02/09/2026
প্রবাস জীবনের গল্প — পর্ব ১
আমারও মন খারাপ হয়।
তবে কিসে হয়, কেন হয়—সেই গল্পটা হয়তো একদিন বলব। যদি কোনোদিন আমারও সময় আসে, যদি কোনোদিন কেউ সত্যিই জানতে চায়, একজন মানুষ তার হাসির আড়ালে কতটা গল্প লুকিয়ে রাখতে পারে।
আমি মানুষটা একটু ভিন্ন।
প্রচণ্ড মন খারাপের সময় আমার খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। খুব দামি কোনো উপহার নয়, বড় কোনো আয়োজনও নয়। আপন কোনো মানুষ যদি একটু কাছে এসে জিজ্ঞেস করে—
“কী হয়েছে?”
তাহলেই হয়তো বুকের ভেতর জমে থাকা অনেকটা ভার হালকা হয়ে যায়।
আমার কাছে আপন মানুষের দেওয়া সামান্য সান্ত্বনাও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়গুলোর একটি।
জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল। অনেক কিছু হওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে কত স্বপ্ন যে নিঃশব্দে বিসর্জন দিয়েছি, তার কোনো হিসাব রাখিনি।
তারা হয়তো জানেও না।
হয়তো ভাবে, আমি এমনই। সবকিছু সহজে মেনে নিই, সবকিছু সামলে নিই।
কিন্তু মানুষ কি আর সবকিছু সত্যিই সহজে মেনে নেয়?
কিছু কষ্ট শুধু কাউকে দেখানো হয় না।
কিছু কান্না চোখ পর্যন্ত আসে না।
আর কিছু অভিমান শব্দ হওয়ার আগেই বুকের ভেতর চাপা পড়ে যায়।
কারও কাছে আমি খুব ভালো একজন মানুষ। আবার কারও কাছে হয়তো উগ্র, বদমেজাজী কিংবা কঠিন স্বভাবের।
তাতে আমার খুব একটা অভিযোগ নেই।
কারণ একটা মানুষ সবার কাছে ভালো হতে পারে না। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটাকেও কেউ না কেউ ভুল বুঝবে—এটাই হয়তো মানুষের স্বাভাবিক নিয়ম।
তবে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই নিজেকে বড় অযোগ্য মনে হয়।
মনে হয়, আমি যেন এমন একজন মানুষ, যে অন্যের ভালো চেয়েই নিজের অনেক কিছু ভুলে যায়। অন্যের মুখে হাসি দেখার জন্য নিজের কষ্টটাকে আড়াল করে রাখে।
কিন্তু দিনশেষে নিজের দিকে তাকালে দেখা যায়—নিজের জন্য তেমন কিছুই রাখা হয়নি।
কিছু মানুষ আমাকে বুঝতে চায়।
আবার কিছু মানুষ হয়তো তাদের ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা নিজেদের পৃথিবীর ভেতর এতটাই ডুবে থাকে যে আমার নীরবতাটুকুও তাদের চোখে পড়ে না।
আমি কাউকে দোষ দিই না।
কারণ প্রত্যেক মানুষেরই নিজের মতো করে বেঁচে থাকার গল্প আছে।
শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাকেও যদি কেউ একটু বুঝত!
আমি আমার আপন মানুষগুলোর কাছে সবসময় ভালোবাসাটাই চেয়ে এসেছি।
খুব বেশি কিছু নয়।
একটু বিশ্বাস।
একটু গুরুত্ব।
আর এমন একটা অনুভূতি—
আমি একা নই।
কিন্তু জীবন সব চাওয়া পূরণ করে না।
কিছু চাওয়া থেকে যায়।
কিছু মানুষ থেকে যায় দূরে।
কিছু সম্পর্ক থেকে যায় অসম্পূর্ণ কিছু কথার ভেতর।
আর কিছু মানুষকে যতটা আপন ভাবা হয়, তাদের কাছে নিজের জায়গাটা ঠিক ততটা আপন কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না।
আজ প্রবাস জীবনের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো।
পাঁচ বছর!
শুধু একটা সংখ্যা নয়। এই পাঁচ বছরের ভেতর দিয়ে যেন আমার একটা গোটা জীবন হেঁটে গেছে।
এই প্রবাস আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
শিখিয়েছে দায়িত্ব কী।
শিখিয়েছে অপেক্ষা কী।
শিখিয়েছে দূরত্ব কতটা দীর্ঘ হতে পারে।
আর সবচেয়ে বেশি শিখিয়েছে—কিছু মানুষকে হারানোর পর তাদের মূল্য বোঝার জন্য পৃথিবীর কোনো ভাষাই যথেষ্ট নয়।
এই পাঁচ বছরে নানিকে হারিয়েছি।
শেষবার তার মুখটা দেখে বিদায় বলার সুযোগটুকুও আমার কপালে জোটেনি।
কখনো কখনো সবচেয়ে বড় কষ্টটা মৃত্যু নয়—
শেষবার পাশে থাকতে না পারা।
আমার একটা ছোট্ট ভাগিনা ছিল।
আমি যখন প্রবাস নামের এই ব্যস্ত জীবনে এসেছিলাম, তখন তার বয়স মাত্র দুই মাস।
ভাবতাম, একদিন ফিরে যাব।
তাকে বড় হতে দেখব।
কোলে নেব।
হয়তো সে আমাকে চিনবে, আমার সঙ্গে খেলবে।
কিন্তু জীবনের সব “একদিন” আর আসে না।
নয় মাস আগে তাকেও হারিয়ে ফেলেছি।
দাদিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
এক এক করে আপন মানুষগুলো চলে গেল।
আর আমি দূরদেশের এক শহরে দাঁড়িয়ে বুঝলাম—
মানুষ যত দূরেই যাক, কিছু শূন্যতা তার সঙ্গে সঙ্গেই চলে যায়।
টাকা দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়।
কিন্তু নানির শেষ দেখা যায় না।
ভাগিনার শৈশব ফিরে পাওয়া যায় না।
দাদির পাশে বসে থাকা বিকেলগুলোও আর ফিরে আসে না।
তবুও জীবন থেমে থাকে না।
সকাল হয়।
কাজে যেতে হয়।
হাসতে হয়।
কথা বলতে হয়।
সবাইকে বোঝাতে হয়—
আমি ভালো আছি।
অথচ কিছু রাত আসে, যখন নিজের কাছেই এই মিথ্যেটা বলতে কষ্ট হয়।
তখন মনে হয়, এত মানুষের ভিড়েও মানুষ আসলে কতটা একা!
আর ঠিক এই জায়গাটাতেই আমার গল্পে একজন মানুষ এসে দাঁড়ায়।
খুব বেশি কিছু নিয়ে নয়।
কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নিয়ে নয়।
শুধু একজন প্রিয় মানুষ হয়ে।
যার কাছে হয়তো আমার অনেক কথা বলা হয়নি।
যার কাছে হয়তো আমার কিছু অভিমান পৌঁছায়নি।
হয়তো আমার নীরবতার অর্থও সবসময় বোঝানো হয়ে ওঠেনি।
তবুও মনের ভেতর তার জন্য একটা জায়গা আলাদা করে রাখা আছে।
কারণ পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকে, যাদের উপস্থিতি জীবনের সব কষ্ট মুছে দেয় না—
কিন্তু কষ্টের মাঝেও বেঁচে থাকার একটা কারণ হয়ে থাকে।
সে হয়তো জানে না, তার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য একটু সান্ত্বনাও আমার কাছে কতটা মূল্যবান।
হয়তো জানে না, তার একটু ভালো করে কথা বলা আমার একটা খারাপ দিনকে কত সহজে ভালো করে দিতে পারে।
হয়তো সবসময় আমাকে বুঝতে পারে না।
হয়তো আমিও সবসময় নিজেকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারি না।
তবুও তার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু একটা নীরব চাওয়া আছে—
যদি কোনোদিন আমার চোখের হাসির আড়ালে জমে থাকা ক্লান্তিটুকু সে দেখতে পায়, তাহলে যেন একবার শুধু বলে—
“তুমি একা নও, আমি আছি।”
হয়তো সেই একটা বাক্যই আমার পাঁচ বছরের প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হয়ে থাকবে।
চলবে…