30/12/2025
নীল শাড়ির ভিষন্ন জীবন
# # # # # # #
শহরের এই কফিশপটা আয়শার খুব পছন্দের। জানালার ওপাশে ব্যস্ত রাস্তা, অবিরাম ছুটে চলা মানুষ আর যান্ত্রিক কোলাহল। কিন্তু এই জানালার কাঁচ যেন বাইরের সেই অস্থিরতাকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না। আয়শা জানালার পাশে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। তার পরনে একটা নীল রঙের ফ্লোরাল প্রিন্টের জামা, যা তার গায়ের রঙের সাথে দারুণ মানিয়ে গেছে। তার অবয়বে একটা স্নিগ্ধতা আছে, স্বাস্থ্যবান শরীরী গড়নে এক ধরণের আভিজাত্য ফুটে ওঠে। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সেখানে এক গভীর সমুদ্রের মতো বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে।
আয়শার বয়স এখন চব্বিশ। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে। বাবা সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন গত বছর। মা অসুস্থ থাকেন প্রায়ই। আয়শা একটি প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে। তার প্রতিদিনের জীবনটা ঘড়ির কাঁটার মতো মাপা। অফিস, বাসা আর মাঝে মাঝে এই কফিশপে একা বসে থাকা। মানুষ তাকে দেখে ভাবে সে কত সুখী, কত আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু আয়শা জানে, তার বুকের ঠিক বাম পাশে একটা ক্ষত আছে যা প্রতিদিন রক্তক্ষরণ করে, কিন্তু কেউ তা দেখতে পায় না।
আজকের দিনটা আয়শার জন্য একটু অন্যরকম ছিল। ঠিক পাঁচ বছর আগে এই দিনেই সে প্রথম অনুভব করেছিল ভালোবাসা কী। নীল রঙটা আয়শার খুব প্রিয় হওয়ার পেছনেও একটা কারণ ছিল। নীল ছিল আরিয়ানের প্রিয় রঙ। আরিয়ান, সেই মানুষটি যে আয়শার জীবনে এসেছিল এক পশলা বৃষ্টির মতো, কিন্তু চলে গেল কালবৈশাখী ঝড়ের মতো সব তছনছ করে দিয়ে।
আয়শার মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দেখার দিনটি। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে একগাদা বই নিয়ে বসে ছিল আয়শা। হঠাৎ একজনের গলার স্বর শুনে সে মুখ তুলে তাকালো। সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদেহী এক যুবক, তার চোখের দৃষ্টিতে যেন এক অদ্ভুত জাদু ছিল। আরিয়ান এসে বলেছিল, “আপনি যদি এই বইটি শেষ করে থাকেন, আমি কি এটা একটু দেখতে পারি?” আয়শা সেদিন কথা হারিয়ে ফেলেছিল। সেই শুরু। তারপর কফি শপে আড্ডা, রিকশায় ঘুরে বেড়ানো আর শেষহীন ফোনে কথা বলা।
আয়শা ছিল আরিয়ানের জন্য এক প্রশান্তির নাম। আরিয়ান প্রায়ই বলত, “আয়শা, তোমার এই মায়াবী হাসি আর এই স্নিগ্ধ চেহারাটা দেখলে আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তুমি কক্ষনো রোগা হওয়ার চেষ্টা করবে না, তুমি এই স্বাস্থ্যবান গড়নেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে।” আরিয়ানের সেই কথাগুলো আজও আয়শার কানে বাজে। কিন্তু ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর। আরিয়ানের পরিবার আয়শাকে মেনে নেয়নি। তাদের আভিজাত্য আর অহংকারের কাছে আয়শার মধ্যবিত্ত পরিচয়টা তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।
আরিয়ান লড়াই করেছিল অনেকদিন। কিন্তু তার বাবার অসুস্থতা আর পারিবারিক চাপের মুখে সে একদিন হার মেনে নিলো। শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল, আরিয়ান শুধু বলেছিল, “আয়শা, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি হয়তো তোমার যোগ্য ছিলাম না।” সেদিন আয়শা কাঁদেনি। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল আরিয়ানের চলে যাওয়ার পথের দিকে। সেই থেকে নীল রঙটা আয়শার জন্য একই সাথে প্রিয় আর বেদনার প্রতীক হয়ে দাঁড়ালো।
আজ কফিশপে বসে জানালার বাইরে বৃষ্টি নামতে দেখল আয়শা। আকাশটা হঠাৎ করে কালো হয়ে এসেছে। আয়শা তার কফির কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। তার মনে হলো, এই বৃষ্টি যেন তার মনের অব্যক্ত কথাগুলোই বলতে চাইছে। ঠিক এই সময়ে তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একটা অজানা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। আয়শা মেসেজটা খুলল। সেখানে লেখা ছিল— “নীল রঙে তোমাকে আজও ঠিক আগের মতোই অপার্থিব সুন্দর লাগছে।”
আয়শার হাত কাঁপতে শুরু করল। বুকটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত চারদিকে তাকাতে লাগল। এই কফিশপে কি কেউ তাকে চেনে? নাকি সে কোনো ভ্রম দেখছে? জানালার কাঁচের ওপাশে বৃষ্টির ঝাপটায় সবকিছু ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিন্তু দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। কুয়াশা আর বৃষ্টির আবহে চেহারাটা অস্পষ্ট হলেও তার অবয়বটা বড় চেনা। দীর্ঘদেহী একজন মানুষ, গায়ে একটা কালো কোট।
আয়শা উঠতে চাইল, কিন্তু তার পা যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। তার মনে হলো, সে যদি এখন বাইরে যায় তবে হয়তো আবার সেই পুরোনো যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হবে। যে যন্ত্রণা সে গত পাঁচ বছর ধরে তিলে তিলে সামলে রেখেছে। মেসেজটা কি আরিয়ানের? নাকি অন্য কেউ? আয়শা আবার জানালার বাইরে তাকাল। সেই ছায়াটা আর সেখানে নেই। শুধু বৃষ্টি আর শূন্য রাস্তা।
আয়শা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ দুটি জলে ভরে উঠল। সে জানত না, আজকের এই সাধারণ বিকেলটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে চলেছে। সে ভাবত সে একাই লড়ছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে কেউ একজন হয়তো তার প্রতিটি পদক্ষেপ খেয়াল করছে। জীবনের এই জটিল সমীকরণে আয়শা কি পারবে আবার হাসতে? নাকি এই নীল শাড়ির আড়ালে তার দীর্ঘশ্বাসগুলো চিরকাল ঢাকা পড়ে থাকবে?
অফিস থেকে ফেরার পথে আয়শা ভিজল কিছুটা। ভেজা কাপড় নিয়ে বাসায় ঢোকা মাত্রই মা বললেন, “আয়শা, তোর শরীরটা তো ভারী হয়ে যাচ্ছে দিন দিন, একটু খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ কর। আর শোন, কাল তোর জন্য এক জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশে থাকে। অনেক বড় ঘর।”
আয়শা মার কথাগুলো শুনল, কিন্তু উত্তর দিল না। তার মাথায় তখন শুধু ঘুরছিল সেই মেসেজটা। কে পাঠাল ওটা? আরিয়ান কি ফিরে এসেছে? নাকি এটা কোনো নিষ্ঠুর মজা? নিজের ঘরে ঢুকে আয়শা আয়নার সামনে দাঁড়ালো। আয়নায় ফুটে ওঠা প্রতিচ্ছবিটা তাকে ভেঙচি কাটল। এই সুশ্রী চেহারা, এই সুন্দর চোখ— সব কি শুধু বিসর্জনের জন্যই?
আয়শা তার আলমারি থেকে একটা ডায়েরি বের করল। ডায়েরির পাতায় নীল কালিতে লেখা অনেক কবিতা। সব আরিয়ানকে নিয়ে। সে ডায়েরির শেষ পাতায় গিয়ে লিখল, “ফিরে আসার যদি ইচ্ছাই ছিল, তবে চলে গিয়েছিলে কেন? স্মৃতিগুলো তো মরে যায় না, তারা প্রতি রাতে জ্যান্ত হয়ে আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।”
জানালার গ্রিল ধরে আয়শা বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। রাতের এই নিস্তব্ধতায় তার মনে হতে লাগল, কেউ একজন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, “অপেক্ষা করো আয়শা, গল্পটা কেবল শুরু হয়েছে।”
দ্বিতীয় পর্ব দিব????
বেশি বেশি কমেন্ট করেন।