06/11/2026
Letter to Miliona
পর্ব–১ : আগমনের ৩৭তম দিন
প্রিয় মিলিওনা,
তুমি কেমন আছ?
এই চিঠি যখন লিখছি, তখন অস্ট্রেলিয়ার নিউ-ক্যার্নস মেগাসিটির আকাশে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কাঁচের তৈরি আকাশছোঁয়া ভবনগুলোর গায়ে অস্তগামী সূর্যের আলো পড়ে সোনালি রঙের আগুনের মতো জ্বলছে। জানালার পাশে বসে আমি দূরে তাকিয়ে আছি, আর ভাবছি—মাত্র ৩৭ দিন আগে আমি পৃথিবীর আরেক প্রান্তে ছিলাম। অথচ এখন মনে হচ্ছে যেন কয়েক বছর কেটে গেছে।
তুমি জেনে খুশি হবে, আমি ভালো আছি। অন্তত শারীরিকভাবে। কিন্তু মনের কথা যদি বলি, তাহলে এখানে নিজেকে মাঝে মাঝে এতটাই একা লাগে যে মনে হয় আমি কোনো শহরে নয়, বিশাল কোনো মহাকাশযানের ভেতরে বন্দি হয়ে আছি।
এই শহরকে শহর বললে ভুল হবে। এটি আসলে একটি জীবন্ত যন্ত্র।
এখানে সূর্য ওঠার আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো নগরীকে জাগিয়ে তোলে। রাস্তায় ঝাড়ু দেয় স্বয়ংক্রিয় রোবট। ড্রোনগুলো ভোরের আলো ফুটতেই খাবার, ওষুধ, যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে বেরিয়ে পড়ে। ট্রাফিক সিগন্যাল নেই, কারণ যানবাহনের সবকিছুই এআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
মানুষের ভুলের সুযোগ এখানে খুব কম।
প্রথম দিন আমি ভেবেছিলাম, এ যেন স্বপ্নের পৃথিবী।
কিন্তু ৩৭ দিনের মাথায় বুঝতে পারছি, স্বপ্নের পৃথিবীতেও নিঃসঙ্গতা থাকতে পারে।
আমি যে কর্পোরেট সোসাইটিতে কাজ করছি, সেটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র। এখানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করে। অথচ অবাক ব্যাপার হলো, প্রতিদিন শত শত মানুষের পাশ দিয়ে হাঁটলেও কারও সঙ্গে তেমন কথা হয় না।
সবাই ব্যস্ত।
সবাই নির্ধারিত।
সবাই যেন একটি বিশাল অ্যালগরিদমের অংশ।
সকালে অফিসে ঢুকি। বায়োমেট্রিক স্ক্যানার আমার চোখের রেটিনা শনাক্ত করে। তারপর এআই সহকারী দিনের কাজের তালিকা পাঠিয়ে দেয়।
এরপর শুরু হয় কাজ।
কাজ।
আর কাজ।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি মানুষ নই, একটি উন্নতমানের রোবট।
এখানে কেউ তোমাকে বকবে না, কেউ তোমার ওপর চিৎকার করবে না। কিন্তু অদ্ভুত এক নীরব চাপ সবসময় অনুভব করা যায়।
যেন অদৃশ্য কোনো সেনাবাহিনী আমাদের পরিচালনা করছে।
একদিন কৌতূহলবশত আমি ডেস্ক ছেড়ে আধা ঘণ্টা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সহকারী এআই একটি বার্তা পাঠালো—
“আপনার উৎপাদনশীলতা ১৭% কমেছে। আপনি কি সহায়তা চান?”
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এখানে অলসতা অপরাধ নয়, কিন্তু অলসতার অস্তিত্বই নেই।
আমার অফিস ভবনের ১৪৩ তলার জানালা থেকে পুরো শহর দেখা যায়।
বিশেষ করে আকাশ।
সারাদিন অসংখ্য ড্রোন উড়ে বেড়ায়। তাদের চলাচল এত নিখুঁত যে মনে হয় আকাশে অদৃশ্য রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাখির ঝাঁক উড়ছে।
কিন্তু কাছে তাকালে বোঝা যায়—ওগুলো ধাতু, সার্কিট আর কোডের তৈরি।
তখন মনে হয়, প্রকৃতি আর প্রযুক্তির মাঝের সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।
এখানে সপ্তাহের পাঁচ দিন শহর প্রায় নিঃশব্দ।
মানুষ ঘর থেকে অফিসে যায়, অফিস থেকে ঘরে ফিরে আসে।
রাস্তার ক্যাফেগুলো খোলা থাকে, কিন্তু চেয়ারগুলো প্রায় ফাঁকা।
কখনো কখনো আমি ইচ্ছে করে সেখানে বসে থাকি।
মানুষ দেখি।
তাদের মুখ দেখি।
কিন্তু কারও চোখে গল্প খুঁজে পাই না।
যেন সবাই কিছু হারিয়ে ফেলেছে।
হয়তো আমিও।
তবে সপ্তাহান্তে সব বদলে যায়।
শনিবার সন্ধ্যা নামলেই শহর জেগে ওঠে।
হোলোগ্রাফিক পার্ক, ভার্চুয়াল কনসার্ট, ডিজিটাল উৎসব—সব জায়গায় মানুষের ভিড়।
তখন মনে হয়, পুরো শহর একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, সোমবার সকাল এলেই সেই প্রাণচাঞ্চল্য আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।
এখানে প্রায় সব আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব "গভর্নিং নেট" নামে একটি কেন্দ্রীয় এআই সিস্টেম পরিচালনা করে।
বেতন, কর, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন—সবকিছু স্বয়ংক্রিয়।
মানুষকে আর ফর্ম পূরণ করতে হয় না।
কাউকে লাইনে দাঁড়াতে হয় না।
কাউকে অনুরোধ করতে হয় না।
প্রথমদিকে এটা স্বর্গের মতো মনে হয়েছিল।
কিন্তু এখন ভাবি—
যখন সব সিদ্ধান্ত যন্ত্র নেবে, তখন মানুষের স্বাধীনতার জায়গাটা কোথায়?
আজ সকালে একটি নতুন নোটিফিকেশন পেলাম।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
"Citizen Power Special Offer"
এটি গ্রহণ করলে আমি পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা পাব।
আজীবন আর্থিক নিরাপত্তা।
উন্নত চিকিৎসা।
বিশেষ আবাসন সুবিধা।
আর অনেক কিছু।
কিন্তু শর্তগুলো পড়ে আমি থমকে গেলাম।
লেখা ছিল—
“অতীতের সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পদ কেন্দ্রীয় ট্রাস্টে স্থানান্তর করতে হবে। জরুরি অনুমতি ব্যতীত তা ব্যবহার করা যাবে না।”
আমি দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এটা কি নিরাপত্তা?
নাকি নিয়ন্ত্রণ?
সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও খুঁজে পাইনি।
রাত নামার পর অফিসের আলো নিভে গেল।
আমি একা বসে ছিলাম।
দূরে আকাশে ড্রোনের আলো জ্বলছিল।
হঠাৎ আমার ব্যক্তিগত স্ক্রিনে একটি বার্তা ভেসে উঠল।
প্রেরকের নাম নেই।
কোনো পরিচয় নেই।
শুধু একটি বাক্য—
"যদি সত্য জানতে চাও, সেক্টর-৭ খুঁজে বের করো।"
আমি বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলাম।
সেক্টর-৭?
এই শহরের কোনো সরকারি মানচিত্রে এমন কোনো স্থানের নাম নেই।
বার্তাটি মাত্র পাঁচ সেকেন্ড ছিল।
তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল।
কিন্তু অদৃশ্য হলো না আমার কৌতূহল।
জানালার বাইরে তাকালাম।
দূরে রাতের আকাশে একটি বিশাল কার্গো ড্রোন অন্ধকার চিরে এগিয়ে যাচ্ছে।
তার লাল আলো বারবার জ্বলছে।
হঠাৎ কেন জানি মনে হলো—
এই শহরের সবকিছু আমরা যা দেখি, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
হয়তো এখানে এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যা সাধারণ নাগরিকদের জানার কথা নয়।
হয়তো এই নিখুঁত পৃথিবীর ভেতরে কোনো অসম্পূর্ণ সত্য ঘুমিয়ে আছে।
আর হয়তো সেই সত্যের পথ শুরু হচ্ছে—
সেক্টর-৭ থেকে।
চিঠি এখানেই শেষ করছি, মিলিওনা।
আগামী চিঠিতে যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে তোমাকে সেক্টর-৭ এর রহস্যের কথা লিখব।
ততদিন ভালো থেকো।
— তোমার দূরবর্তী বন্ধু
#1
#বাংলা_সাইন্স_ফিকশন #মিলিওনাকে_চিঠি #ভবিষ্যতের_পৃথিবী #রহস্য_ও_প্রযুক্তি #সাইবার_সিটি #কল্পবিজ্ঞান #চিঠির_গল্প