় আপনাদের চোখ এমনভাবে বেঁধে দেওয়া হবে, যাতে দুনিয়ার আসল ক্রাইমগুলো চোখের আড়াল হয়ে যায়। আপনারা যখন টিভির সামনে বসে পপকর্ন চিবাবেন আর প্রিয় দলের জয়ে হুল্লোড় করবেন, তখন ব্যাকস্টেজে চলতে থাকা জেনোসাইডের রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলা হবে গ্ল্যামারের আলো দিয়ে।
আপনারা ভুলে যাবেন ইরানের স্কুলগুলোতে নিষ্পাপ শিশুদের ওপর চালানো সেই রাষ্ট্রীয় বর্বরতা। উন্মাদনার এই সস্তা আফিম খেয়ে আপনারা ভুলে যাবেন ভারতের একটা একটা করে ঐতিহাসিক মসজিদ ভেঙে কীভাবে সেখানে রামরাজ্যের মন্দির বানানো হচ্ছে। উইঘুর মুসলিমদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আর্তনাদ, কাশ্মীরের খাঁচায় বন্দি মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আর ইরাক-ফিলিস্তিনের লাশের মিছিল—সবকিছু এই এক মাসের ফুটবল শো-ডাউন দিয়ে স্ক্রিনআউট করে দেওয়া হবে। মিডিয়া ট্রিলিয়ন ডলারের হাইপ তুলে এমন এক কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করবে, যেখানে ফিলিস্তিনের শিশুর লাশের চেয়ে মেসির পায়ের জাদু বা নেইমারের ডাইভিং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিজেদের খুব স্পোর্টিং, মডার্ন আর প্রোগ্রেসিভ ভাবেন তো? আসলে আপনারা হলেন গ্লোবাল পলিটিক্সের সেই বোকার হদ্দ খদ্দের, যাদেরকে সস্তা এন্টারটেইনমেন্টের ট্যাবলেট খাইয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় ট্র্যাজেডিগুলো ভুলিয়ে দেওয়া হয়। লাখ লাখ মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে যখন ওই সোনার ট্রফি উঁচিয়ে ধরা হবে, তখন আপনারা উল্লাস করবেন! এর চেয়ে বড় হিপোক্রিসি আর ব্রেন-ডেড জেনারেশনের উদাহরণ এই মহাবিশ্বে আর দ্বিতীয়টা নেই।
ইসলামি বিশ্বাসের প্রেক্ষাপট থেকে যদি আমরা এই বৈশ্বিক উন্মাদনাকে বিশ্লেষণ করি, তবে একে 'দাজ্জালি ফিতনা' বা শেষ জামানার বিভ্রান্তির একটি স্পষ্ট ট্রেইলার বলা যায়। শেষ জামানায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের পূর্বে তার জন্য যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে, এটি তারই অংশ।
দাজ্জালি ফিতনা = সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন:
"তার সাথে জান্নাত এবং জাহান্নামের মতো দুটি নদী থাকবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার জান্নাত হবে জাহান্নাম এবং তার জাহান্নাম হবে জান্নাত।" (সহীহ মুসলিম)
আজকের গ্লোবাল মিডিয়া ও বিনোদন জগৎ হুবহু এই কাজটিই করছে:
মিথ্যা জান্নাত: ফুটবল, কনসার্ট, আর কর্পোরেট গ্ল্যামারকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন এটাই জীবনের পরম পাওয়া (মিথ্যা জান্নাত)।
প্রকৃত জাহান্নাম: এই মেকি আনন্দের আড়ালে মানুষ ভুলে যাচ্ছে তার পরকাল, ভুলে যাচ্ছে আল্লাহর ইবাদত এবং উম্মাহর ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতাকে (প্রকৃত জাহান্নাম)।
দাজ্জালের অন্যতম প্রধান শারীরিক ও প্রতীকী বৈশিষ্ট্য হলো সে হবে 'কানা' বা এক চোখা। বর্তমান বৈশ্বিক মিডিয়া এবং এই ফুটবল ইন্ডাস্ট্রি অবিকল এক চোখা নীতিতে চলে। তাদের এক চোখ কেবল বিনোদন, মুনাফা আর কৃত্রিম উত্তেজনা দেখে। কিন্তু দুনিয়ার অন্য প্রান্তে যে লাখ লাখ মুসলিম শিশু ক্ষুধার্ত অবস্থায় বোমাবর্ষণের নিচে ঘুমাতে যাচ্ছে, সেই সত্য দেখার চোখ এই সিস্টেমের নেই। এটি মানবজাতির চেতনাকে এমনভাবে অন্ধ করে দেয়, যাতে মানুষ শুধু বস্তুগত আনন্দ চেনে, কিন্তু আধ্যাত্মিক ও মানবিক বিপর্যয়গুলো দেখতে পায় না।
হাদিসে এসেছে, দাজ্জালের হাতে এমন কিছু জাদুকরী ক্ষমতা বা সম্পদ থাকবে যার মোহে পড়ে দলে দলে মানুষ তার অনুসারী হবে, বিশেষ করে নারী ও যুবসমাজ তার পেছনে অন্ধের মতো ছুটবে। আজকের ফুটবল বিশ্বকাপ বা বিনোদন জগতও ঠিক একইভাবে যুবসমাজকে সম্মোহিত করে রেখেছে। মানুষ নিজের বিবেক, বুদ্ধি, এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ হারিয়ে এমন সব তারকাকে আইডল বা 'গড' (যেমন: ফুটবল গড) বানিয়ে নিচ্ছে, যারা ইসলামের ঘোর বিরোধী এবং কুফরি সংস্কৃতির ধারক-বাহক।
যে উম্মাহর যুবকদের হওয়ার কথা ছিল সালাহউদ্দিন আইয়ুবি বা মুহাম্মদ বিন কাসিমের মতো মজলুমের ঢাল, তারা আজ লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের অন্ধ ভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি করছে। দাজ্জাল আসার আগেই যদি একটি চামড়ার বল দিয়ে পুরো মুসলিম জাতিকে এভাবে বশ করে ফেলা যায়, তবে আসল দাজ্জাল যখন তার জাদুকরী শক্তি নিয়ে হাজির হবে, তখন এই পপকর্ন চিবানো জেনারেশন কত সহজে তার পায়ে সিজদা দেবে, তা ভেবে শিহরিত হতে হয়।
আহারে আফসোস! দাজ্জালের তৈরি করা এই সুনিপুণ খাঁচায় বন্দি হয়ে আমরা হাসছি, খেলছি আর নিজেদের ধ্বংসের উৎসব করছি। চেতনা ফিরে পাওয়ার সময় এখনই, নয়তো এই মহাজাগতিক ব্রেনওয়াশ প্রজেক্টের ভেতরেই একদিন আমাদের চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে হবে।