26/05/2026
মা যখন বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করছিলেন, ঠিক তখনই ঘরের ভেতরে তার কলিজার টুকরোকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছিল।
কার জন্য এই লেখা? কেন এই লেখা? প্রতিদিন কত হাজারো শব্দ আমরা খরচ করি নানা বিষয়ে, কিন্তু দিনশেষে কি আমাদের সমাজে কোনো পরিবর্তন আসে? কোনো অবক্ষয় কি রুখে দেওয়া যায়? নাকি আমরা শুধু একেকটি নৃশংস ঘটনার পর কিছুদিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করি, তারপর আবার আরেকটি নতুন ট্র্যাজেডির অপেক্ষায় নিজেদের গুটিয়ে নিই?
যখন একটি সাত বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশুর জীবন এভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেই লজ্জা হয়। মনে প্রশ্ন জাগে, এই সমাজে আমাদের জন্ম নেওয়াটাই কি তবে কোনো ভুল ছিল? নাকি আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে জন্ম নেওয়াটাই এক ধরণের অপরাধ? মাত্র কদিন আগেই হয়তো আমরা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় বড় কথা বলেছি, সচেতনতামূলক বাণী লিখেছি। কিন্তু পরদিনই যখন খবরের কাগজের পাতায় ভেসে ওঠে সাত বছরের রামিসার মস্তকহীন লাশের ছবি, তখন সমস্ত শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়। কলম থেমে যায়। মনে হয়, আমাদের এই সমাজ কি আসলে কোনো সুস্থ মানুষের চারণভূমি, নাকি আমরা ক্রমশ একদল হিংস্র পশুর খাঁচায় পরিণত হচ্ছি?
রাজধানীর পল্লবীর একটি বহুতল ভবন। যে ভবনে নিহতের পরিবার দীর্ঘ ১৭টি বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বসবাস করে আসছিল। আর ঠিক তার উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে মাত্র দুই মাস আগে ভাড়া এসেছিল জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। কেউ কি কখনো ভেবেছিল, পাশের ফ্ল্যাটের এই মানুষগুলোর ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে দুটি হিংস্র দানব?
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টা। দ্বিতীয় শ্রেণির ছোট্ট শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার ঘর থেকে বের হয়েছিল প্রতিদিনের মতোই এক টুকরো আনন্দ নিয়ে। কিন্তু সেই আনন্দ যে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত হতে যাচ্ছে, তা সে নিজেও জানত না। প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে রামিসাকে পাশবিক নির্যাতন চালায় সোহেল রানা। নির্যাতনের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ছোট্ট শিশুটি।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়ছিলেন রামিসার মা। তিনি তার সোনামণিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুঁজছিলেন। দরজার ঠিক বাইরেই পড়ে ছিল রামিসার ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়া। মা ব্যাকুল হয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন, আর ভেতরে তখন চলছিল এক পৈশাচিক উৎসব। মা যখন বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করছিলেন, ঠিক তখনই ঘরের ভেতরে তার কলিজার টুকরোকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছিল।
একবার বুক ভরে শ্বাস নিয়ে চিন্তা করে দেখুন তো—একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় নরকযন্ত্রণা আর কী হতে পারে? তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করছেন, দরজা খোলার অনুরোধ করছেন, আর ভেতরে তার সন্তানের শেষ চিৎকার চাপা পড়ে যাচ্ছে এক ঘাতকের ধারালো ছুরির নিচে।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর মরদেহ গুম করার জন্য রামিসার মাথাটি শরীর থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক কেটে ফেলা হয়। ক্ষতবিক্ষত করা হয় তার সংবেদনশীল অঙ্গ। এরপর নিথর দেহটি খাটের নিচে লুকিয়ে রেখে মাথাটি বাথরুমের একটি বালতিতে ভরে রাখা হয়। যখন দরজা ভেঙে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভেতরে ঢুকলেন, তখন তাদের সামনে উন্মোচিত হলো এক বিভীষিকাময় নরক।
ঘাতক সোহেল রানা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে সে ইয়াবা সেবন করেছিল। ইয়াবা, ফেন্সিডিল কিংবা যেকোনো মাদক আমাদের যুবসমাজকে কীভাবে গ্রাস করছে, তা আমরা প্রতিদিন দেখছি। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে, মাদক শুধু মানুষের শরীর ধ্বংস করে না, তা মানুষের ভেতর থেকে শেষ অবশিষ্ট মানবিক সত্তাটুকুও উপড়ে ফেলে। মাদক যখন বিকৃত যৌনলালসার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে পশুর চেয়েও ভয়ংকর।
ইন্টারনেটের অবাধ দুনিয়ায় পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং মাদকের সহজ প্রাপ্তি আমাদের চারপাশের একটা বড় অংশের মানুষের মানসিকতা কতটা বিকৃত করে তুলছে, তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি? একজন সাধারণ রিকশা মেকানিক কীভাবে এতটা নৃশংস পরিকল্পনা করতে পারে? কীভাবে একটি সাত বছরের অবুঝ শিশুর শরীরের ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালাতে পারে? ঘাতকের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, রামিসার পরিবারের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব শত্রুতা ছিল না। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, স্রেফ বিকৃত লালসা মেটাতেই সে এই কাজ করেছে।
আজ আপনার সন্তান, আপনার বোন কিংবা আপনার ভাই কি এই মানসিক বিকারগ্রস্ত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপদ? আমরা প্রায়ই ভাবি, আমাদের সন্তান তো ঘরেই আছে, তাই সে নিরাপদ। কিন্তু রামিসার ঘটনা আমাদের সেই ভুল ভেঙে দেয়। আপনার সন্তান ততক্ষণই নিরাপদ, যতক্ষণ সে আপনার চোখের সামনে আছে। এমনকি চোখের আড়াল হওয়া মাত্র দুই মিনিটের অসতর্কতাও কেড়ে নিতে পারে একটি তাজা প্রাণ।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর এবং অবিশ্বাস্য দিকটি হলো ঘাতকের স্ত্রী স্বপ্নার ভূমিকা। একজন পুরুষ মাদকাসক্ত হতে পারে, সে বিকৃত রুচির অধিকারী হতে পারে; কিন্তু একজন নারী কীভাবে এই পৈশাচিকতায় নীরব দর্শক এবং সক্রিয় সহযোগী হতে পারেন?
তদন্তে জানা গেছে, স্বপ্নার চোখের সামনেই তার স্বামী এই ছোট্ট মেয়েটিকে ধর্ষণ করে এবং হত্যা করে। স্বপ্না শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখেনি, বরং স্বামীকে বাঁচানোর জন্য ঘরের দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে আটকে রেখেছিল। বাইরে যখন রামিসার মা কাঁদছিলেন, তখন স্বপ্না দরজা খোলেনি। সে অপেক্ষা করছিল যতক্ষণ না তার স্বামী জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে পারে। স্বামীর পালানো নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল সে দরজা খোলে।
নারী হিসেবে এই ঘটনা কোনো সাধারণ সমীকরণ দিয়ে মেলানো অসম্ভব। মাতৃত্বের যে স্বভাবজাত কোমলতা একজন নারীর মধ্যে থাকে, তা স্বপ্নার ক্ষেত্রে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল? সে কি একবারও রামিসার কান্নায় নিজের ভেতরের মাতৃত্বকে জাগ্রত হতে দেখেনি? নাকি আধুনিক সমাজের নৈতিক অবক্ষয় আমাদের নারীদের একাংশকেও এমন পাথর হৃদয়ের দানবে পরিণত করছে? একজন নারী যখন অন্য একজন নারীর সন্তানের ওপর এমন নির্যাতন সহ্য করে এবং তাতে সহযোগিতা করে, তখন বুঝতে হবে আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক মূল্যবোধ একদম শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে।
আমরা প্রায়ই আমাদের সমাজকে অনেক উন্নত এবং সভ্য বলে দাবি করি। কিন্তু বাস্তব উদাহরণ আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। কয়েক বছর আগের তনু হত্যা, নুসরাত হত্যা থেকে শুরু করে আজকের রামিসা হত্যাকাণ্ড—প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সমাজের ভেতরের পচনকে নির্দেশ করে। আমরা রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে পারি, আইন কঠোর করতে পারি, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের পচন না রুখলে কোনো আইনই আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
একটি সমাজের নৈতিকতা যখন ধসে পড়ে, তখন আইন কেবল অপরাধের পর শাস্তি দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে কাজ করে, কিন্তু অপরাধ রুখতে পারে না। আজ যদি আমাদের সন্তানরা প্রতিবেশী বা পরিচিত মানুষের কাছেও নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা কার ওপর ভরসা করব? এই অবিশ্বাস এবং ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রামিসার এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের শুধু ব্যথিতই করে না, বরং আমাদের কিছু কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই ঘটনা থেকে আমাদের বেশ কিছু বিষয় গভীরভাবে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন:
আপনার সন্তানকে কখনোই, কোনো অবস্থাতেই একা ছাড়বেন না। সে ঘরের বাইরে খেলছে কি না, পাশের ফ্ল্যাটের কেউ তাকে ডাকছে কি না—এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখুন। "চেনা মানুষ" বা "প্রতিবেশী" ভেবে অতিরিক্ত বিশ্বাস করার দিন আর নেই।
খুব ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে শেখাতে হবে নিজের শরীরের ওপর কেবল তার নিজেরই অধিকার আছে। কেউ যদি তাকে অন্যভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করে, তবে সাথে সাথে যেন সে চিৎকার করে বা বাবা-মাকে জানায়।
আমাদের চারপাশের তরুণ প্রজন্ম বা প্রতিবেশীদের আচরণ লক্ষ্য করুন। সমাজে যারা মাদকের সাথে জড়িত, তাদের ব্যাপারে পুলিশকে তথ্য দিন। ঘরের ভেতরে মোবাইল বা ইন্টারনেটের অপব্যবহার রুখতে হবে।
এই ধরনের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। অপরাধীরা যখন দেখবে অপরাধ করে পার পাওয়া অসম্ভব, তখনই কেবল এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমবে।
রামিসা আর আমাদের মাঝে নেই। সে চলে গেছে এমন এক দেশে যেখানে হয়তো কোনো সোহেল রানা নেই, কোনো স্বপ্না নেই। কিন্তু রেখে গেছে একরাশ প্রশ্ন। রামিসার মায়ের চোখের জল কি আমাদের বিবেককে নাড়া দিতে পারবে? নাকি আমরা এই ঘটনাও ভুলে যাব কয়েকদিন পর?
আসুন, শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ না করে, নিজের পরিবার থেকে সচেতনতা শুরু করি। আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর মানসিক বিকারগ্রস্ততার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। আর কোনো রামিসাকে যেন দরজার ওপাশে এভাবে ছটফট করে প্রাণ হারাতে না হয়। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়। আমাদের নীরবতা যেন পরবর্তী কোনো অপরাধীর সাহস জোগানোর হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।