31/05/2026
অপেক্ষার শহর
তৃতীয় পর্ব — অজানা অনুভূতির শুরু
বৃষ্টির সেই দিনের পর থেকে নীল আর মায়ার দেখা হওয়া যেন এক ধরনের অভ্যাস হয়ে গেল।
স্কুল শেষ হলে কখনও নদীর পাড়ে, কখনও বড় বটগাছটার নিচে, আবার কখনও গ্রামের পুরোনো লাইব্রেরির সামনে দুজনের দেখা হয়ে যেত।
তারা কখনও ঠিক করে দেখা করতো না।
তবুও দেখা হয়ে যেত।
মায়া প্রায়ই মজা করে বলতো—
“আমার মনে হয় আপনি আমাকে অনুসরণ করেন।”
নীল শান্তভাবে উত্তর দিতো—
“তাহলে আপনিও তো আমাকে অনুসরণ করেন।”
কথাটা শুনে মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকতো।
তারপর হেসে ফেলতো।
সেপ্টেম্বর মাসের এক বিকেল।
স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
পুরো স্কুল সাজানো হয়েছে রঙিন কাগজ আর ফুল দিয়ে।
মায়া আবৃত্তি করবে।
আর নীলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অনুষ্ঠান পরিচালনার।
মঞ্চে উঠার আগে মায়ার হাত কাঁপছিল।
সে ভীষণ নার্ভাস।
ঠিক তখন নীল পাশে এসে দাঁড়ালো।
“ভয় পাচ্ছো?”
“একটু।”
“তুমি পারবে।”
মাত্র দুইটা শব্দ।
কিন্তু কেন জানি মায়ার সব ভয় মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পুরো স্কুল মাঠে আনন্দের পরিবেশ।
সবাই ছবি তুলছে, গল্প করছে।
মায়া দূর থেকে লক্ষ্য করলো—
একটা মেয়ে বারবার নীলের সাথে কথা বলছে।
মেয়েটা পাশের গ্রামের।
দেখতেও বেশ সুন্দর।
অদ্ভুতভাবে মায়ার মন খারাপ হয়ে গেল।
কেন হলো, সে নিজেও জানে না।
সারাদিন সে আর নীলের সাথে ঠিকমতো কথা বললো না।
সন্ধ্যার দিকে নীল বিষয়টা টের পেল।
নদীর পাড়ে দেখা হলে সে জিজ্ঞেস করলো—
“আজ এত চুপচাপ কেন?”
“কিছু না।”
“মিথ্যা বলছো।”
মায়া বিরক্ত হয়ে বললো—
“আপনি সব বুঝেন নাকি?”
“না। তবে তোমাকে একটু বুঝি।”
কথাটা শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে হঠাৎ বলে ফেললো—
“ওই মেয়েটা কে ছিল?”
নীল অবাক।
“কোন মেয়েটা?”
“যে সারাদিন আপনার সাথে কথা বলছিল।”
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর নীল হেসে ফেললো।
“তুমি কি ঈর্ষা করছো?”
মায়ার মুখ লাল হয়ে গেল।
“না!”
“তাহলে জানতে চাইছো কেন?”
“এমনিই।”
নীল আর কিছু বললো না।
কিন্তু তার মুখের হাসিটা কিছুতেই থামছিল না।
সেদিন রাতে মায়া নিজের উপরই রাগ করছিল।
সে কেন এমন প্রশ্ন করলো?
তার কী অধিকার আছে?
কিন্তু যতই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করুক, মনের ভেতর একটা কথাই ঘুরছিল—
যদি একদিন নীল অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলে?
অন্যদিকে সেই রাতে নীলও ঘুমাতে পারছিল না।
ডায়েরি খুলে অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে রইলো।
তারপর লিখলো—
“আজ প্রথমবার মনে হলো, কেউ একজন আমার না বলা কথাগুলো শুনতে চায়।
আর সেই অনুভূতিটা ভয়ঙ্কর সুন্দর।”
জানালার বাইরে তখন পূর্ণিমার আলো।
দূরে নদীর পানি চিকচিক করছে।
আর অজান্তেই দুইটা হৃদয়ের মাঝে একটা নতুন গল্প জন্ম নিতে শুরু করেছে।
চলবে...