04/05/2026
ক্ষমতার কেন্দ্রে বসা ব্যক্তিটিকে আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি, তার সমালোচনাও করি—কখনো তীব্রভাবে, কখনো আবেগে। কিন্তু রাজনীতি বিজ্ঞান ও অর্থনীতির গভীরে গেলে প্রশ্নটা অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়: এই ক্ষমতার কাঠামোটি তৈরি হলো কীভাবে? একজন ব্যক্তি কি নিজে নিজেই ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে, নাকি তাকে তৈরি করে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ? বাস্তবতা হলো—কোনো ফ্যাসিস্ট, কোনো দাম্ভিক শাসক নিজে নিজে জন্ম নেয় না; তাকে তৈরি করা হয়। সেই তৈরির প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে জনগণের একটি অংশ, তাদের আচরণ, তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং তাদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা।
রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—ক্ষমতা কখনো শূন্যে জন্ম নেয় না, বরং এটি সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। যখন আনুগত্য অন্ধ হয়ে যায় এবং সমর্থন শর্তহীন হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভেতরেই স্বৈরতন্ত্রের বীজ রোপিত হয়। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি “principal-agent problem”—যেখানে জনগণ (principal) তাদের প্রতিনিধি (agent)-কে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, বরং agent-ই ধীরে ধীরে principal-এর উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে। এই ব্যর্থতা তখনই প্রকট হয় যখন জনগণ তাদের ভোটকে মূল্যবান রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার না করে বরং তা বিনিময়যোগ্য পণ্যে পরিণত করে।
গণতন্ত্রে বলা হয়—সমস্ত ক্ষমতার উৎস জনগণ। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এই ধারণাটি অনেক সময় একটি কৌশলগত বয়ানে পরিণত হয়। নির্বাচনের সময় রাজনীতিবিদরা জনগণের কাছে যান, প্রতিশ্রুতি দেন, কখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদান করেন—এগুলো আসলে এক ধরনের বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত রিটার্ন তারা পরে ক্ষমতায় গিয়ে তুলে নেয়—দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে। ফলে গণতন্ত্র একটি প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি বিনিয়োগ-ফেরত (investment-return) মডেলেও পরিণত হয়, যেখানে জনগণের একটি অংশ স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেই লেনদেনের অংশীদার হয়ে পড়ে।
পণ্ডিত ও তাত্ত্বিকরা সাধারণত জনগণকে সরাসরি সমালোচনা করেন না—এর পেছনেও একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করে। প্রথমত, জনগণের সমালোচনা করা রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয়। এটি “popularity market”-এ নিজের অবস্থান দুর্বল করে দেয়। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক বয়ানে জনগণকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে তুলে ধরা একটি অপরিহার্য কৌশল, যা ভেঙে দিলে পুরো কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তৃতীয়ত, জনগণকে প্রায়ই প্রতারিত বা বিভ্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করে তাদের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সহানুভূতি অনেক সময় জবাবদিহিতার জায়গাটি দুর্বল করে দেয়, ফলে জনগণ নিজেও তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়।
দুর্নীতির প্রশ্নে আমরা প্রায়ই রাজনীতিবিদ ও আমলাদের দায়ী করি—এবং তা অবশ্যই সঙ্গত। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্নীতি একটি পারস্পরিক সম্পর্ক (reciprocal relationship)। রাজনীতিবিদরা সুযোগ তৈরি করে, আমলারা তা বাস্তবায়ন করে, আর সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সেটিকে টিকিয়ে রাখে। এই তিন পক্ষের সমন্বয়ে একটি “corruption equilibrium” তৈরি হয়, যেখানে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়, ফলে এই ব্যবস্থা ভাঙার প্রণোদনা দুর্বল হয়ে পড়ে। এখানে জনগণের একটি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই চক্রের অংশ হয়ে যায়—কখনো সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে, কখনো নীরব সমর্থনের মাধ্যমে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জনগণের একটি অংশ কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ সুবিধা ছাড়াই শুধুমাত্র অন্ধ দলীয় আনুগত্যের কারণে অসৎ রাজনীতিবিদদের সমর্থন দেয়। এই গোষ্ঠীটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এদের সমর্থন যুক্তিনির্ভর নয়, বরং পরিচয়, আবেগ এবং দলীয় বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে। এর পরের স্তরে রয়েছে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী—যারা ব্যক্তিগত লাভের বিনিময়ে ক্ষমতাসীনদের দোসর হয়ে ওঠে। এই দুই গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রভাবেই একটি শাসকগোষ্ঠী ধীরে ধীরে জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়।
যখন জনগণ তাদের ভোটকে সাময়িক সুবিধার বিনিময়ে বিক্রি করে, তখন তারা আসলে নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হস্তান্তর করে। এর ফলে একটি নৈতিক সংকট তৈরি হয়—যেখানে জনগণ নিজেরাই সেই শাসকদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতা দাবি করার নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলে। অর্থনীতির ভাষায় এটি “moral hazard”—যেখানে একটি পক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে কারণ সে জানে যে তার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে না। এই পরিস্থিতি রাজনীতিবিদদের আরও বেপরোয়া করে তোলে এবং ধীরে ধীরে তারা স্বৈরাচারী চরিত্র ধারণ করে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তির রূপান্তর এই পুরো প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক ফলাফল। যখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কার্যকর জবাবদিহিতা থাকে না, যখন সমালোচনা দমন করা হয় এবং যখন আনুগত্যকে পুরস্কৃত করা হয়—তখন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করতে শুরু করে। এটি ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের বিষয় নয়, বরং কাঠামোগত বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় একজন নেতা ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক সীমারেখা অতিক্রম করে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের বয়ান নির্মাতারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টিভি টকশো, সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে একটি “information market” তৈরি হয়েছে, যেখানে মতামত একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে সত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বয়ান, এবং বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি বিক্রি হয় অবস্থান। এর ফলে জনগণ একটি বিকৃত বাস্তবতা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দুর্বল করে।
বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত ও স্বল্পশিক্ষিত সমাজে এই সমস্যাগুলো আরও তীব্র আকার ধারণ করে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সীমিত শিক্ষার প্রসার, এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে একটি “low accountability trap” তৈরি হয়—যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও কাঠামোর পরিবর্তন হয় না। ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু পদ্ধতি একই থাকে। একজন শাসকের জায়গায় আরেকজন আসে, কিন্তু শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থাকে।
অতএব, প্রশ্নটা শুধু রাজনীতিবিদদের দায় নিয়ে নয়—প্রশ্নটা জনগণের ভূমিকা নিয়েও। গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, বরং একটি ধারাবাহিক জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া। যদি জনগণ সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অসৎ রাজনীতিবিদদের উত্থান অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এখানে একটি সরল কিন্তু কঠিন সত্য রয়েছে—যদি একটি বেয়াড়া গরুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়, তাহলে তার শিংয়ের গুঁতো একসময় সহ্য করতেই হবে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। জনগণ যদি তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই প্রতিনিধিরাই একসময় জনগণের উপর চেপে বসে।
শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে জনগণের সচেতনতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের উপর। খারাপ ও অসৎ মানুষকে নির্বাচিত করলে তারা একটি দুর্নীতির বলয় তৈরি করবে—যেখানে রাজনীতিবিদ, আমলা এবং প্রশাসন মিলিতভাবে একটি অপ্রতিরোধ্য কাঠামো গড়ে তুলবে। সেই কাঠামো ভাঙা তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথম শর্ত হলো—জনগণকে নিজেদের ভূমিকা স্বীকার করতে হবে। কারণ ক্ষমতার প্রকৃত রূপ নির্ধারণ করে শুধু ক্ষমতাসীন নয়, বরং যারা তাকে ক্ষমতায় বসায়।
মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।