08/16/2026
১৫ আগস্ট: রক্ত, ষড়যন্ত্র ও অবিচল সংকল্প
জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে —
প্রতি বছর ১৫ আগস্ট এলে আমি একই দৃশ্য কল্পনা করি—ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি, ভোরের অন্ধকার, আর সেই গুলির শব্দ যা আজও যেন কানে লেগে আছে। এই দিনটা শুধু একটা তারিখ না, এটা এমন একটা ক্ষত যা কখনো পুরোপুরি শুকায় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী, পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল—আর সবচেয়ে বেশি যেটা মন থেকে সরে না, দশ বছরের ছোট্ট শেখ রাসেল, যে সেদিন প্রাণভিক্ষা চেয়েও রেহাই পায়নি।
গত ১৫ই আগষ্ট বস্টনে আমরা যখন এই স্মরণসভায় বসেছিলাম, তখন উপলব্ধি করলাম—শুধু চোখের জল ফেলা যথেষ্ট না। ইতিহাসের কিছু দলিল সামনে আনা দরকার, যাতে নতুন প্রজন্ম জানে ঠিক কী ঘটেছিল, আর কেন।
এই হত্যাকাণ্ডের বীজ বপন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই। মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ তখন গোপনে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সাথে আলোচনা চালাচ্ছিলেন। এই বিশ্বাসঘাতকতা ধরা পড়েও তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। স্বাধীনতার পর তিনি মন্ত্রিসভায় ফেরেন, আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হয়ে ওঠেন ঘাতকদের রাজনৈতিক মুখ—যিনি হত্যাকারীদের "সূর্য সন্তান" বলে অভিহিত করে তাদের বিচারের ঊর্ধ্বে রাখার আইন তৈরি করেছিলেন।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিক্লাসিফাইড আরকাইভ (FRUS ভলিউম E-8, ডকুমেন্ট ৪২) অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরপরই হেনরি কিসিঞ্জারের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানকে "সুপরিকল্পিত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত" বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের গবেষণা অনুযায়ী সিআইএ-র ঢাকাস্থ স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরির এই ষড়যন্ত্রে ভূমিকা ছিল বলে দাবি করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর কিসিঞ্জার প্রশাসনের দ্রুত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়াকেও অনেক ইতিহাসবিদ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন।
১৯৭৬ সালে দ্য সানডে টাইমসে ঘাতক কর্নেল ফারুক রহমান দাবি করেছিলেন, মোশতাকের ভাগ্নে আব্দুর রশিদ জিয়াউর রহমানের কাছে এই পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন এবং জিয়া তাতে সম্মত হয়েছিলেন। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, সরাসরি প্রশ্ন করা হলে জিয়া তা অস্বীকারও করেননি, স্বীকারও করেননি। হত্যাকাণ্ডের পর জিয়া মোশতাকের মন্ত্রিসভায় সেনাপ্রধান হিসেবে বহাল থাকেন, পরে খুনিদের রাষ্ট্রীয় চাকরি ও বিদেশে কূটনৈতিক পদে পুনর্বাসন করেন, এবং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে তাদের বিচারের পথ বন্ধ করে দেন।
একুশ বছর ধরে ঘাতকরা বিচারের বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ১৯৯৬ সালে মামলা পুনরায় খোলা হয়, ১৯৯৮ সালে বারোজন দণ্ডপ্রাপ্ত হন, ২০১০ সালে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়, এবং ২০২০ সালে পলাতক আব্দুল মাজেদকেও ধরা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে আমরা আবার দেখলাম কীভাবে একজন নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতাকে—এবার বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে—ক্ষমতাচ্যুত করা হলো। আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযোগ করেছেন, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য মৌলবাদী সংগঠন ছাত্র আন্দোলনের কাঁধে ভর করে সহিংসতা ছড়িয়েছিল। দলের অনুসারীরা প্রশ্ন তুলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়েও।
আমি প্রায়ই ভাবি, প্রবাসে বসে আমরা ইতিহাস কতটা মনে রাখি। কিন্তু ১৫ আগস্ট এলে বুঝি—কারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল, কারা তাদের আশ্রয় দিয়েছিল, এসব ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই আদর্শ, এই স্বপ্ন—আমাদের সন্তানদের হাতেও তুলে দিতে হবে।
খুনিরা মরে গেছে, এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে কয়েকজন। কিন্তু মুজিব বেঁচে আছেন, মুজিব বেঁচে থাকবেন।
জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
#জাতীয়শোকদিবস #১৫আগস্ট #বঙ্গবন্ধু #আওয়ামীলীগ