28/12/2025
'"বিয়ে তো লটারির মতো"—এই কথাটি কি সত্যি, নাকি আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিই?
বিয়ে! শব্দটা যতটা রোমান্টিক, বাস্তবতা ঠিক ততটাই কঠিন। আমাদের সমাজে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে একটা চিরন্তন বিতর্কে—"প্রেমের বিয়ে ভালো নাকি পারিবারিক বিয়ে?"
একদল বলেন, "চেনা নেই জানা নেই, ধপ করে একটা মানুষের সাথে এক বিছানায় শোয়া—এ তো লটারি!"
অন্যদল বলেন, "১০ বছর প্রেম করে বিয়ে করার ৬ মাস পরেই ডিভোর্স, এর চেয়ে পারিবারিক বিয়েই নিরাপদ!"
কিন্তু সত্যটা আসলে কী? কেন একসময়ের 'জান-প্রাণ' প্রিয় মানুষটা বিয়ের পর 'অসহ্য' হয়ে ওঠে? আবার কেন সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন মানুষ ৩০ বছর ধরে সুখে সংসার করে? আজ আমরা আবেগের চশমা খুলে, লজিকের ছুরি দিয়ে এই দুটো সম্পর্ককেই ব্যবচ্ছেদ করব। এই লেখাটি আপনার জীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়ের সাথে মিলে যেতে বাধ্য।
প্রেমের বিয়ের গল্পগুলো সিনেমার মতো শুরু হয়, কিন্তু সব সময় সিনেমার মতো শেষ হয় কি?
প্রেমের সময় আমরা মানুষটাকে দেখি না, দেখি তার 'সবচেয়ে ভালো ভার্সনটা'। রেস্টুরেন্টে দেখা করা, পরিপাটি হয়ে আসা, মিষ্টি কথা বলা—এটা হলো ট্রেলার। কিন্তু বিয়ের পর শুরু হয় আসল সিনেমা। যখন মেকআপ উঠে যায়, যখন প্রেমিকের পকেটে টাকা থাকে না, যখন প্রেমিকা ক্লান্ত হয়ে খিটখিট করে—তখন মনে হয়, "এই মানুষটাকেই কি আমি ভালোবেসেছিলাম?"
প্রেমের বিয়েতে ডিভোর্স রেট কেন বাড়ছে জানেন? কারণ—প্রত্যাশা। আপনি ধরে নেন, বিয়ের পরও সে আপনাকে প্রতিদিন গোলাপ দেবে বা আপনার সব কথা শুনবে। কিন্তু বিয়ের পর যখন সে বাজারের ফর্দ আর ইলেকট্রিসিটি বিল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মনে হয় ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়েছে। প্রেমিকের কাছে আপনি ছিলেন 'রাজকন্যা', কিন্তু বরের কাছে আপনি 'সংসারের আরেকজন দায়িত্বশীল সদস্য'। এই পতনটা অনেকে মেনে নিতে পারে না।
প্রেমের বিয়েতে পরিবার মেনে নিলেও, অনেক সময় মন থেকে মেনে নেয় না। শাশুড়ি পান থেকে চুন খসলেই বলেন, "নিজের পছন্দে বিয়ে করেছ, এখন বোঝো ঠেলা!" ছেলে বা মেয়েটি তখন না পারে গিলতে, না পারে ওগরাতে। পরিবারের সাপোর্ট না থাকায় ছোটখাটো ঝগড়াও তখন মহাযুদ্ধে রূপ নেয়।
নিষ্ঠুর সত্য কি জানেন ? প্রেমের বিয়েতে আমরা 'মানুষটাকে' ভালোবাসি না, আমরা ভালোবাসার 'অনুভূতিটাকে' ভালোবাসি। আর সেই অনুভূতি বা মোহ কেটে গেলেই শুরু হয় সংঘাত।
আবার, পারিবারিক বিয়েকে অনেকেই 'ব্যাকডেটেড' বা 'অন্ধকার কূপে ঝাঁপ দেওয়া' মনে করেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এই বিয়েগুলোই বেশি টেকে। কেন?
পারিবারিক বিয়েতে আপনি মানুষটাকে চেনেন না। তাই আপনার কোনো আকাশকুসুম প্রত্যাশাও থাকে না। বিয়ের পর স্বামী যখন এক গ্লাস পানিও এগিয়ে দেয়, বা স্ত্রী যখন আপনার জন্য চা করে আনে—সেটাই তখন 'বোনাস' মনে হয়। শূন্য থেকে শুরু হয় বলে, এখানে ভালোবাসা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে বেশি।
সত্যি বলতে, পারিবারিক বিয়েতে একটা বড় অংশের ভিত্তি হলো—"মানিয়ে নেওয়া"। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। সমাজ শেখায়, "যাই হোক, সংসার টিকিয়ে রাখতে হবে।" এটা অনেকের জন্য দমবন্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করে। অনেকে সারাজীবন অসুখী থেকেও কেবল 'লোকলজ্জার ভয়ে' সংসার টেনে যান। এটাকে কি আমরা সফলতা বলব? নাকি আপস?
পারিবারিক বিয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—ঝগড়া হলে আপনি একা নন। দুই পরিবার এগিয়ে আসে সমস্যা মেটাতে। ডিভোর্স শব্দটা এখানে সহজে উচ্চারণ করা যায় না। এই সামাজিক চাপ অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সম্পর্ককেও জোড়া লাগিয়ে দেয়।
এখানেও নিষ্ঠুর সত্য কি জানেন ? পারিবারিক বিয়েতে ভালোবাসা পরে আসে, দায়িত্ব আসে আগে। এখানে রোমান্সের চেয়ে 'পার্টনারশিপ' বা বোঝাপড়া বেশি কাজ করে। কিন্তু যদি পার্টনার টক্সিক হয়, তবে এই বিয়ে নরক হতে সময় নেয় না।
প্রেমের বিয়ে বনাম পারিবারিক বিয়ে: আসল সমস্যা কোথায়? সমস্যাটা কি বিয়ের ধরণে? না। সমস্যা আমাদের মনস্তত্ত্বে।
দিনশেষে পেট না চললে প্রেম জানালা দিয়ে পালায়। প্রেমের বিয়ে হোক বা পারিবারিক—মাসের শেষে যখন পকেটে টাকা থাকে না, তখন সব রোমান্স উবে যায়। যারা ভাবেন "ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকব"—তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অভাব দরজায় এলে ভালোবাসা পালাতে বাধ্য।
এখনকার যুগে আমাদের ধৈর্য কম। ফেসবুকে অন্যের "Couple Goals" বা হানিমুনের ছবি দেখে আমরা নিজের সঙ্গীর সাথে তুলনা করি। "ওর বর ওকে গিফট দিল, তুমি দিলে না কেন?" — এই তুলনাই তিলে তিলে সংসার ধ্বংস করে। আমরা ভুলে যাই, ফেসবুকে সবাই সুখি, কিন্তু ইনবক্সে সবারই কান্না আছে।
প্রেমের বিয়েতে অনেক সময় পজেসিভনেস বা সন্দেহ বেশি থাকে। "তুমি কার সাথে কথা বলছ?"—এই প্রশ্ন সম্পর্ক বিষিয়ে দেয়। অন্যদিকে পারিবারিক বিয়েতে একে অপরকে চিনে নিতেই অনেক সময় চলে যায়, ফলে সন্দেহের বীজ বোনার সময় থাকে না।
আসলে বিয়ে প্রেমের হোক বা পারিবারিক—কোনো গ্যারান্টি কার্ড নেই। বিয়ে অনেকটা মাটির হাড়ির মতো, যত্ন না নিলে ভেঙে যাবেই।
প্রেমের বিয়ে তখনই সফল হয়, যখন মোহ কেটে যাওয়ার পরেও আপনি মানুষটার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকেন। যখন আপনি মেনে নেন যে, আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা কোনো ফেরেশতা নয়, সেও ভুল করতে পারে।
আর পারিবারিক বিয়ে তখনই সফল হয়, যখন আপনি সঙ্গীকে 'চাপিয়ে দেওয়া বোঝা' না ভেবে তাকে বন্ধু ভাবার চেষ্টা করেন। যখন আপনি সময় দেন সম্পর্কটা গড়ে ওঠার।
বিয়ে টেকে ভালোবাসায় নয়, বিয়ে টেকে সম্মানে।
যেখানে একে অপরের প্রতি সম্মান (Respect) নেই, সেখানে ১০ বছরের প্রেমও আবর্জনা। আর যেখানে সম্মান আছে, সেখানে ২ দিনের পরিচিতিও আমৃত্যু টিকে থাকে।
এক ভয়ানক সত্য: বিষের চেয়েও বিষাক্ত যখন 'জীবনসঙ্গী'
বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করা মানুষগুলোকে আমরা বোকা বলি, তাই না? কিন্তু বিশ্বাস করুন, এক শট বিষ খেয়ে মরে যাওয়া অনেক সহজ। কঠিন হলো—ভুল একটা মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে ৩০ বছর বেঁচে থাকা, যেটা আসলে জাহান্নামের 'লাইভ ডেমো' ভার্সন।
পৃথিবীতে যত মানুষ গলায় দড়ি দিয়ে মরে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি মানুষ মারা যায় ভুল মানুষকে বিয়ে করে। পার্থক্য একটাই—এদের জানাজা হয় না, এদের কবর দেওয়া হয় না। এরা হলো 'জিন্দা লাশ'। এরা হাসে, কথা বলে, সাজগোজ করে পার্টিতে যায়, কিন্তু ভেতরটা কবেই পচে-গলে শেষ হয়ে গেছে।
বিয়ে যখন লিগ্যাল 'ধর্ষণ' ও মানসিক হত্যা:
খুব তেতো শোনাচ্ছে? শুনুন তবে। যখন একটা ভুল মানুষের সাথে আপনাকে জোর করে এক বিছানায় শুতে হয়, তখন সেটাকে সমাজ 'দাম্পত্য' বলে, কিন্তু আপনার আত্মা সেটাকে 'ধর্ষণ' ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। দিনের পর দিন এমন একজনের মুখ দেখা, যার উপস্থিতি আপনার দম বন্ধ করে দেয়—এটা কি তিলে তিলে আত্মহত্যা নয়?
সমাজ আপনাকে শিখিয়েছে—"মানিয়ে নাও, সংসার ভেঙো না।"
আরে কীসের সংসার? যেখানে রোজ রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কান্না লুকাতে হয় যাতে পাশের মানুষটা শব্দ না শোনে? যেখানে স্বামীর স্পর্শ মনে হয় ক্যাকটাসের মতো, কিংবা স্ত্রীর কথা মনে হয় কানের ভেতর গলানো সীসা?
মর্গে থাকা লাশের কোনো অনুভূতি নেই, কিন্তু ভুল বিয়ের ফাঁদে পড়া মানুষগুলোর অনুভূতি আছে—আর সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। এরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক চামচ করে 'অবহেলার বিষ' পান করে। এরা মরে না, কিন্তু এরা বাঁচেও না। এরা কেবল 'লোকলজ্জা' আর 'বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে' একটা মৃত সম্পর্ককে কাঁধে বয়ে বেড়ায়।
পরিসংখ্যান ডিভোর্সের সংখ্যা গুনতে পারে, কিন্তু 'Unhappy Marriage'-এর সংখ্যা গুনতে পারে না। যদি পারত, তবে দেখতেন—আমাদের আশেপাশের ওই 'পারফেক্ট কাপল' ট্যাগ লাগানো অধিকাংশ মানুষ আসলে এক একটা দুর্দান্ত অভিনেতা। তারা সমাজকে দেখাচ্ছে স্বর্গ, কিন্তু নিজেরা পুড়ছে দোজখে।
তাই মনে রাখবেন, ভুল মানুষকে বিয়ে করার চেয়ে আজীবন একা থাকা হাজার গুণ সম্মানের। কারণ, একাকীত্ব আপনাকে মারবে না, কিন্তু ভুল মানুষ আপনাকে রোজ একবার করে খুন করবে। রক্ত বের হবে না, কিন্তু আত্মা ছিঁড়ে যাবে।
এই দীর্ঘ লেখার পর, এবার আপনাদের কাছে ফিরছি। কারণ জীবনের গল্প বইয়ের পাতার চেয়ে ভিন্ন।
আপনার কাছে আমার ৩টা প্রশ্ন
১. আপনার বা আপনার পরিচিতদের অভিজ্ঞতায় কী দেখেছেন? প্রেমের বিয়েতে ডিভোর্স বেশি নাকি পারিবারিক বিয়েতে অশান্তি বেশি?
২. আপনি যদি অবিবাহিত হন, তবে কোনটিকে বেছে নেবেন? আর বিবাহিত হলে, আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার বোঝাপড়াটা আসলে কেমন?
৩. "মানিয়ে নেওয়া"—এটা কি কেবল মেয়েদেরই করতে হয়, নাকি ছেলেরাও সমান ভুক্তভোগী?
👇 কমেন্ট বক্সে আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা বা মতামত জানান। হতে পারে আপনার একটি কমেন্ট অন্য কাউকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে বা ডিপ্রেশন থেকে বাঁচাবে।