01/09/2026
আমেরিকায় আমরা অনেক সময় একটা কথা বলি। ওরা তো পাবলিক বেনিফিট পায়, আর আমরা পাই না। এই কথার ভেতরে কষ্ট আছে, রাগ আছে, দিনরাত খেটে ক্লান্ত হওয়ার ব্যথা আছে। কিন্তু ভাই, আগে আসল কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকা উন্নত দেশ হলেও, ইউরোপ, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় পাবলিক বেনিফিট দেওয়ার দিক থেকে আমেরিকা আসলে অনেক পিছিয়ে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে এটি এমন এক দেশ, যেখানে সরকারি সহায়তা কম আর নিয়ম সবচেয়ে বেশি কড়া।
ইউরোপের অনেক দেশে হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ প্রায় ফ্রি বা খুব কম খরচে পাওয়া যায়। চাকরি হারালে সরকার কিছুদিন নিয়ম করে বেকার ভাতা দেয়। বাচ্চা থাকলে চাইল্ড বেনিফিট দেয়। ইনকাম কম হলে বাসা ভাড়ায় সাহায্য করে। বয়স হলে পেনশন নিশ্চিত করে। এসব দেশের মানুষ বেশি ট্যাক্স দেয় ঠিকই, কিন্তু তার বদলে সরকার মানুষের জীবনের বড় দায়িত্ব নেয়। সেখানে কেউ বেকার হলে সমাজ তাকে ব্যর্থ বলে না।
কানাডা আর অস্ট্রেলিয়াতেও অবস্থা প্রায় এমনই। স্বাস্থ্যসেবা সহজ, বেকার ভাতা আছে, বাচ্চাদের জন্য সহায়তা আছে। আবার কাজ করার ওপরও জোর দেওয়া হয়। জাপান আর কোরিয়ার মতো দেশেও জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা আছে, বৃদ্ধদের সহায়তা আছে। মানে এসব দেশে মানুষ যেন একেবারে পড়ে না যায়, সেটার ব্যবস্থা রাষ্ট্র করে রাখে।
এবার আমেরিকার কথায় আসি। এখানে হাসপাতাল ফ্রি না। ইন্স্যুরেন্স না থাকলে একবার ডাক্তার দেখাতেই বড় অঙ্কের টাকা লাগে। Medicaid, SNAP, Housing এসব আছে ঠিকই, কিন্তু নিয়ম এত কড়া যে অনেকেই যোগ্য হয় না। ইনকাম একটু বাড়লেই বাদ পড়ে যায়। অনেক জায়গায় ওয়েটিং লিস্ট বছরের পর বছর। আর ইমিগ্র্যান্টদের জন্য তো শর্ত আরও কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ বছর না হলে কিছু সুবিধার কথা চিন্তাই করা যায় না।
এই জন্য যারা আমেরিকায় কিছু বেনিফিট পায়, তারা খুব বড় কিছু পাচ্ছে এমন ভাবার দরকার নেই। বেশিরভাগ সময় তারা শুধু ন্যূনতমভাবে বেঁচে থাকার মতো সাহায্য পায়। এর সঙ্গে থাকে কাগজপত্রের ঝামেলা, নিয়মের চাপ, রিপোর্ট দেওয়ার ভয়, সবসময় অনিশ্চয়তা। কেউ শখ করে এই জীবন বেছে নেয় না।
আবার যারা বেনিফিট পায় না, তারা কোনোভাবেই ব্যর্থ না। বরং তারা কাজ করছে, ট্যাক্স দিচ্ছে, পরিবার চালাচ্ছে। সিস্টেম তাদের বলছে, তুমি এখন নিজেরটা চালাতে পারছ, তাই এই সহায়তা তোমার জন্য না। এটা লজ্জার কিছু না। এটা সক্ষমতার চিহ্ন।
সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা রাগটা সিস্টেমের ওপর না করে আরেকজন গরিব মানুষের ওপর করি। যে মানুষটা বেনিফিট পাচ্ছে, সে অনেক সময় অসুস্থ, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বা জীবনের কঠিন অবস্থার মধ্যে আছে। তাকে দেখে হিংসা করলে কোনো লাভ নেই। এতে কমিউনিটি ভাঙে, মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ে।
সত্যি কথা হলো, আমেরিকায় পাবলিক বেনিফিট ইউরোপের মতো বেশি না। বরং কম। নিয়ম কড়া, জীবনযাত্রার খরচ বেশি। তাই এখানে আমাদের একে অন্যকে দোষ না দিয়ে বাস্তবটা বুঝে চলা দরকার।
আজ কারও দরকার ছিল, সে পেয়েছে। কাল আপনার বা আমার দরকার হতে পারে। জীবন কারো হাতে থাকে না। তাই হিংসা নয়, মানবিক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। বিচার করার চেয়ে বোঝা আর সাহায্য করা বড়। আর যদি কিছু অন্যায় মনে হয়, সেটা নিয়ে কথা বলুন সিস্টেমের নিয়ম নিয়ে, কোনো গরিব মানুষকে লক্ষ্য করে নয়।
শেষ কথা একটাই। আমরা সবাই একই কমিউনিটির মানুষ। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ পড়ে গেছে। কিন্তু মানুষ হয়ে থাকতে পারলে, একদিন সবাই আবার উঠে দাঁড়াতে পারে।