14/03/2026
যাকাতুল ফিতর নগদ অর্থে দেওয়ার মত থেকে ইমাম আবু হানীফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর বিমুক্ততা
যে ব্যক্তি যাকাতুল ফিতর নগদ অর্থে দিতে চান, তিনি যেন বলেন: “এটা আমার ব্যক্তিগত মত বা আমার মাযহাবের মত।”
কিন্তু এটাকে ইমাম আবু হানীফা এবং তাঁর দুই সাথী (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ)-এর দিকে সম্পৃক্ত যেন না করেন।
কারণ তারা কেবল খাদ্যদ্রব্যের মূল্য অনুযায়ী (মূল্যায়ন করে) বের করার অনুমতি দিয়েছেন, নগদ অর্থ দেওয়ার অনুমতি দেননি।
পূর্বেকার ইমামদের মতভেদের বিষয় ছিল কেবল এক সা‘ ও অর্ধ সা‘-এর পরিমাণ নিয়ে।
ইসলামী ফিকহের সহীহ দলিল ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে,
চার ইমামের মধ্যে একজন ইমামও যাকাতুল ফিতর নগদ অর্থে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর দুই সাথীর দিকে যে মতটি সম্পৃক্ত করা হয়, তা মনগড়া ও ভিত্তিহীন।
কারণ এর পক্ষে ইমাম আবু হানীফাহ ও সাহেবাইন থেকে স্পষ্ট কোনো নস বা সহীহ সনদযুক্ত একটি বর্ণনাও নেই।
বরং যিনি প্রথম হানাফি মাযহাবের দিকে নগদ অর্থে যাকাতুল ফিতর দেওয়ার মত সম্পৃক্ত করেন তিনি হলেন আলা উদ্দীন আল-কাসানী (রহিমাহুল্লাহ)।
তিনি তাঁর কিতাব “বদায়েউস্ সানায়ে”-তে ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে (التعريض) একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন, কিন্তু এর কোনো সহীহ বা দুর্বল সনদও দেননি, যা তিনি ইমাম আবু ইউসুফ-এর দিকে সম্পৃক্ত করেন।
তিনি বলেন:
“আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন:
গমের চেয়ে আটা আমার কাছে বেশি প্রিয়, আর আটার চেয়ে দিরহাম (টাকা) আমার কাছে বেশি প্রিয়;
কারণ এটি গরিবের প্রয়োজন পূরণে অধিক নিকটবর্তী।”
পরে এ বক্তব্য অনুসরণ করেন:
•বুরহানুদ্দীন ইবন মাজা আল-মারগিনানী (কিতাব আয-যাখীরা ও আল-মুহীত)
•এরপর মাজদুদ্দীন আল-হানাফি
•এবং তাদের পরে হানাফি ফিকহের কিছু পরবর্তী আলেম।
কিন্তু এই নিসবতের অসত্যতা স্পষ্ট হয়
ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী-এর বক্তব্য থেকে, যা তিনি তাঁর কিতাব
“আল-হুজ্জাহ ‘আলা আহলিল মাদীনা”-তে উল্লেখ করেছেন।
সেখানে “গমের অর্ধ সা‘” প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
“মদিনার কিছু লোক বলেছে: যাকাতুল ফিতর হলো এক সা‘ খেজুর।
তারা যেন গমের অর্ধ সা‘কে অস্বীকার করেছিল।
তারপর তিনি কয়েকজন সাহাবীর বর্ণনা উল্লেখ করেন যেখানে গমের অর্ধ সা‘ দেওয়ার অনুমতি আছে।
এরপর তিনি বলেন:
আমরা বলি— যদি কেউ খেজুর, যব বা কিশমিশ দেয় তবে সে প্রত্যেক মানুষের পক্ষ থেকে পূর্ণ এক সা‘ দেবে।
আর যদি গম দেয় তবে অর্ধ সা‘ দেবে।
এবং একইভাবে আটা ও সাওয়ীক (ছাতু বা ভাজা যবের গুঁড়া)।”
তিনি তাঁর কিতাব “আল-আসল”-এও বলেন:
“আমি জিজ্ঞেস করলাম: যদি কোনো ব্যক্তির কাছে গম বা যব না থাকে, কিন্তু তার কাছে ভুট্টা, তিল বা এ ধরনের অন্য শস্য থাকে— তবে সে যাকাতুল ফিতর কত দেবে?
তিনি বললেন:
সে দেবে গমের অর্ধ সা‘-এর মূল্য সমপরিমাণ
অথবা যবের এক সা‘-এর মূল্য
অথবা খেজুরের এক সা‘-এর মূল্য।”
আর হানাফি ইমাম ইমাম তাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“আবু হানীফা বলেছেন:
গম, আটা, সাওয়ীক বা কিশমিশ থেকে অর্ধ সা‘,
আর খেজুর বা যব থেকে এক সা‘।
আর আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ ইবনুল হাসান বলেছেন:
কিশমিশ খেজুর ও যবের মতোই।
আর এগুলোর বাইরে অন্য জিনিস হলে তা বের করা হবে মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে, অর্থাৎ উল্লিখিত গম বা অন্য খাদ্যের মূল্যের সমান।”
— (মুখতাসার ইখতিলাফুল উলামা)
ইমাম তাহাবী তাঁর “শরহু মা‘আনিল আথার” কিতাবে আরও বলেন:
“কিছু লোক এই আছারগুলোর অনুসরণ করে বলেছে— যে চাইলে গম থেকে এক সা‘ দিতে পারে,
এবং যব, খেজুর বা কিশমিশ থেকেও এক সা‘ দিতে পারে।
কিন্তু অন্যরা তাদের বিরোধিতা করে বলেছে—
গম থেকে অর্ধ সা‘ দেবে,
আর অন্যান্য উল্লেখিত জিনিস থেকে এক সা‘।”
এরপর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন:
“এ থেকে বোঝা যায়, তারা গমের পরিমাণকে যব ও খেজুরের পরিমাণের সাথে সমন্বয় করেছিল।
তারা এটা করেছিল রাসূল ﷺ-এর সাহাবীদের পরামর্শ ও তাদের সম্মতির ভিত্তিতে।
যদি গমের পরিমাণ সম্পর্কে আমাদের কাছে এই সমন্বয় ছাড়া আর কোনো বর্ণনা না থাকত, তবুও এটি আমাদের কাছে বড় প্রমাণ হতো যে গমের পরিমাণ অর্ধ সা‘।
তাহলে কীভাবে হবে, যখন এ ছাড়াও বর্ণিত আছে যে আসমা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) রাসূল ﷺ-এর যুগেও এই পরিমাণই দিতেন।
এবং এ ছাড়াও রাসূল ﷺ থেকে আরও বর্ণনা আছে যা এটাকে সমর্থন করে।” — বক্তব্য সমাপ্ত।
সুতরাং এসব থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে:
ইমাম আবু হানীফা, তাঁর দুই সাথী (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ), এবং ইমাম তাহাবী—কেউই যাকাতুল ফিতর নগদ অর্থে দেওয়ার অনুমতি দেননি।
বরং তারা অনুমতি দিয়েছেন খাদ্যের ধরন অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে খাদ্যই দেওয়ার।
“খাদ্যের মূল্য দিয়ে বের করা” এর অর্থ কী?
অর্থাৎ মূল্যায়ন করে খাদ্যের প্রকারভেদ অনুযায়ী দেওয়া।
যেমন—
• খেজুরের এক সা‘,
• অথবা গমের অর্ধ সা‘
যে কোনো খাদ্য সেই পরিমাণ অনুযায়ী খাদ্য হিসেবেই নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
বুঝা গেল যে, যাকাতুল ফিতর নগদ অর্থ বা দিরহাম দ্বারা নির্ধারণ করার কোনো বিধান কোনো সহীহ হাদীসে আসেনি। আর কোনো সাহাবী, তাবেঈর আছার, কিংবা চার ইমামের কোনো ইমাম ও তাদের শিষ্যদের কেউ প্রদান করেননি।
–শায়েখ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া হাফি.