09/05/2026
শৈশব
তামিম হোসাইন
এই তো সেদিনই কাঁধ থেকে স্কুলের ব্যাগটা নামিয়ে রাখলাম। মনে হচ্ছিল, এই তো আরেকটা সাধারণ দিন।কাল আবার ভোরে উঠে ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাব, গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করব, ক্লাসে ঢুকে স্যারের বকা খাব, টিফিনে মাঠে দৌড়াব। তখন কে জানত, ওই দিনটাই ছিল একটা পুরো সময়ের শেষ দিন।
ছোটবেলাটা কেমন যেন অন্যরকম ছিল। সকাল হলেই মায়ের ডাক, উঠো, দেরি হয়ে যাবে। আধো ঘুমে চোখ মেলে তাড়াহুড়ো করে তৈরি হওয়া, ব্যাগের ভেতর বই-খাতা গুছিয়ে নেওয়া, তারপর রাস্তায় বেরিয়ে পড়া। পথে কত পরিচিত মুখ। কেউ পাশের বাড়ির, বন্ধু, কেউ আবার শুধু স্কুলে যাওয়ার সাথী। সেই পথটা আজও আছে, কিন্তু আগের মতো আর যাওয়া হয় না।
স্কুলের গেটটা পেরোলেই মনে হতো, এটাই যেন আমাদের ছোট্ট একটা পৃথিবী। সকালে স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত এর সময় কারও মুখে হাসি, কারও চোখে ঘুম, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে মুচকি হাসি দিচ্ছে। ক্লাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে কত স্বপ্ন দেখতাম। বইয়ের পাতায় লেখা ইতিহাসের চেয়ে আমাদের বেঞ্চের গল্পগুলোই তখন বেশি সত্যি ছিল।
টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই যেন পৃথিবী বদলে যেত। বই খাতা বন্ধ করে সবাই ছুটে যেতাম মাঠে। কেউ ফুটবল, কেউ ক্রিকেট, কেউ শুধু দৌড়ে বেড়াতো। গরমে হাঁপিয়ে গেলেও কী এক আনন্দ ছিল! তখন ছোট ছোট জয়েও কত খুশি হতাম। ফুটবল খেলায় একটা গোল দিতে পারলে মনে হতো, আজকের দিনটাই আমার।
বন্ধুরা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কত অদ্ভুত নাম ধরে ডাকাডাকি, কত ঝগড়া, কত অভিমান। সকালে কথা না বলে থাকা মানুষটাই টিফিনে এসে বলত, এই চল খেলতে যাই। বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় একসাথে হাঁটতে হাঁটতে কত গল্প বলা হত কে বড় হয়ে কী হবে, কে কোথায় যাবে, কার জীবন কেমন হবে। তখন মনে হতো, আমরা সবাই সবসময় একসাথেই থাকব।
কিন্তু সময়ের নিজের একটা নিয়ম আছে। সেটা কারও জন্য থেমে থাকে না।
একদিন বুঝতে পারলাম, শেষ বেঞ্চের সেই দিনগুলো ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার চাপ বাড়ল, পড়ার ব্যস্ততা বাড়ল। আগের মতো মাঠে নামা হলো না, টিফিনের আড্ডা ছোট হয়ে গেল। যে বন্ধুকে না দেখে একটা দিন কাটত না, তার সাথে কখন কথা কমে গেল, টেরও পাইনি।
তারপর এলো স্কুল জীবনের আমাদের শেষ দিন। স্কুল ছুটির পর কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সবাই ছিল, অথচ মনে হচ্ছিল কিছু একটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। কেউ হাসছিল, কেউ ছবি তুলছিল, কেউ বলছিল, যোগাযোগ রাখিস। তখন মনে হয়েছিল, সত্যিই তো আমরা তো আবার দেখা করব। কিন্তু জীবন তখন নীরবে নিজের রাস্তা ঠিক করে ফেলেছিল।
তারপর দিনগুলো বদলে গেল। কেউ কলেজে গেল, কেউ অন্য শহরে চলে গেল, কেউ সংসারের দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আগে যে মানুষগুলোর সাথে প্রতিদিন দেখা হতো, এখন তাদের খবর পাওয়াটাও কঠিন। মাঝে মাঝে ফোনের পুরোনো ছবিগুলো দেখি। সেখানে আমরা আছি হাসছি, দৌড়াচ্ছি, বেঁচে আছি কিন্তু সেই সময়টা আর নেই।
আজ যখন কোথাও কোনো স্কুলের ঘণ্টা শুনি, বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে ওঠে। মনে হয়, যদি একদিনের জন্য ফিরে যেতে পারতাম আবার সেই বেঞ্চে বসতাম, আবার টিফিনে মাঠে নামতাম, আবার বন্ধুরা পাশে থাকত। এখন বুঝি, তখন আমরা শুধু পড়তে যেতাম না আমরা আসলে জীবনটাকে খুব সহজভাবে বাঁচতে শিখছিলাম।
এই তো সেদিন কাঁধ থেকে স্কুলের ব্যাগটা নামিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, কাল আবার কাঁধে তুলে নেব। কিন্তু বুঝিনি, সেদিন শুধু একটা ব্যাগ নামাইনি—একটা পুরো শৈশব নামিয়ে রেখেছিলাম।ছোটবেলায় ভাবতাম পৃথিবীটা খুব ছোট একটা বাড়ি, একটা স্কুল, আর কয়েকটা মানুষ। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়া করে স্কুলের পোশাক পরে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে যখন বাড়ি বের হতাম তখন মনে হতো পুরো পৃথিবীটা যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। স্কুলের গেট পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতো এক অন্যরকম আনন্দ। ক্লাসে বসে গল্প করা, টিফিনের সময় সবাই মিলে খাবার ভাগাভাগি করা, আর ঘণ্টা বাজলেই মাঠে ছুটে যাওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।
পড়ালেখার মাঝেও আমার মনটা ছিল ভীষণ চঞ্চল। বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেও জানালার বাইরে আকাশ, মাঠ, গাছপালা মনে হতো আমাকে বারবার ডাকত তাদের সাথে গল্প করার জন্য। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি, কানামাছি, বৃষ্টির দিনে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরা এসবই ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে আপন স্মৃতি। তখন সময় যেন ধীরে ধীরে চলত, আর প্রতিটা দিনই মনে হতো নতুন কোনো গল্প নিয়ে এসেছে।
আমার বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল সবচেয়ে কাছের সে ছিল আমার বেস্টফ্রেন্ড। আমাদের দুজনের মধ্যে এমন এক বন্ধন ছিল, যেখানে না বললেও অনেক কথা বুঝে নেওয়া যেত। এক বেঞ্চে বসা, একসঙ্গে খাতা সাজানো, পরীক্ষার আগের রাতে ভয় পাওয়া, আবার ফল ভালো হলে দুজন মিলে লাফিয়ে ওঠা সবকিছুতেই আমরা ছিলাম একসঙ্গে। স্কুলের করিডোর, মাঠের এক কোণা, টিফিনের বেঞ্চ সব জায়গায় আমাদের হাসির শব্দ লেগে থাকত। তখন মনে হতো, এই বন্ধুত্ব কোনোদিন বদলাবে না।
সময় একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল। ছোট ক্লাস পেরিয়ে বড় ক্লাসে উঠতেই পড়ালেখার চাপ বাড়ল। আগের মতো আর প্রতিদিন মাঠে নামা হতো না। কেউ কোচিংয়ে ব্যস্ত, কেউ পরিবারের কারণে অন্য জায়গায় চলে গেল, কেউ নতুন বন্ধু পেল। তবুও আমরা ভাবতাম যত দূরেই যাই, বন্ধুত্বটা ঠিক আগের মতোই থাকবে।
কিন্তু সময়ের নিজস্ব একটা নিয়ম আছে। সে ধীরে ধীরে মানুষের খুব কাছের জিনিসগুলোও বদলে দেয়। একসময় প্রতিদিন দেখা হওয়া মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা কমে গেল। টিফিনের সময়ের সেই গল্পগুলো হারিয়ে গেল বইয়ের ভাঁজে। একদিন হঠাৎ সে খেয়াল করলাম, যে মানুষটার সঙ্গে না দেখা হলে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগত, তার সঙ্গে এখন সপ্তাহ কেটে যায় কথা না বলেই।
কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অভিমানও ছিল না ।শুধু সময় আমাদের মাঝখানে নীরবে একটা দূরত্ব তৈরি করে দিল। এক সময় যে বন্ধু আমার ছোট্ট ছোট্ট কষ্টগুলোও বুঝে ফেলত, এখন সে হয়তো অন্য শহরে, অন্য জীবনে, অন্য মানুষদের সঙ্গে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে পুরোনো খাতা, পুরোনো ছবি, কিংবা স্কুলের কোনো গান শুনলে তার কথা মনে পড়ে যায় একটা সময় ছিল, যখন আমাদের দুজনের হাসিতে পুরো দুপুর কেটে যেত।
বড় হতে হতে বুঝলাম, জীবনে সব মানুষ চিরদিন পাশে থাকে না। কেউ কেউ আসে শুধু কিছুটা পথ একসঙ্গে হাঁটার জন্য। তাদের কাজ হয়তো শেষ হয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতিগুলো থেকে যায়। সেই স্মৃতিগুলোই একসময় মানুষের মনকে নরম করে, আবার শক্তও করে।
আমি যখন পেছন ফিরে তাকায়, তখন স্কুলের সেই দিনগুলোকে স্বপ্নের মতো লাগে আমার কাছে। ভোরবেলার ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়া, ইউনিফর্মের গন্ধ, টিফিনের অপেক্ষা, মাঠের ধুলো, বন্ধুদের হাসি সবকিছু যেন সময়ের ভেতর কোথায় থেমে আছে। মানুষগুলো বদলে গেছে, পথগুলো আলাদা হয়ে গেছে, কিন্তু আমার মনের ভেতরে এখনো এক টুকরো স্কুলজীবন বেঁচে আছে।
মাঝে মাঝে মনে মনে ভাবি যদি আরেকবার সেই দিনগুলোয় ফিরে যাওয়া যেত যদি আরেকবার স্কুল ছুটির পর সবাই মিলে মাঠে দৌড়ানো যেত যদি আরেকবার সেই বেস্ট ফ্রেন্ডের পাশে বসে নির্ভার হয়ে গল্প করা যেত । কিন্তু আমি বুঝে গেছি জীবন সামনে এগিয়ে যায়, পেছনে নয়।
তবু হারিয়ে যাওয়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কিছু মানুষ দূরে চলে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া সময়, হাসি, আর অনুভূতিগুলো জীবনের অংশ হয়ে থাকে। হয়তো আজ তারা পাশে নেই, তবুও তাদের সঙ্গে কাটানো বিকেলগুলো, ছোট ছোট অভিমান, একসঙ্গে দেখা স্বপ্ন এসবই তাকে আজও ভেতর থেকে একটু একটু করে গড়ে দেয়।
এভাবেই একটা মেয়ের শৈশবে বড় হয়ে ওঠা। বইয়ের পাতা বদলায়, ক্লাস বদলায়, মানুষ বদলায়, শহর বদলায়। শুধু কিছু স্মৃতি থেকে যায় যেগুলো কখনো পুরোনো হয় না। আর সেই স্মৃতির ভেতরেই হয়তো আজও এক ছোট্ট মেয়ে স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে তার বন্ধুদের কথা ভাবে।