30/09/2023
ডেলিভারীর পর যখন জ্ঞান ফিরে তখন রূপন্তির শ্বাশুড়ি মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
--- আল্লাহর রহমতে তোর একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে রে মা।
ওর মা অপর পাশে বসে শুকনো হাসলেন। বাবা হয়তো বাইরে ডাক্তারের সাথে কথা বলছে। বাবু কোলে নিয়ে ওর ননদ রাহা উৎফুল্ল হয়ে বলল,
--- ভাবি দেখো কেমন ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একেবারে ভাইয়ার মতো হয়েছে। ভাইয়া,,,,,,
শ্বাশুড়ি মা রাহাকে ধমক দিয়ে বলে, বেশি কথা না বলে বাচ্চাটাকে রূপন্তির কাছে দে। ও একটু ছুঁয়ে দেখুক ওর মেয়েকে। রূপন্তি তোর মেয়েকে খাওয়া।
অথচ সে তাকিয়ে আছে দরজার পানে। কাঙ্খিত মানুষটাকে দেখার জন্য। তাকে হতাশ করে শুধু তার বাবাই আসলেন কেবিনে। আচ্ছা মানুষটার কাছে তার অতীত এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে নিজের ঔরসজাত সন্তানকেও দেখতে আসলো না৷ তাকে না হয় ভালো নাই বা বাসে তাই নিজের মেয়েটাকেও দেখতে আসলো না৷ এসব কথা ভেবে বাবার দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে দিলো সে। বাবা তার হাত ধরে বললো,
--- আমাকে মাফ করে দিস মা। আমি ভুল মানুষের হাতে তোকে তুলে দিয়েছি। এই নিয়ে হাজার বার কল করেছি রাফাতকে। সে একবারো রিসিভ করে নাই। একজন অসহায় মায়ের কথা চিন্তা করে আমি তোর জীবনটাকে শেষ করে দিলাম।
ওর মা শব্দহীন কান্না করছে। বাবার কথায় ভেতরে তোলপাড় চলছে রূপন্তির । ওর জীবনটা কেন এভাবে অবহেলায় জর্জরিত হলো? এসব কথাই ভাবছে সে।
এইদিকে এসব কথা শুনে রূপন্তির শ্বাশুড়ি আর ননদ কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন। তিনি রাহা কে বললেন,
--- ফোন কর রাফাতকে। অনেক হয়েছে আর না। ওই মেয়েটার জন্য সে রূপন্তিকে এভাবে অবহেলা করতে পারে না।
রাহা দুইবার কল করে রাফাত এর নাম্বারে। কিন্তু সে কেটে দিয়েছে।
তিনি আবার কেবিনে গিয়ে রূপন্তির হাত ধরে বলে,
--- পারলে এই বুড়ো মানুষটাকে মাফ করে দিস। ছেলের ছন্নছাড়া জীবন কোনো মা মেনে নিবে না। ওর সুখের কথা চিন্তা করে তোকে বউ করে এনেছিলাম। ভাবিনি সে অতীত থেকে বের হতে পারবে না। তুই তোর মেয়েটাকে নিয়ে নিজের বাড়ি চলে যাস।
বলেই চলে গেলো বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখেন রাফাত উপুর হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছ। কোনো কিছু না ভেবেই রাফাতকে টেনে তুলে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় দিলেন। রাফাত অবাক হয়ে ওর মা কে দেখছে।
তিনি চেচিয়ে বললেন,
--- যে মেয়েটাকে এতো ভালোবাসার পরও তোমাকে বিয়ে করার ৩ দিন পর আরেকজনের হাত ধরে চলে গেছে তার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করছিস।আর যে মেয়েটা তোর একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন হাজার অবহেলা পেয়েও মাটি কামড়ে পড়ে ছিলো তার কোনো দাম নাই? হাসপাতালে নিজের নবজাতক মেয়েটাকে অন্তত দেখতে যেতে। তোমার কথা চিন্তা করে করে আমি ওই মেয়েটার জীবন নষ্ট করে দিলাম। তোর অতীত এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ হলে আরেকটা নতুন প্রান কেন দুনিয়ায় আনলি?? মনে রাখবি হাতের পাঁচটা আঙুল সমান না।
রাহা বলে,
--- ভাইয়া তুমি আমার অনেক বড় ভয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতাম না।কিন্তু আজ বাধ্য হচ্ছি ভাইয়া দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝতে হয়। দাঁত পড়ে গেলে সেই দাঁত স্বর্ণ দিয়ে বাঁধাইলেও লাভ হবে না।এখনো সময় আছে। নিজের #সুখের_খনি হাত ছাড়া করো না। রাহা আর ওর মা চলে গেলো।
নিজের মেয়ে হয়েছে শুনে মুচকি হাসলো সে। রাফাতের ছোটবেলা থেকেই বাচ্চা পছন্দ। ছোট ছোট হাত পা তার ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকা খুব মিষ্টি লাগে তার কাছে।তানিয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো সে। বিয়ের ৩ দিন পর আরেকজনের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিল সে। ৬ মাস পরে ডিবোর্স পেপার আর একটা চিঠি পাঠায়। চিঠিতে লেখা ছিলো,
--- "রাফাত আমি ভেবেছিলাম তুমি খুব বিত্তবান। তোমার এটিটিউড চলাফেরা এমনটাই মনে হয়েছিল। বিয়ের দিন তোমার বাড়িতে পা দিয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি ল্যাক্সারিয়াস লাইফ চেয়ে ছিলাম। তোমার সাথে থাকা আমার সম্ভব না। বিয়ের মাস খানিক আগে একজনের সাথে পরিচয় হয়। সে আমাকে বিয়ের কথা বলেছিল।ভেবেছিলাম তুমি তার থেকেও বিত্তবান। সেজন্য তাকে আমি রিজেক্ট করেছি। তার হাত ধরেই পালিয়ে এসেছি। তার যথেষ্ট সম্পদ আছে। বিত্তবান সে। দয়া করে সাইন করে আমাকে মুক্তি দিও।"
চিঠি পড়ে সাথে সাথে সে সাইন করে দিয়েছিল। ভালোবাসা আর মেয়েদের উপর থেকে তার বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। তার কাছে মেয়ে মানে অর্থলোভি। তার বাঁচার ইচ্ছেটাও মরে গিয়েছিল। শুধু মা আর বোনের কথা চিন্তা করে ছন্নছাড়া জীবন পার করতো। আজ মেয়ে হয়েছে শুনে বাঁচার ইচ্ছে জাগছে। আচ্ছা তার ওই ছোট্ট মেয়েটা কার মতো হয়েছে? রাহাকে জিজ্ঞেস করবে?
বিয়ের ৪ মাস পরে প্রচন্ড এক ঝড়ের রাতে রাফাত রূপন্তিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বললো,
--- একটু ভালোবাসবে আমাকে? আমি যে ভালোবাসার কাঙ্গাল। আমি একটু ভালোবাসা চাই।
বিয়ের পর এটাই তাদের প্রথম কাছে আসা ছিলো। একজন আরেকজনকে ছুঁয়ে ছিল খুব গভীরভাবে। সকাল বেলা বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে নিজের অবস্থা দেখে আর সদ্য গোসল করে আসা রূপন্তির গলায় চিহ্ন দেখে বুঝতে বাকি ছিলো না রাতে কি হয়েছিল। খুব চেচিয়ে ছিলো রূপন্তির উপর। রূপন্তির বুঝতে বাকি নেই যে রাতে রাফাত ড্রাংক ছিলো। কারণ প্রথম রাতেই বলেছিল তার থেকে যেন রূপন্তি দূরে দূরে থাকে। সে মেয়েদের বিশ্বাস করে না। এরপর মাস দুয়েক পরে জানতে পারে তার ভেতরে আরেকটা অস্তিত্বের কথা। ভেবেছিলো খবরটা শুনে রাফাত খুশি হবে। এবার সে সুখের মুখ দেখবে কিন্তু খবরটা শুনে রাফাত শুধু ওহ বলেছিল। ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো মেয়ের কান্নার শব্দে।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসছে আজকে ২ মাস। রাফাত একবার দেখতেও আসে নাই কলও করে নাই। ওর শ্বাশুড়ি রোজ খবর নেয়। মেয়েকে খাওয়াচ্ছিলো রুপন্তি, ওর মা এসে বললো নিচে একজন ওর সাথে দেখা করতে এসেছে। এই ঝড় বৃষ্টির রাতে কে আসলো দেখা করতে সেটা ভাবতে ভাবতে মেয়েকে দোলনায় রেখে নিচে গেলো সে। মানুষটাকে দেখে চমকে উঠলো সে। কেমন বিধ্বস্ত অবস্থায় কাকভেজা হয়ে বাবার সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে সে। রূপন্তির বাবা রূপন্তিকে দেখে বললো,
--- তোমাকে সে নিতে এসেছে। তোমার কি মতামত??
--- তুমি যা বলবে তাই হবে। কখনো তোমার কথার অবাধ্য আমি হইনি।
--- তোমার স্বামী আমাকে বাবা সন্তানের ভালোবাসা বুঝাচ্ছে। অথচ সে জানে না তোমার মা যখন তোমাকে পেটে নিয়ে প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল আমি তখন নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কষ্ট কমানোর জন্য দোয়া করছিলাম। সবার আগে আমি তোমাকে কোলে নিয়ে ছিলাম। তোমরা সন্তানের বাবা মা হয়েছো দেখো কি করবা। আর ওকে ফ্রেশ হতো বলো। না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে। হাজার হউক বন্ধুর ছেলে তার ওপর আবার মেয়ের জামাই।
ফ্রেশ হয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে তার সে কি কান্না। দুই ঘন্টা হয়ে গেছে এখনো মেয়েকে কোল থেকে নামায় নাই।
রাত ১২ টা!
মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে রাফাত বারান্দায় গেলো রূপন্তির কাছে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলতে লাগলো,
--- আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইবো না। সেই মুখ আমার নেই। আমাকে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? শুধু একটা সুযোগ। রূপন্তিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার বলে, আমার #সুখের_খনি নীড়ে রেখে আমি মরীচিকার পিছনে ছুটেছি। আমি তোমাদের নিয়ে বাঁচতে চাই।
রাফাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সে বলে,
--- প্রেগন্যান্সির সময়টা প্রত্যেকটা মেয়ে তার প্রিয় মানুষটাকে কাছে চায়। তাকে একটু সাহস দিবে ভরসা দিবে। নির্ঘুম রাতগুলো তার সঙ্গ দিবে। কিন্তু আমি সেই মানুষটাকে পাশে পাইনি। সে তার অতীত নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। হাসপাতালেও আমি তার অপেক্ষায় ছিলাম ভেবেছিলাম সে আসবে আর বলবে, কিছু হবে না তোমার আমি আছি তো। তুমি আর আমাদের সন্তান সুস্থ ভাবে আসবে। কিন্তু সে আসে নাই। শারীরিক কষ্টের থেকে মানসিক যন্ত্রণা বেশি অনুভব করেছিলাম। আমি সেই দিনগুলো ফিরে পাবোনা।
রাফাত হাঁটু গেড়ে বসে রূপন্তির পেট জড়িয়ে বললো,
--- আমি বেস্ট বাবা আর বেস্ট হাসবেন্ড হয়ে দেখাবো। আমার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে একটা সুযোগ দাও। মানুষই তো ভুল করে । ভুল সংশোধনের সুযোগ দাও। তোমার যদি মনে হয় আমি তোমাকে অবহেলা করছি সেদিন আমাকে ছেড়ে দিও। শেষবার একটা সুযোগ চাইছি প্লিজ।
পরদিন বাবা মার থেকে বিদায় নিয়ে রূপন্তি চলে গেলো শ্বশুর বাড়ি। রাহা তো ভাইয়ের মেয়েকে পেয়ে খুশিতে ডগমগ করছে। রাফাত ঘুমোচ্ছে এসে। আর রূপন্তি রান্না ঘরে গেলো শ্বাশুড়ির কাছে। তিনি রূপন্তিকে দেখে বলে,
--- আমি খুব খুশি হয়েছি তুই ফিরে এসেছিস। বুঝলি রূপু দুরত্বে গুরুত্ব বাড়ে যদি সে তোকে ভালোবাসে। রাফাত যে তোকে ভালোবাসে বুঝতে পারে নাই। যখন দুরত্ব বাড়লো তখন বুঝলো। পরশু দিন এসে আমাকে বলে তার স্ত্রী আর মেয়েকে এনে দিতে। স্ত্রী আর মেয়েকে আর অবহেলা করবে না। তাদের খুব প্রয়োজন নাকি তার। শূন্যতা আর অপরাধবোধ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তাকে বললাম যে, ওরা তোমার প্রয়োজন নাকি প্রিয়জন?? প্রিয়জন হলে ক্ষমা চেয়ে ফিরিয়ে আনো আর প্রয়োজন হলে দরকার নাই। ছেলেটা আমার আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলে, ওরা শুধু আমার প্রিয়জন না একান্ত আপনজন। প্রিয়জন বলেই ওদের প্রয়োজন। আমার মেয়েটাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে আদর করতে ইচ্ছে করে। ওরা ফিরে আসবে তো?? সেজন্য বলেছি দেরি না করে নিয়ে এসো তাদের। যদিও তোর বাবার সাথে আমি আগেই কথা বলেছিলাম। অনেক বুঝানোর পরে ওনি মানলেন।
--- তাই তো বলি বাবা চুপচাপ আসতে দিলো কেন।
--- তোর শ্বশুর বেঁচে থাকলে এমনটা হতো না। মজার ব্যপার কি জানিস?? আমি যে রোজ তোকে কল করতাম রাফাত আমার পাশে বসে থাকতো।
রাতের খাবার শেষ করে মেয়েকে কোলে নিয়ে রুমে গিয়ে দেখে রাফাত ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, আমরা মা মেয়ে কোথায় থাকবো?
--- কেন বিছানায়।
--- আর আপনি কোথায় শোবেন?
--- আমিও বিছানায় থাকবো। একবার ভুল করেছি আর করবনা। হয়তো দেড় বছরের সময়টা আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না আমি চেষ্টা করবো এর থেকে ভালো মুহূর্ত তোমাকে দেওয়ার জন্য। আমি তোমার কাছে চির কৃতজ্ঞ তুমি যে আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছো। তুমি যেদিন মন থেকে আমাকে কাছে ডাকবে সেদিন আমি তোমার কাছে যাবো। সেদিনই বুঝবো তুমি আমাকে ক্ষমা করেছো।এখন ঘুমিয়ে পড়ো। যেকোনো একপাশে আমার জন্য জায়গা রাখলে হবে।
বারান্দায় গেলো সে।রূপন্তি মেয়ে কে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। মধ্যরাতে বারান্দা থেকে রুমে এসে স্ত্রী আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে দুজনের কপালে চুমু দিয়ে বলল, আমার ুখের_খনি। আমার আবার বেঁচে থাকার কারণ। ভুল করেছি মরীচিকার পিছনে ছুটে। আর সে পথে যাবো না। তোমাদের নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করবো। মেয়ের অন্য পাশে শুয়ে পড়লো।
-------- #সমাপ্ত
#অণুগল্প
ুখের_খনি
#সংগৃহীত