19/05/2022
এবার আসুন দেখে আসি পদ্মা সেতুর ইতিহাস,এর ষড়যন্ত্র নানান সমালোচনা সব ছাপিয়ে কিভাবে নির্মাণ সম্পন্ন হলো কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
পদ্মা সেতু শুধু দক্ষিনাঞ্চলেরই নয় পুরো দেশের স্বপ্নের একটি পদ্মা সেতু।তিলে তিলে করে গড়ে তুলতে হয়েছে এই সেতুকে।শুরু থেকেই এই সেতুর পথচলা মসৃণ ছিলো না।
সর্বপ্রথম ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা সেতুর সম্ভাব্যতা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করান সেসময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। ২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু পরবর্তী ১৩ বছরে আর কেউ একটা সিমেন্টও কিনে নাই পদ্মা সেতুর জন্য।
২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় লাভ করেন।কোন অগ্রগতি না করেই ২০০৫-এ পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাথমিক প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১২,০০০/- কোটি টাকা। তবে প্রধানমন্ত্রী সর্বমোট নির্মাণ ব্যয় ১০,০০০/- কোটি টাকায় সীমিত রাখার পরামর্শ প্রদান করেন।🙃আর এতে আরেক দফায় বন্ধ হয়ে যায় পদ্মা সেতুর উঠে দাড়ানোর পথ।
তারপর ক্ষমতা আসে সেনাশাসিত ফখরুদ্দীন সরকারের হাতে। ২০০৭ সালে তারা ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা দিয়ে পদ্মা সেতু বানানোর প্রকল্প পাস করেন।কিন্তু আর আগায় নেই সেই পদ্মা সেতুর কাজ।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠনের পর আবারও পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।সরকারের পরিকল্পনা ছিল বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে। ২০১১ সালের ২৮ শে এপ্রিল বিশ্ব ব্যাংকের সাথে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চুক্তি সই হয়। ১৮ মে জাইকার সঙ্গে, ২৪শে মে আইডিবির সঙ্গে এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ঐ বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে।কিন্তু এখানে হাস্যকর কথাটা হচ্ছে আপনি আমাকে টাকাই ছাড় করেন নাই, আর ছাড় না করতেই দুর্নীতি হয়ে গেলো।তারপর কানাডার আদালত প্রমান করল কোন দুর্নীতি হয় নাই।আপনি আবারোও মাথায় নেন, যেখানে টাকাই ছাড় করা হয় নাই কিভাবে দুর্নীতি করবে কিভাবে?আসলে এখানে যে দেশী বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়েছে এটা কারো অজানার কথা নয়।এদিকে আর কথা নাইবা বাড়ানো হলো।
আবারো থেমে গেলো পদ্মা সেতুর উঠে দাঁড়ানো।
এখানে একটু বলে নেই কিভাবে ১০ হাজার কোটি টাকার সেতু আজকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বমোট বাজেট ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা হয়ে গেলো।
আপনি জানেন কি পদ্মা সেতু প্রকল্পের নাম পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প।
পদ্মা সেতুর মূল কাজ পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে মূল সেতু, নদীশাসন, দুই তীরে দুটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ, নির্মাণ অবকাঠামো তৈরি। মূল সেতুর কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। নদীশাসনের কাজ পেয়েছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুই তীরে সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ করছে বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড।
মূল পদ্মা সেতুর ব্যয় কত জানেন?মূল সেতুর কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।ওই যে ১০ হাজার কোটি টাকা করতেন না এটাই সেটা। এটা বেড়েছে এর সাথে রেল লাইন যুক্ত হওয়াতে। মানে প্রথমে এক তলা বিশিষ্ট সেতু হলেও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতল পদ্মা সেতু বানাতে নির্দেশ দেন।যাতে করে নিচ দিয়ে রেল চলতে পারে।যা শুরুতে ছিলো না।তার জন্য পিলার নক্সা সব কিছু আবার পরিবর্তন করা লেগেছে। ফলে এইখানে মূল পদ্মা সেতুর ব্যয় ধার্য করা হয় ১২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।
মূল সেতু ছাড়া নদী শাসন কাজের চুক্তিমূল্য ৮ হাজার ৯৭২ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার বাস্তব কাজের অগ্রগতি শতভাগ সম্পন্ন করেই ফেলছে আমাদের দেশীয় আবদুল মোনেম লিমিটেড। এ খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৫১ কোটি টাকা।এছাড়াও সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, ও পরিবেশ খাত এবং পরামর্শক, সেনা নিরাপত্তা, ভ্যাট, আয়কর, যানবাহন, বেতন, ভাতাদিসহ অন্যান্যসহ এসব খাতে ৭ হাজার ৬৫৮ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দ ৪ হাজার ৩৪২ দশমিক ২৬ কোটি টাকা।
পরামর্শক, সেনা নিরাপত্তা, ভ্যাট, আয়কর, যানবাহন, বেতন, ভাতাদিসহ অন্যান্য খাতে খরচ ২ হাজার ৮৮৫ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা।
বিভিন্ন কারণে আরো ভূমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে,নদী শাসনের ব্যয় বেড়ে গেছে আর এতে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের খরচ বেড়েছে।আর এমন ভাবে খবর হয়েছে যে ,১০ হাজার কোটি টাকার সেতু ৩০ হাজার কোটিতে চলে গেছে।আপনাকে আবারো জানাইয়া দেই, মূল সেতুর কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।এই টাকা বাড়ে নাই নাই।
খরচের কথা বলে ফেললাম এই টাকা তো বিশ্ব ব্যাংক দেয় নাই, আসলো কোথা থেকে?
বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের মন রক্ষার্থে নানান ব্যবস্থা নেয়। বাধ্য হয়ে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল যদিও দুর্নীতির কোন প্রমাণ পায়নি।ততকালীন যোগাযোগমন্ত্রী জনাব আবুল হোসেনকে ইস্তফা দিতে বললে তিনি ইস্তফা দেন। সচিব মোশারফ হোসেন ভুঁইয়াকে বদলি করা হয়। প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান টিম গঠন করে। পরবর্তীতে সাত জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়।
এতোসব ব্যবস্থা নিলেও বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হয়নি। তারা ২০১২ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ঋণচুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংককে অনুসরণ করে জাইকা, এডিবি ও আইডিবি ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয় ।আবারো পদ্মা সেতুর উঠে দাড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে কানাডার আদালতে মামলাও করে কিন্তু সেইসকল মামলায় হেরে যায় বিশ্বব্যাংক।১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ আদালত অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে মামলা খারিজ করে দেয় এবং অভিযুক্তরা খালাস পায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ জুলাই ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে। প্রধানমন্ত্রী একটা বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিলেন যে—না, পদ্মা সেতু আমাদের টাকায় হবে এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা এটার তদারকির দায়িত্বে থাকবে। যেখানে আমাদের জ্ঞানের অভাব আছে, অভিজ্ঞতার অভাব আছে সেখানে আমরা বিদেশিদের আনব।যেমন কথা তেমন কাজ।
শুরু হয় দেশবাসীর বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ।আন্তর্জাতিক টেন্ডারে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড কাজ পায়। ১৭ জুন ২০১৪ তারিখে সেতু কর্তৃপক্ষ চায়না ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানিকে সেতু নির্মাণের জন্য ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচন করে।
তারা ২০১৪ সালের ২৬শে নভেম্বর থেকে কাজ শুরু করে। সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয় ২০১৭ সালের ৩০শে সেপ্টম্বর।এর মধ্যেও মাঝের পিলারে নদীর তলদেশের নানান পরিবর্তনে পিলারেরও আবারো পরিবর্তন আসে।বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মালামাল রাখার ইয়ার্ডে। পদ্মা সেতুর বেশ কিছু রেলওয়ে স্ল্যাব নদী গর্ভে হারিয়ে যায় সর্বানাশা পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে।
তারপর করোনা শুরু হলে কাজ আরো এক দফায় থমকে যায়। সর্বশেষ স্প্যান ১০ ডিসেম্বর ২০২০ সালে পদ্মা সেতুর ১২ ও ১৩ তম পিলারে ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পুরো পদ্মা সেতু।
টাকা আসলো কোথা থেকে? এবং টোল কেন দেয়া লাগবেঃ
উপরের এসব কাজের জন্য টাকা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হলেও এজন্য ব্যয়িত অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে তারা। এ ঋণ সুদসহ ৩৫ বছরে সেতু বিভাগকে ফেরত দিতে হবে।
এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনুদান রয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। সেতু বিভাগকে আসল হিসাবে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে বাড়তি ১ শতাংশ হারে সুদ গুনতে হবে। অর্থাৎ সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে ৩৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।অর্থাৎ এই টাকা শোধ করার জন্যই টোল দেয়া লাগবেই।
ধরেন সরকার টোল নিল না। এতে করে যান বাহন ফ্রিতে চললো,এতে আপনার লাভটা কি?
আপনি ১০ টা ট্রাকের মালিক হোন, তাহলে আপনার লাভ। কারণ টোল দেয়া লাগবে না, রমরমা ব্যবসা চলবে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যার জীবনে পদ্মাসেতু ব্যবহার না করে উত্তরবঙ্গে যাওয়া লাগবে না, তার কি উপকার হলো?মানে সে শুধু উত্তরবঙ্গেই আসা যাওয়া করে থাকে, তার তো পদ্মা সেতু ব্যবহার করা লাগছে না।
তার তো অপকারই হলো,কারণ পদ্মা সেতু করতে তার ভ্যাট ট্যাক্স তো দেয়া লাগছে।
পদ্মাসেতু ব্যবহারকারীরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবে, আর আপনি শুকিয়ে যেন না মরেন সেজন্য সরকার টোল আদায় করবে।সেটা দেশের মানুষের মাঝে বিভিন্ন ভর্তুকি দেয়ার মাধ্যমে বা যেকোন ভাবে সবার উপকার করবে অন্য কোন প্রকল্প নেয়ার মাধ্যমে।
আর সর্বশেষ এপ্রিল ২০২২ সালে পদ্মা সেতুতে কার্পেটিংয়ের (পিচ ঢালাই) কাজ শেষ হয়েছে।সব কিছু ঠিক থাকলে জুন মাসেই পদ্মা সেতু খুলে দেয়ার কথা রয়েছে।টোলও ধার্য করে দেয়া হয়েছে, এখন আর পেছনে না তাকিয়ে পদ্মা সেতু আমাদের অর্থনীতি কোথায় নিয়ে যাবে সেসব নিয়ে ভাবেন।আর এর সফলতা কামনা করেন।