02/08/2026
অপেক্ষার শহর
পর্ব ২২ —
🔹সকাল আটটা।
বগুড়া শহরের ছোট্ট একটি হোটেলের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীল বাইরে তাকিয়ে ছিল।
রাতের সেই দৃশ্যটা এখনও তার চোখে ভাসছে।
বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়া।
সাদা ওড়না।
ভেজা চোখ।
আর সেই নীরব বিদায়।
সে নিজের দুই হাত জানালার গ্রিলে রেখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
জীবনে প্রথমবার তার মনে হলো—
ভালোবাসা কখনও কখনও মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, যখন সে তার সবচেয়ে কাছাকাছি থেকেও ছুঁতে পারে না।
সে চোখ বন্ধ করল।
না...
সে কোনো ভুল করেনি।
সে প্রতিশ্রুতি ভাঙেনি।
সে শুধু একবার তাকিয়েছিল।
একবার।
অফিসের কাজ শুরু হওয়ার কথা সকাল নয়টায়।
হোটেল থেকে বের হওয়ার আগে নীল ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল।
পাতা খুলে লিখল—
"আজ তোমাকে দেখলাম।
এত কাছে থেকেও তোমার নাম ধরে ডাকতে পারলাম না।
মনে হচ্ছিল, যদি একবার বলতাম—'মায়া'...
তাহলে হয়তো সব প্রতিশ্রুতি ভেঙে যেত।"
ডায়েরি বন্ধ করে সে বুকের কাছে চেপে ধরল।
অন্যদিকে...
গ্রামে ফিরে আসার পর মায়াও স্বাভাবিক থাকতে পারছিল না।
মা খেয়াল করলেন, মেয়েটা আজ অকারণেই বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছে।
দুপুরে খাওয়ার সময়ও সে খুব কম খেল।
মা আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন,
— "শরীর খারাপ?"
মায়া মাথা নাড়ল।
— "না।"
— "তাহলে?"
অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে শুধু বলল,
— "কখনও কখনও কিছু না বলেও অনেক কথা বলা হয়ে যায়, মা।"
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু মেয়ের মাথায় হাত রেখে বুঝতে পারলেন—
আজ ওর বুকের ভেতরটা খুব ভারী।
এদিকে...
রবিনের মুখে বিজয়ের হাসি।
সে মোবাইলের ভিডিওটা বারবার দেখছে।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—
বাস থেমেছে।
নীল নেমেছে।
মায়ার দিকে তাকিয়েছে।
মায়াও তাকিয়ে আছে।
কথা হয়নি।
কাছে যায়নি।
তবুও...
ভিডিওটা এমনভাবে দেখানো যায়, যেন তারা গোপনে দেখা করেছে।
রবিন নিজের মনে বলল,
— "সত্যকে হারাতে মিথ্যা লাগে না। অর্ধেক সত্যই যথেষ্ট।"
সন্ধ্যায় রবিন আবার করিম সাহেবের বাড়িতে এল।
এইবার তার মুখে কোনো হাসি নেই।
বরং উদ্বিগ্ন হওয়ার অভিনয়।
— "চাচা... একটা কথা ছিল।"
করিম সাহেব শান্তভাবে বললেন,
— "বলো।"
রবিন মোবাইলটা বের করল।
— "আমি চাইনি এটা আপনাকে দেখাতে।"
— "কিন্তু না দেখালেও অন্যায় হবে।"
সে ভিডিও চালু করল।
করিম সাহেব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।
ভিডিও শেষ হওয়ার পর তিনি কোনো কথা বললেন না।
রবিন অপেক্ষা করল।
এক মিনিট...
দুই মিনিট...
তারপর বলল,
— "এখনও কি বিশ্বাস করেন, ওরা যোগাযোগ রাখে না?"
করিম সাহেব ধীরে ধীরে মোবাইলটা ফিরিয়ে দিলেন।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,
— "তুমি কি পুরো ভিডিওটা দেখিয়েছ?"
রবিন থমকে গেল।
— "মানে?"
— "এর আগে কী হয়েছে?"
— "এর পরে কী হয়েছে?"
— "ওরা কি কথা বলেছে?"
— "হাত ধরেছে?"
— "একসঙ্গে কোথাও গেছে?"
রবিন চুপ।
একটাও প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
করিম সাহেব এবার প্রথমবারের মতো কঠিন গলায় বললেন,
— "অর্ধেক ঘটনা দেখিয়ে পুরো সত্য প্রমাণ করা যায় না, রবিন।"
রবিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে চলে যাওয়ার পর করিম সাহেব অনেকক্ষণ একা বসে রইলেন।
তার মনে পড়ল সেই দিন...
যেদিন নীল বলেছিল—
"আমি আপনার বিশ্বাস ভাঙব না।"
আজও কি সে সেই কথাই রাখল?
হয়তো...
বাসস্ট্যান্ডে দেখা হওয়া পরিকল্পিত ছিল না।
হয়তো সেটা শুধু ভাগ্যের খেলা।
ঢাকায় ফিরে যাওয়ার আগে বগুড়ার কাজ শেষ করল নীল।
কোম্পানির ক্লায়েন্ট তার কাজে খুব সন্তুষ্ট।
বিদায় নেওয়ার সময় ক্লায়েন্ট বললেন,
— "তোমার মতো সৎ আর পরিশ্রমী ছেলে এখন খুব কম দেখা যায়।"
নীল শুধু হাসল।
সে জানে না—
একই সময়ে তার সততা নিয়ে অন্য কোথাও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
রাতে মেসে ফিরে নীল ঘুমাতে পারল না।
সে ডায়েরির শেষ লেখা পড়ল।
তারপর নতুন পাতায় লিখল—
"আজ বুঝলাম, ভাগ্য কখনও কখনও মানুষকে পরীক্ষা নেয়।
আমি জানি না, তুমি আমাকে দেখেছিলে কি না।
কিন্তু আমি শুধু আল্লাহর কাছে একটা দোয়া করেছি—
আমাদের বিশ্বাস যেন কোনো মিথ্যার কাছে হার না মানে।"
ঠিক সেই সময়...
গ্রামের বাড়িতে করিম সাহেব আলমারি খুলে সব ছবি, চিঠি আর নোট একসঙ্গে বের করলেন।
একটার পাশে একটা রাখলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
"এতগুলো প্রমাণ... কিন্তু কেন আমার মন বলছে, কোথাও একটা বড় মিথ্যা লুকিয়ে আছে?"
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—
এবার আর অন্যের কথা নয়।
তিনি নিজেই সত্য খুঁজে বের করবেন।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি।
বগুড়ার গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন করিম সাহেব। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসে তাঁর স্যান্ডেলের নিচে নরম শব্দ হচ্ছিল। চারদিকে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ, অথচ তাঁর মনের ভেতর যেন একের পর এক প্রশ্নের ঝড়।
তিনি সারা রাত ঘুমাতে পারেননি।
বারবার সেই ভিডিওটি মনে পড়েছে।
নীল আর মায়া...
একই জায়গায়।
একই সময়ে।
কিন্তু...
তারা কি সত্যিই দেখা করতে গিয়েছিল?
নাকি সেটা ছিল ভাগ্যের নির্মম খেলা?
করিম সাহেব জানতেন, একজন মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সত্যিটা জানা জরুরি।
এদিকে ঢাকায়...
নীল অফিসে ফিরেছে।
বগুড়ার কাজ সফলভাবে শেষ করায় সবাই তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
রাশেদ সাহেব নিজের কেবিনে ডেকে বললেন,
— "ক্লায়েন্ট তোমার অনেক প্রশংসা করেছে।"
নীল মাথা নিচু করে বলল,
— "ধন্যবাদ, স্যার।"
— "পরের মাস থেকে তোমার বেতন বাড়ানোর জন্য আমি সুপারিশ করেছি।"
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মনে পড়ল সেই দিনের কথা, যখন ঢাকায় এসে পকেটে মাত্র একশো কুড়ি টাকা ছিল।
আজ...
সে নিজের পরিশ্রমে একটু একটু করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখনও অনেক দূরে।
সেদিন দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে তানহা বলল,
— "আপনাকে আজকাল অনেক খুশি দেখাচ্ছে।"
নীল মুচকি হেসে বলল,
— "হয়তো মনে হচ্ছে, আমি ধীরে ধীরে আমার লক্ষ্যটার কাছে পৌঁছাচ্ছি।"
— "লক্ষ্যটা কী?"
নীল চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "একটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করা।"
তানহা বুঝতে পারল, এর বেশি প্রশ্ন করা ঠিক হবে না।
বগুড়ায়...
করিম সাহেব সোজা চলে গেলেন বাসস্ট্যান্ডে।
যেখানে নীল আর মায়াকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল।
চায়ের দোকানের বৃদ্ধ মালিক এখনও সেখানে বসে আছেন।
করিম সাহেব ভদ্রভাবে বললেন,
— "চাচা, একটা কথা জানতে চাই।"
বৃদ্ধ হাসলেন।
— "বলুন।"
করিম সাহেব মোবাইলে ভিডিওটা দেখালেন।
— "এই ছেলেটাকে চিনেন?"
বৃদ্ধ ভিডিওটা ভালো করে দেখে সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— "চিনি।"
করিম সাহেবের বুক ধক করে উঠল।
— "সেদিন কী হয়েছিল?"
বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন,
— "বাসটা দশ মিনিটের জন্য থেমেছিল। ছেলেটা নেমে চা খেয়েছিল।"
— "মেয়েটার সঙ্গে কথা বলেছিল?"
— "না।"
— "কাছে গিয়েছিল?"
— "না।"
— "এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল?"
— "না।"
বৃদ্ধ আরও বললেন,
— "দুজন শুধু একবার একে অপরের দিকে তাকিয়েছিল। তারপর বাস চলে গেলে ছেলেটাও চলে যায়, মেয়েটাও নিজের পথে চলে যায়।"
করিম সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা একটা ভার যেন একটু হালকা হলো।
ঠিক তখনই দোকানের পাশে বসে থাকা এক রিকশাচালক কথায় যোগ দিল।
— "আমি তো সেদিন সব দেখেছি।"
করিম সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন।
— "কী দেখেছেন?"
রিকশাচালক বলল,
— "একটা ছেলে বারবার মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছিল।"
— "ওই দুইজনকে?"
— "হ্যাঁ।"
— "ছেলেটার নাম জানেন?"
রিকশাচালক মাথা নাড়ল।
— "নাম জানি না। তবে মোটরসাইকেলে ছিল।"
করিম সাহেবের মনে সঙ্গে সঙ্গে রবিনের কথা ভেসে উঠল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি মায়াকে কিছুই বললেন না।
শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
— "আজ পড়াশোনা কেমন হলো?"
মায়া অবাক হলো।
বাবার মুখে আজ অনেক দিন পর সেই আগের কোমলতা ফিরে এসেছে।
সেদিন রাতে করিম সাহেব একা বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।
"হে আল্লাহ, আমাকে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য বোঝার শক্তি দিন। কোনো নির্দোষ মানুষের প্রতি যেন আমি অন্যায় না করি।"
এদিকে...
রবিন বুঝতে পারছে না কেন করিম সাহেব কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।
সে ভাবছিল, এতদিনে নিশ্চয়ই সব শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা।
করিম সাহেব যেন আরও শান্ত হয়ে গেছেন।
রবিনের অস্থিরতা বাড়তে লাগল।
সে সিদ্ধান্ত নিল—
এবার শেষ চালটা খেলতেই হবে।
ঠিক সেই রাতেই...
ঢাকার অফিস থেকে নীলকে একটি সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য মনোনীত করা হলো।
এই প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করতে পারলে তার পদোন্নতির পথ অনেকটাই খুলে যাবে।
চিঠিটা হাতে নিয়ে নীলের চোখ ভিজে উঠল।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলল,
— "মায়া... আমি আরেকটু এগিয়ে গেলাম। শুধু আর একটু অপেক্ষা করো।"
কিন্তু সে জানত না...
ঠিক একই সময়ে রবিন এমন একটি পরিকল্পনা করছে, যা শুধু নীলের চাকরি নয়...
তার চরিত্রকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
আর সেই ষড়যন্ত্রের প্রথম আঘাত আসবে এমন একজন মানুষের কাছ থেকে...
যাকে নীল নিজের আপন মানুষ বলেই বিশ্বাস করে।
চলবে...
____❐ লেখা: Sk Creation