06/10/2026
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব এসে গেছে। ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ইতিমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে রাজনৈতিক টুর্নামেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো — তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে এই অভূতপূর্ব মহাযজ্ঞ, যেখানে মোট ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে এবং ১৬টি ভেন্যুতে মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলা হবে। মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত আজটেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে এই টুর্নামেন্ট, আর ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহাসিক ফাইনাল। কিন্তু মাঠের বাইরে যা ঘটছে, তা অনেক সময় মাঠের লড়াইকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনাটি হলো ইরান প্রশ্ন। ইরান জাতীয় দল, যারা "টিম মেল্লি" নামে পরিচিত, এই টুর্নামেন্টে গ্রুপ-জিতে বেলজিয়াম, মিশর ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলবে। ইরানের প্রথম ম্যাচ ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই যাত্রাপথ ছিল কাঁটায় ভরা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে, যদিও এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বলবৎ আছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানসহ ১২টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রদান বন্ধ রাখে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে "রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী পৃষ্ঠপোষক" হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে ইরানের হাজার হাজার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশই করতে পারছেন না। এমনকি গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ ড্র অনুষ্ঠানেও ইরান যোগ দিতে পারেনি — কারণ তাদের ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি। ইরান ফুটবল ফেডারেশন এটিকে "খেলাধুলায় সবচেয়ে জঘন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ" বলে আখ্যায়িত করে, এবং বিষয়টি ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানায়।
পরবর্তীতে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান যে ইরানের খেলোয়াড়, কোচ ও প্রশিক্ষকদের ভিসা দেওয়া হয়েছে, তবে কিছু "সহায়ক কর্মীকে" ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবেদনের কারণে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ইরান দলকে টুর্নামেন্ট চলাকালীন মেক্সিকোতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তেহরানে দলের বিদায়ী মিছিলে সমর্থকরা "আমেরিকার মৃত্যু হোক" স্লোগান দিয়েছেন, আর ইরানের সমর্থকরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় ইরানের ফুটবল ফেডারেশন ইতিমধ্যে বিক্রি করা টিকিটও প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং এর পেছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে।
এই বিশ্বকাপকে অনেকে ইতিমধ্যেই "ইতিহাসের সবচেয়ে রাজনৈতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট" বলছেন। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে ফিফার প্রথম "শান্তি পুরস্কার" (পিস প্রাইজ) প্রদান করেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় তোলে এবং ফিফার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নৈতিক চ্যালেঞ্জও দাখিল হয়।
ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি ও অভিবাসন বিরোধী অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডা ও মেক্সিকোর সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে — অথচ তিনটি দেশ একসঙ্গে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। বিশ্বকাপের মাঠেও আইস (ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এজেন্টদের উপস্থিতির খবরে বিদেশী সমর্থকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতা ও ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠীগুলো বিশ্বকাপ বর্জনের দাবি তুলেছেন, বিশেষত ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি ও অভিবাসন নীতির প্রতিবাদে। একটি আফ্রিকান দেশ ডিআর কঙ্গো ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অংশ নিচ্ছে, এবং স্বাস্থ্য উদ্বেগ থেকে তিনটি আয়োজক দেশই ইবোলাসংক্রান্ত ভ্রমণ বিধিনিষেধ জারি করেছে। বিশ্বের বহু দেশ এই টুর্নামেন্টকে খেলাধুলার উৎসবের চেয়ে আমেরিকার ভূরাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে দেখছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ, অভিবাসন প্রয়োগ ও ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এই টুর্নামেন্টের বাজিকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাঠের বাইরের বিতর্ক সত্ত্বেও বিশ্বকাপ জেতার লড়াইয়ে ইউরোপীয় দলগুলো এগিয়ে। বাজির বাজারে স্পেন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে, তাদের পেছনেই রয়েছে ফ্রান্স। ইংল্যান্ড তৃতীয়, তারপর ব্রাজিল ও পর্তুগাল। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে, তবে লিওনেল মেসি এই টুর্নামেন্টে খেলবেন কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটেনি — যদিও পূর্বাভাস বাজারে ৯৩ শতাংশ মতামত হলো তিনি খেলবেন। ৩৮ বছর বয়সী মেসিকে হন্ডুরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে পেশিজনিত সমস্যায় বিশ্রামে রাখা হয়েছিল। ব্রাজিলের নতুন কোচ কার্লো আন্সেলত্তির তত্ত্বাবধানে ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও রাফিনহাকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দল গড়া হয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ছন্দ তৈরির সময় কম। আয়োজক দল যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপ ডি'তে তুরস্ক, প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলবে, এবং ঘরের মাঠের সুবিধায় তারাও চমক দেখাতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই বিশ্বকাপের টিকিট মূল্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা উঠেছে। ফিফার "ডাইনামিক প্রাইসিং" বা চাহিদানির্ভর মূল্য কাঠামোর আওতায় গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে সস্তা টিকিট মাত্র ৬০ ডলার থেকে শুরু হলেও, ফাইনালের টিকিটের দাম ইতিহাস তৈরি করেছে। এপ্রিলে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল ১০,৯৯০ মার্কিন ডলার — যা মূল বিডিং পর্যায়ে অনুমান করা ১,৫৫০ ডলারের চেয়ে সাত গুণ বেশি। দ্বিতীয় লটারি পর্বে নক-আউট ম্যাচের টিকিটের দাম ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফিফার রিসেল সাইটে ফাইনালের টিকিট ৯,৫৩৮ ডলার থেকে শুরু করে ৫৭,৫০০ ডলার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। আয়োজক দেশের ম্যাচগুলো সবচেয়ে বেশি দামি — বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর খেলায় ক্যাটাগরি-১ টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া।
মোট বিক্রির তথ্যও চোখ কপালে তোলার মতো। ফিফার ঘোষণা অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ১০ লক্ষের বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে, এবং ২১২টি দেশ ও অঞ্চলের মানুষ টিকিট কিনেছেন। শীর্ষ ক্রেতা দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো, তারপরেই রয়েছে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ব্রাজিল, স্পেন, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচে মোট প্রায় ৭১ লক্ষ আসন রয়েছে। টিকিটের আকাশছোঁয়া দামে নিউইয়র্কের মেয়রসহ বহু জনপ্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো অবশ্য দাবি করেছেন যে এই মূল্য "বাজার দরের প্রতিফলন"। সবাই মিলে ৫০ কোটিরও বেশি আবেদন জমা পড়েছিল টিকিটের জন্য।
১১ জুন যখন মেক্সিকো সিটির স্টেডিয়ামে বাঁশি বাজবে, তখন বিশ্বের চোখ কেবল মাঠের দিকে থাকবে না। ইরান-আমেরিকার রাজনৈতিক উত্তেজনা, ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর বিতর্কিত সম্পর্ক, ভিসা সংকট, টিকিটের আগুনদামি মূল্য, ইবোলা আতঙ্ক — সব কিছু মিলিয়ে এটি হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক ফুটবল বিশ্বকাপ। কিন্তু ফুটবলের যাদু এত কিছুকে ছাপিয়ে যায় — আর সেই আশায়ই বুক বাঁধছে গোটা বিশ্ব। মেসি কি শেষবার বিশ্বকাপ তুলে ধরবেন? স্পেন কি নতুন ইতিহাস লিখবে? নাকি কোনো অপ্রত্যাশিত দল চমকে দেবে সবাইকে? উত্তর মিলবে ১৯ জুলাই, নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।