03/06/2024
"একটি নিভে যাওয়া প্রদীপ"
_____________________________________________
""""
*রোদেলা খরস্রোতা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো চঞ্চল,নিশীথ রাত্রির নির্জনতার মতই মনোভাব,ধূসর মেঘের মতো কোমলমতি হৃদয়। রূপে,গুণে অনন্যা। গ্রামের স্কুলের ফাস্ট গার্ল কখনো দ্বিতীয় হয়নি।প্রতিটি শ্রেণীতে তার একক আধিপত্য।তার কলেজ জীবনও গ্রামে কাটিয়েছে।সেখানে ও তার বাগবৈদগ্ধময় সাফল্য।বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি দুটোতেই গোল্ডন জিপিএ ফাইভ।মূলত গ্রামের আলো বাতাস,ছায়া ও সুনিবিড় পরিবেশেই তার বেড়ে উঠা।বাবা মায়ের একমাত্র আদরের রাজকুমারী রোদেলা।
তার বাবা করিম সিকদার খুবই সজ্জন মানুষ গ্রামের সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে।অত্যান্ত প্রতাপশালী লোক।পূর্ব পুরুষরা জমিদার ছিলেন।যাই হোক রোদেলার বাবার অনেক শখ মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন।তাছাড়া মেয়ে যখন পড়ালেখায় ভালো বাবা হিসেবে এতটুকু আশা করতেই পারেন।সে লক্ষে তিনি রোদেলাকে মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাওয়ার জন্য গ্রামের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিলেন।রোদেলাও সে ভাবে প্রস্তুতি নিতে লাগলো।বাবার আশা পূরণ করতে হবে।অত:পর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে রোদেলা সেই সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেল।এবং সে মেডিকেলে চান্স পেয়েছে,মেধা তালিকায় একশো পনের তম।তাই সে ঢাকা মেডিকেলে কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।গ্রামে ধূম পড়ে গেল।সবাই রোদেলাকে দেখতে আসতে লাগলো।কারন তখনও পর্যন্ত তাদের গ্রামে আর কেউ সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পায়নি,তাও আবার প্রথম সারিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ। বুঝেনই তো,রোদেলা আবেগ আপ্লুত হয়ে গেল।
"""""
*যাইহোক তার কিছুদিন পর ভর্তি হওয়ার তারিখ নির্ধারন করা হলো। রোদেলা আগে কখনো ঢাকা আসেনি তাই তার বাবা তাকে নিয়ে আসলো।তারা ঢাকাতে তাদের এক আত্মিয়ের বাসায় উঠলো।সেখানে থেকেই রোদেলা মেডিকেলে ভর্তি হলো।কিছুদিন পরেই মেডিকেলের হোস্টেলে গিয়ে উঠার সুযোগ ফেলো রোদেলা।
তার বাবা চলে যাবে বাড়িতে অনেক কাজ,তাই চলে যেতে হবে।কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার সময় রোদেলা নিরবে কাঁদতে লাগলো।কখনো বাবা মাকে ছেড়ে দুরে কোথাও থাকা হয়নি।বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে তাই মায়া একটু বেশিই।"কিরে কাঁদছিস কেন?" ভারাক্রান্ত মন নিয়ে করিম সিকদার জিজ্ঞাসা করলেন মেয়েকে।
"আমার ভালো লাগছে না বাবা, তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবোনা।আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো বাবা" কথাটি বলতেই সজোরে কেঁদে দিলো রোদেলা।মেয়ের চোঁখে জল দেখে করিম সিকদার নিজেও কান্না ধরে রাখতে পারেননি।"ধুর পাগলি এইসব বললে কি হয়?অনেক বড় হইছিস না তুই এখন এইসব কান্না কি মানায়?অনেক দায়িত্ব তোর কাঁধে।অনেক বড় ডাক্তার হতে হবে তোকে। গ্রামের মানুষের সেবা করতে হবে।সবার ভালোবাসা তোর সাথে আছে। আমার স্বপ্ন পূরণ করবি তুই" বলতে বলতে করিম সিকদার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
যাইহোক বাবা চলে যাওয়ার পর রোদেলার কিছুতেই ভাল লাগছেনা।এমন অচেনা পরিবেশে কারই বা ভাল লাগার কথা।যাক এভাবেই কাটলো সারাটাদিন।আস্তে আস্তে রোদেলা রুমমেটদের সাথে পরিচিত হলো একরুমে চারজন থাকতে হবে।যদিও দুজন ব্যাচম্যাট ছিল এবং একজন সিনিয়র।তবে সবাই মোটামুটি বন্ধুপ্রতিম ছিলো।তাই একসাথে সুন্দরভাবেই দিন কাটাতে লাগলো।
""""
*কিন্তু সমস্যা একটাই সবাই যখন অবসরে যে যার বয় ফ্রেন্ডের সাথে মোবাইলে আলাপচারিতায় মগ্ন থাকে। কিংবা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বের হয় ওই সময়টাতে রোদেলাকে একাই কাটাতে হয়।অধিকাংশ সময় বই পড়েই সময় কাটতো তার।কিন্তু এভাবে ধীরে ধীরে রোদেলা একপ্রকার বিরক্ত হয়ে পড়লো।কোথায় কি যেন একটা শূন্যতা অনুভব করলো। কাছের বান্ধবীদের আনন্দময় জীবন দেখে কিছুটা প্রভাবিত হলো রোদেলা।আরমান রোদেলাদের এক ব্যাচ সিনিয়র।খুব হ্যান্ডসাম বিত্তশালী বাবার একমাত্র ছেলে।রোদেলাকে একদিন দেখে তার প্রতি ইম্প্রেস হয়ে গেল।তারপর থেকে আরমান রোদেলার পিছু নিতে লাগলো।হঠাৎ একদিন আরমান রোদেলাকে প্রেম নিবেদন করল।রোদেলা হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল তাই আগপাছ না ভেবেই আরমানকে প্রত্যাক্ষান করলো।আরমান খুব চতুর হাল ছাড়ার পাত্র নয় তাই সে রোদেলার বান্ধবি কেয়াকে তার করায়ত্ত করে নিল।তার বিশ্বাস কেয়াকে দিয়েই রোদেলাকে রাজি করানো যাবে।কেয়া আবার রোদেলার খুব কাছের বন্ধবী এবং রুম মেট ও।আবার কেয়ার বয়ফ্রেন্ড আরমানের বন্ধু।সেই সুবাদে কেয়ার সাথে আরমানের একটা ভালো পরিচিতি হয়ে যায়।একদিন আরমান রোদেলা সম্পর্কে কেয়াকে সব খুলে বলে।যাই হোক যে কথা সেই কাজ কেয়া আরমানের কথা শুনে তার হয়ে কাজ শুরু করে দিল।কেয়া রোদেলাকে আরমান সম্পর্কে সকল বর্ণনা দিতে লাগলো।কেয়ার কি দোষ বান্ধবিকে এভাবে একা দেখে তার ও খুব খারাপ লাগতো।তাছাড়া মানুষের ভিতরের খবর কে জানে।যাক আরমান রোদেলার ক্লাস শেষে তার জন্য প্রতিদিন দাড়িয়ে থাকতো রোদেলা তাতে কোনো প্রকার ভ্রুক্ষেপ করতো না,সে নিজের মতো করে ক্লাসে আসতো আবার ক্লাস শেষে হলে ফিরে যেতো।একদিন হঠাৎ আরমান আর দাঁড়ায়নি রোদেলার জন্য।
দ্বিতীয় দিনও একইভাবে গেলো এইবার রোদেলা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে লাগলো। বারবার মনে হতে লাগলো কি হলো লোকটির যে প্রতিদিন গম্বুজের মতো দাঁড়িয়ে থাকে হঠাৎ সে উধাও।রোদেলার বিষয়টি নিয়ে খুবই চিন্তিত।আরমানের পাগলামী রোদেলা উপেক্ষা করলেও মনে মনে উপভোগ করতো ঠিকই।কিন্তু কখনো বুঝতে দিতো না।তাই কৌতুহল নিয়ে সে কেয়াকে আরমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো।কেয়া ও কিছুই জানেনা।তারপর কেয়া আরমানের বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারে যে আরমানের টাইফয়েড হইছে তাই সে হসপিটালে ভর্তি।
এইবার রোদেলার মনে দাগ কাটে।সে কেয়াকে নিয়ে আরমানকে দেখতে যায়।
আরমান রোদেলাকে দেখে বিস্মিত হয়ে যায়।আবেগে পুরাই স্তব্ধ হয়ে যায়।
তারপর রোদেলা আরমানের কাছে এসে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চায়।আরমান কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না।কারন তার ভেতরটা আনন্দে নেচে উঠছিলো।
""""
*যাইহোক তারপর থেকে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়।অল্প সময়েই তাদের মধ্যে একটি ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়।দুজন দুজনকে বিশ্বাস করতে শুরু করে।দৈনিক দীর্ঘক্ষন মোবাইলে কথা হয়।দুজন অবসরে নিয়মিত ঘুরতে বের হয়।অথ্যাৎ একটি প্রেম পূর্ণতা পেলে যা হয় আর কি।রোদেলা আরমানের কাছে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।রোদেলার ধ্যান-জ্ঞান সর্বত্র আরমান বিরাজমান।রোদেলা আরমানকে অনেক বিশ্বাস করতে শুরু করে।প্রেমের নেশায় অনেকটা মাতাল হয়ে যায়।আরমান ছাড়া আর কিছুই ভাবনায় আসেনা প্রথম প্রেম তাই আবেগ একটু বেশিই বলা চলে।
এদিকে আরমান ও রোদেলার প্রতি অনেক দূর্বল হয়ে পড়ে।প্রেম তখন তুঙ্গে বিরাজমান।অতঃপর তারা বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলে।রোদেলা মনে হয় আরমানই তার পৃথিবী।ভীষণ বিশ্বাস করে আরমানকে।আরমানের আবদারে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে রোদেলা।হায়রে বিবেক কিসে এতো বিশ্বাস।রোদেলা বড় ভুল করতে যাচ্ছে।হুম এটাই রোদেলার জীবনের অনেক বড় ভুল। আরমানের মনে হঠাৎ শয়তানি দানা বাঁধে তাই সে ভাবলো রোদেলা যদি কখনো তাকে ছেড়ে চলে যায় তখন কি করবে সে।তাই রোদেলাকে কব্জা বন্ধি করার জন্য বন্ধু রিপনের সহায়তায় গোপনে তার মোবাইলে তাদের দুজনের অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারন করে।যা রোদেলা জানতো না।কথা ছিল এই ভিডিও অনলি আরমানের মোবাইলেই থাকবে কিন্তু রিপন আরমানের অজ্ঞাতে তার মোবাইলে ভিডিওটি নিয়ে নেয়।
""""
*অত:পর একদিন আরমান আর রিপনের মাঝে কোন এক বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয় আর তার জের ধরে রিপন ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।আর রোদেলার জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ দূর্যোগ।তারপর এই ভিডিওটি রোদেলার গ্রামেও বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়ে।গ্রামে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।রোদেলার বাবা বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি।রোদেলার বাড়ি থেকে ফোন আসে যন্ত্রনা সইতে না পেরে তার বাবা স্ট্রোক করে মারা যায়।রোদেলা বাড়িতে ছুটে যায় বাবার শেষ মুখটুকু দেখার জন্য।কিন্তু রোদেলার মা ক্ষোভে দুঃখে তাকে বাবার মুখটি দেখতে দেয়নি।রোদেলা ভীষণ একা হয়ে যায় সবাই তাঁকে ঘৃণা করতে শুরু করে।তাই সে ঐ দিনই ঢাকায় ফিরে আসে আরমানের কাছে।আরমানকে সমগ্র বিষটি খুলে বলে।সে আরমানকে তাকে বিয়ে করতে বলে।কিন্তু আরমান পরিবারের সবার ছোট তার বড় দুই ভাই এখনো বিয়ে করেননি।বাবা-মাকেতো বিয়ের কথা এখন বলাই যাবে না।যদি জানে লুকিয়ে বিয়ে করেছে তাহলে ত্যার্য করে দিবে।তাই পরিবারের অযুহাত খাটিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যায় আরমান।এবং রোদেলাকে অস্বীকার করতে শুরু করে,তাকে প্রহার করে।অত:পর রোদেলা কারো কাছে ঠাই না পেয়ে ভীষণ একা হয়ে যায়। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়।তার বাবার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে রোদেলা। অতঃপর একদিন মনের সকল দু:খকে একান্ত নিজের করে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ে।এবং তাদের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে একটি নোট লিখে যায়।এদিকে আরমানকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।আর তার বন্ধু রিপন দেশের বাহিরে পালিয়ে যায়।এভাবেই একটি গ্রামের সাধারন মেয়ের জীবনের করুন পরিসমাপ্তি ঘটে।হঠাৎ একটি দমকা হাওয়ায় একটি জলন্ত প্রদীপ নিভে যায়। আমাদের সমাজে এমন অনেক রোদেলা আছে যাদের জিবন খুবই শোকাবহ হয়।কেউ তা মেনে নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয় আবার কেউ রোদেলার মত পরাজিত সৈনিক হয়ে দুনিয়াকে বিদায় জানায়।তাই সমাজের সকল রোদেলাদের বলছি ভালবাসার নামে নোংরামি,কিংবা পতিতাবৃত্তিকে যদি আধুনিক সভ্যতার আর্শিবাদ মনে করেন তবে কিছুই বলার নেই না হয় রোদেলার মত পরিণতিকে বরণ করার জন্য প্রস্তুতি নিন।সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন তরুণ তরুণী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।এটি একটি কাল্পনিক গল্প হয়তো।যদি কেহ এখান থেকে কিছু উপলব্ধি করতে পারেন,এবং সতর্ক হোন তবে কষ্ট করে লেখাটা স্বার্থক হবে বলে মনে করি।
ধন্যবাদ সবাইকে কষ্ট করে পড়ার জন্য।
_____________________________________________
লিখছেন••••••• এফ.আই.ফিরোজ।