09/07/2026
ইসলামী সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রি: আলোর ঝলকানি থেকে বিজ্ঞাপনের ব্ল্যাকহোল
আবুল আলা মাসুম
বাংলাদেশের স্যাটেলাইট মিডিয়ার প্রেগনেন্সি প্রিয়ডের একটি বিস্ময়কর তথ্য দিয়ে শুরু করছি। বাংলাদেশে স্যাটেলাইট মিডিয়ার ইতিহাসে নির্মিত সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠানটি কোনো নাটক, সিনেমা, গান বা তথাকথিত মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কোনো প্রডাকশন ছিল না; সেটি ছিল আরকান উল্লাহ হারুনি নির্মিত একটি ইসলামী গানের অনুষ্ঠান।
তৎকালীন 'এটিএন ইন্ডিয়া'-র জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। যখন আজকের মিডিয়া মোগলরা কেবল সিনেমার গান ফরম্যাট পরিবর্তনের কাজ করছিলেন, তখন ইসলামী সংস্কৃতির সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্যাটেলাইট মিডিয়ার জন্যে মৌলিক প্রগ্রাম নির্মাণ করেছিলেন।
বাংলাদেশে বেসরকারি ভাবে মিডিয়া হাউজও ইসলামপন্থীদের হাতে গড়া। ১৯৮৭ সালে মরহুম সিদ্দিক জামাল রাহিঃ এর হাত ধরে জামায়াতে ইসলামির অর্থয়নে আলমানার নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা মূলত এনালগ যুগের VHS সময়ের গল্প। ১৯৯১ সালে প্রখ্যাত অভিনেতা, আফজাল হোসেন এবং সাংবাদিক সানাউল আরেফীন এর হাত ধরে ‘মাত্রা’ (Mattra) "ইউ-মেটিক" (U-matic) ফর্মেটে যাত্রা শুরুর ৪ বছর আগে আলমানার এর জন্ম।
ইতিহাস এত জৌলুশপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, আজ ২০২৬ সালেও এসে কেন ইসলামী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম মূলধারার আলোয় আসতে পারল না? কেন এটি একটি স্বাবলম্বী ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলো?
এর পেছনে রয়েছে কিছু অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত, দূরদর্শিতার অভাব এবং একটি বিশাল অর্থনৈতিক সমীকরণ। আসুন, নির্মোহভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করি এবং সমাধানের পথ খুঁজি।
১. কোয়ালিটি এবং দক্ষ জনবল: ইন্ডাস্ট্রির প্রথম শর্ত
একটি ইন্ডাস্ট্রি তখনই গড়ে ওঠে যখন তার পণ্যের মান বা প্রডাকশন কোয়ালিটি বৈশ্বিক মানের হয়। ইসলামী সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের কর্ণধারগণ এটি তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
কর্মীদের মান উন্নয়ন:
কেবল আবেগ বা ধর্মীয় চেতনা দিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করলে তা আধুনিক দর্শকের মন জয় করতে পারবে না। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডিরেক্টর এবং টেকনিশিয়ানদের পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কোনো অদৃশ্য কারণে এই কর্ণধারগণ ইসলামি বিনোদন সংস্কৃতির তীর্থ কেন্দ্র ইরান কিংবা সুস্থ সংস্কৃতির নতুন রাজধানী তুরষ্ক থেকে ফিল্ম এন্ড মিডিয়া পড়িয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরির উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রডাকশন ভ্যালু:
কন্টেন্টের ভিজ্যুয়াল, অডিও এবং এডিটিং কোয়ালিটি আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিটি পর্বে সগৌরবে অংশ নিতে হলে মানের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। একটি স্বশিক্ষিত জাতি কোনো ভাবেই এই মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পা্রে না। এর জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নেই।
২. ডোনেশন বনাম বিজনেস মডেল: টিকে থাকার লড়াই
ডোনেশন বা অনুদান দিয়ে একটা উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে কোনো ‘ইন্ডাস্ট্রি’ তৈরি করা ও টিকিয়ে রাখা কঠিন।
ইন্ডাস্ট্রি মানে কী? ইন্ডাস্ট্রি মানে হলো—সেখানে কর্মরত ফুল-টাইম কর্মী এই পেশা থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজে সম্মানজনক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ধারণ করতে পারবেন।
এই স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন একটি টেকসই বিজনেস মডেল। আর এই বিজনেস মডেলের প্রধান জ্বালানি হলো বিজ্ঞাপন (Revenue from Advertising)।
৩. ১৫ হাজার কোটি বনাম ১৫ কোটি: বিজ্ঞাপন মঞ্চে অনুপস্থিতি
একটি নির্মম ও দুঃখজনক পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশের বাৎসরিক কর্পোরেট বিজ্ঞাপন বাজেট প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই বিশাল বাজেট থেকে ইসলামী ঘরানার প্রোগ্রাম বা প্ল্যাটফর্মগুলো বছরে ১৫ কোটি টাকাও টেনে আনতে পারছে না!
যেখানে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ইসলামী কন্টেন্টের ভোক্তা, সেখানে কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলো কেন এখানে বিনিয়োগ করছে না? এটি নিঃসন্দেহে গবেষণার দাবি রাখে।
ব্র্যান্ড সেফটি ও ভুল ধারণা:
অনেক মাল্টিন্যাশনাল বা দেশীয় ব্র্যান্ডের ধারণা, ইসলামী কন্টেন্টে স্পন্সর করলে তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে যেতে পারে। এর বাইরে পলিটিক্যাল প্রতিহিংসার অবস্থান তো রয়েছেই।
পেশাদার মার্কেটিংয়ের অভাব:
ইসলামী কন্টেন্ট নির্মাতারা কর্পোরেট এজেন্সির সাথে কীভাবে ডিল করতে হয়, কীভাবে ডেটা ও রিচ (Reach) দেখিয়ে বাজেট আনতে হয়—সেসব পেশাদার বিপণন কৌশলে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে।
৩. গান ছাড়া সকল জোনরায় অনুপস্থিতিঃ
ইসলামি সাংস্কৃতিক বলয় শুধু গান নির্মান করেন। নাটকে কালে ভাদ্রে কিছু দুর্বল পদচারণা দেখা গেলেও সিনেমা শিল্পে পুরোপুরি তারা অনুপস্থিত। এই গানের সিংহ ভাগ হামদ ও নাত। এই হামদ এর বেইজ হল গাছ, নদী, আকাশ, পাহাড় সুন্দর তাই আল্লাহ সুন্দর। যাপিত জীবনের সাথে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
কীভাবে বিল্ড হবে এই ইন্ডাস্ট্রি?
এই কন্টেন্ট দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি বিল্ড করা যাবে না। ইন্ডাস্ট্রি বিল্ড করতে হলে ন্যাশনাল বিজ্ঞাপন বাজেট এ অংশ নিতে হবে। তার জন্যে চাই সৃষ্টিশীল মেধাবী মুখ। শিক্ষিত ও প্রজন্মের পালস রিড করতে পারা প্রশান্ত হৃদয়।
ন্যাশনাল বিজ্ঞাপন বাজেটে অংশ নেয়া:
কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলোকে বোঝাতে হবে যে, ইসলামী সংস্কৃতির দর্শক কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়; বরং এটি একটি বিশাল এবং লয়াল (Loyal) কনজিউমার বেস। সঠিক ডেটা ও পিচ-ডেক (Pitch Deck) নিয়ে এজেন্সির কাছে যেতে হবে। প্রয়োজনে কনজিউমার এসোসিয়েশান তৈরি করে রিচ ডাউন করে দিয়ে হলেও কিংবা পলিসি মেইক করে বাজেটে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আধুনিক মনস্তত্ত্বের কন্টেন্ট:
যুগের চাহিদাকে মাথায় রেখে সমসাময়িক ও সামাজিক ইস্যুগুলোকে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। কন্টেন্ট হতে হবে জীবন ঘনিষ্ঠ, সর্বজনীন ও আকর্ষণীয়।
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা:
এই সেক্টরে বড় বড় মুসলিম উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা যদি শুধু অনুদান না দিয়ে একে একটি প্রফিটেবল বিজনেস ভেঞ্চার হিসেবে দেখেন, তবেই এখানে দক্ষ প্রফেশনালরা কাজ করতে আগ্রহী হবেন।
শেষ কথা
অন্ধকারে আর কতকাল? গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে কেবল স্মৃতির পাতায় না রেখে, বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলোকে সাহসের সাথে মোকাবেলা করার সময় এখনই। আবেগ সরিয়ে রেখে যেদিন আমরা পেশাদারিত্ব, সর্বোচ্চ প্রডাকশন কোয়ালিটি এবং টেকসই বিজনেস স্ট্র্যাটেজি হাতে নেব—সেদিনই বাংলাদেশের বুকে একটি সফল ও স্বাবলম্বী 'ইসলামী সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রি' মাথা তুলে দাঁড়াবে।
আপনার কী মনে হয়? ইসলামী সংস্কৃতির এই স্থবিরতার জন্য মূল বাধা কোনটি—কোয়ালিটির অভাব নাকি অর্থায়নের অভাব?
কমেন্টে আপনার মূল্যবান মতামত জানান।