04/09/2021
# # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # #
••••••• ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি থেকে বলছি••••••••
# # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # #
সাধকের চোখে যা ধরা পড়ে। সাধারণ মানুষের চোখে তা দুর্লভ। সেগুলো আমরা সাধারণভাবে অলৌকিক বলে থাকি। প্রত্যেক সাধকের জীবনের সঙ্গেই মিশে আছে এই ধরণের কিংবদন্তি। "এমন দিন কি হবে তারা/ যবে তারা তারা তারা বলে/ তারা বয়ে পড়বে ধারা॥"
সাধনা আমাদের জীবনে আধ্যাত্মিকতার ফুল ফোটানোর একটি সহজ উপায়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মা ভবতারিণীর সঙ্গে কথা বলতেন বলেও শোনা যায়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন,"মনের যেমন বন্ধন আছে তেমন মনের মুক্তি ও আছে, এই সংসারে নয় তুমি ঈশ্বর প্রেমে নিজের চেতনা কে মুক্ত করবে নয় তুমি সংসারের বন্ধনে বন্দী হবে।"
#
সেটা আনুমানিক ১৭০৩ সাল। জঙ্গল অধ্যুষিত সুতানুটি গ্রাম। পাশ দিয়ে বয়ে চলছে ভাগীরথী। নদীর পাশে অরণ্যবেষ্টিত এক শ্মশান। তান্ত্রিক উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী তৈরি করেন মাটির সিদ্ধেশ্বরী কালীর মূর্তি।
ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি মন্দির যেন এক খণ্ড ইতিহাস। ডাকাতরা কালীমুর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারপর আর দেবীকে নড়ানো যায়নি। অগত্যা জঙ্গলে ভরা অঞ্চলেই তৈরি হয় মন্দির। জনশ্রুতি বলে, এই মন্দিরের ঘণ্টা বাজিয়ে একসময় দুর দুরান্তে ডাকাতদের হামলার সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হত। ঘণ্টার ঠনঠন শব্দ থেকে মন্দিরের নাম ঠনঠনিয়া।
#
২০১৪ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর (পৃ. ৩৬) "সুখী গৃহকোণ" পত্রিকায় সম্ভবত ঠনঠনিয়া ঘোষ পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে কালী বাড়ির ইতিহাস লিখেছেন স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী। সেই লেখার অংশবিশেষ আপনাদের জন্য : "চিৎপুর গ্রামে ছিল ডাকাত ঠেঙ্গারের উপদ্রব।চিৎপুর রোডের দুপাশে ঘন বনের মধ্যে লুকিয়ে থাকত ঠ্যাঙ্গারেরা। দূর থেকে কাউকে আসতে দেখলে ছুড়ে মারত খেটে লাঠি। লাঠির ঘায়ে পায়ের হাড় ভেঙে মাটিতে পড়ে গেলে, তীর্থ যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে পালাতো তারা। এরা ছিল ডাকাত।...যেখানে ঠনঠনে কালীবাড়ি সেটা ছিল এক মাটির ঢিপি মতো। সেখানে একটা ঘন্টা বাঁধা থাকত। ডাকাতদের মশালের আলো চোখে পড়লে সেই ঘন্টা বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হতো। তা থেকেই এই এলাকার নাম পরবর্তীকালে হয়ে যায় ঠনঠনে।
#
জঙ্গলের মধ্য থেকে শোনা যেত কালী মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি। ঠনঠন-ঠনঠন। সেই থেকেই এলাকার নাম ঠনঠনিয়া। সেই ঠনঠনিয়াতেই সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি।
#
মন্দির প্রতিষ্ঠার তারিখ নিয়ে কিছু মতানৈক্য রয়েছে। ম্যাকাচ্চিয়েন সাহেব বলেছেন : ” ঠনঠনিয়ার সাবেক কালীমন্দির ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । ” এরপর ১৩৭১ বঙ্গাব্দে সাপ্তাহিক অমৃতের পৌষ সংখ্যাটি কলকাতা সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সংখ্যায় সৌমেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি প্রবন্ধে বলেছিলেন। ” কলকাতার ঠনঠনিয়া কালীমন্দির সকলেই জানেন । এই মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২৭০ বছর আগে। এখন এ অঞ্চল যেমন ঘন জনবসতিপূর্ণ তখন ছিল তেমনই ছিল জঙ্গলময় ।সেই জঙ্গলের মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গায় সামান্য একটি চালা ঘরে দেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী নামে একট তান্ত্রিক সাধক। পরে ১৮১০ খ্রিস্টাব্দের সেই জায়গাতেই বর্তমান মন্দির নির্মাণ করিয়ে দেন বিশিষ্ট ধনী শঙ্কর ঘোষ। ” মন্দির প্রতিষ্ঠার তারিখ উল্লেখ প্রসঙ্গে রাধারমণ মিত্র বলেছেন ” বর্তমান মন্দিরের এক পাথরের গায়ে ১১১০ সাল লেখা আছে । অর্থাৎ এই পাথরেরপ্রমাণেকালী মন্দির তৈরি হয়েছিল ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে , ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে নয়। “
#
নিজের বাড়ি থেকে প্রতিদিন সকালে শঙ্কর ঘোষ গঙ্গাস্নান করতে যেতেন। এখন যেখানে ঠনঠনে কালীবাড়ী অবস্থিত তখন ঠিক সেখানেই উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক বসতেন। একটা মাটির ঢিপির উপর ত্রিশুল আর সিদ্ধেশ্বরী মার মূর্তি রেখে সাধনা করতেন তিনি। শোনা যায়, ঐ ঢিপির পাশ দিয়েই রোজ গঙ্গা স্নানে যেতেন শঙ্কর ঘোষ। যাওয়া ও ফেরার পথে মাকে প্রণাম করতেন, যখন সম্ভব ব্রহ্মচারী মহারাজকে যথাসাধ্য সাহায্যও করতেন শঙ্কর ঘোষ। এভাবেই উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারীর সান্নিধ্যে আসেন তিনি।...শঙ্কর ঘোষের কালীভক্তি দেখে উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে কাশী চলে যান। কাশী যাওয়ার আগে মার রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়ে যান শঙ্কর ঘোষের হাতে। শোনা যায়, এ ব্যাপারে উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী ও শংকর ঘোষ দুজনেই মায়ের প্রত্যাদেশ পেয়েছিলেন। মা কালী উভয়কেই স্বপ্নে বলেন, এই কালী মন্দিরের দায়িত্ব যেন শঙ্কর ঘোষই নেন।"এই গল্পের প্রসঙ্গে আমি কোন মন্তব্য করা উচিৎ হবে না !
#
একসময় মন্দির প্রাঙ্গণ ধ্বনিত হতো সাধক রামপ্রসাদ এর কণ্ঠে। দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী কালী মন্দিরের মতো উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়ায় মা সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের সঙ্গেও ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের মধুর স্মৃতি জড়িত। ঠাকুর যখন প্রথম জীবনে ঝামাপুকুরে বাস করতেন, তখন মাঝে মাঝেই এই মন্দিরে এসে মাকে গান শোনাতেন, পরবর্তীকালে দক্ষিণেশ্বরে থাকলেও সময় বিশেষে এই মন্দিরে আসতেন ও পূজা দিতেন। এটিও ঠাকুরের অন্যতম লীলা স্থান।ঝামাপুকুর ত্যাগ করে ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে বাস করলেও, এই মন্দিরে আসার ঘটনা 'কথামৃত' গ্রন্থের কয়েক স্থানে উল্লেখ রয়েছে।
#
ঠনঠনিয়া তখন ছিল হোগলা ও লতাগুল্মে ভরা নির্জন অরণ্য। পাশ দিয়ে বয়ে চলে গঙ্গা। এই নির্জনে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে তন্ত্রসাধনা করতেন উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী। তিনি ঘটে মায়ের আরাধনা করতেন। একদিন উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী রামশংকর ঘোষ বা শংকর ঘোষের হাতে মায়ের পুজোর দায়িত্ব দিয়ে বিদায় নিলেন।
#
১১১০ বঙ্গাব্দে শংকর ঘোষ ঠনঠনিয়ায় কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। তৈরি করলেন মাটির সিদ্ধেশ্বরী কালীর মূর্তি। দেবী সিদ্ধেশ্বরীর সেই মৃন্ময়ী মূর্তি আর সাধকের সেই ঘট এখনও নিত্যপুজো হচ্ছে ঠনঠনিয়ার মন্দিরে।
#
প্রতিবছর মৃন্ময়ী মূর্তির অঙ্গরাগ হয় দীপান্বিতা কালীপুজোর আগে। কালীপুজোয় মা সিদ্ধেশ্বরীকে সাজানো হয় রাজরাজেশ্বরী রূপে। কানপাশা, বালা, কঙ্কণ, মানতাসা, সীতাহার, মাথার মুকুট ও নানা গয়নার সঙ্গে বেনারসি শাড়িতে সজ্জিতা হন দেবী সিদ্ধেশ্বরী।
#
কালীপুজোর রাতে মায়ের ভোগে থাকে লুচি, আলুভাজা, পটলভাজা, আলুর দম, গজা, খাস্তা, লেডিকেনি। পরদিন সকালে অন্নভোগ দেওয়া হয়। ভাতের সঙ্গে থাকে তরকারি, মাছ, চাটনি, পায়েস। দীপান্বিতা কালীপুজোয় দু’টি ছাগবলি দেওয়া হয়। এছাড়াও ভক্তদের মানত করা ছাগলবলি দেওয়া হয়। যত রাত অবধি পুজো চলে, মন্দির ততক্ষণই খোলা থাকে।
#
শঙ্কর ঘোষের বংশধরগণই বর্তমানে এই কালীমাতার সেবার অধিকারী। দক্ষিণা মুখী কালীমাতার মন্দিরের পাশেই একই সীমানার মধ্যে একটি শিব মন্দির। সিদ্ধেশ্বরীর মূর্তিটি মাটির তৈরি এবং প্রতি বছর কালীপুজোর আগে লাল এবং কালো রংয়ের মূর্তিটিকে নতুন করে সাজানো হয়। দেবী কালীর একটি ছোট মাটির মূর্তি আছে, যা প্রতি বছর পুনর্গঠিত হয়। গর্ভ মন্দিরে মায়ের বিগ্রহের পাশে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের দণ্ডায়মান অবস্থায় একটি প্রতিচ্ছবি আছে এবং এই প্রতিকৃতির নিত্য অর্চনা হয়। মন্দির প্রাঙ্গনের দেওয়ালে ঠাকুরের ত্যাগী শিষ্য স্বামী সুবোধানন্দ মহারাজের ও ছবি রয়েছে।
#
প্রাচীন এই মন্দিরের ইতিহাসে নাম জড়িয়ে রয়েছে দুই মহাসাধকেরও। ডাব আর চিনি দিয়ে এই মন্দিরের মায়ের পুজো দিয়েছিলেন রামকৃষ্ণদেব। এক সময় মন্দির প্রাঙ্গণ ধ্বনিত হত সাধক রামপ্রসাদের কণ্ঠ।
#
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ প্রায়ই আসতেন ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী মায়ের কাছে। অসুস্থ কেশব সেনের অসুখ ভাল হওয়ার জন্য তিনি ডাব-চিনি দিয়ে মাকে পুজো দিয়েছিলেন।
#
#শ্রীরামকৃষ্ণ #কেশবসেন #ঠনঠনিয়াকালি
#স্বামীসুবোধানন্দমহারাজ #উদয়নারায়ণব্রহ্মচারী
#দক্ষিণামুখীকালী #শঙ্করঘোষ #সুতানুটি
#দক্ষিণেশ্বরেরমাভবতারিণী #দেবীসিদ্ধেশ্বরী
#শিশুসংবাদ #মুখোপাধ্যায়ফাউন্ডেশন #শিলিগুড়ি
# # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # #